ঢাকা     সোমবার   ১৭ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩১

আমার যা কিছু বলার, তার বাহন কবিতা: মোহাম্মদ রফিক

সোহরাব শান্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৯, ১১ আগস্ট ২০২৩   আপডেট: ১৭:০১, ১১ আগস্ট ২০২৩
আমার যা কিছু বলার, তার বাহন কবিতা: মোহাম্মদ রফিক

মোহাম্মদ রফিক পাকিস্তান আমলের সেনাশাসক আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়েছিলেন; ছাত্রজীবনে। তখন ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায় হয়েছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। বরং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে অংশ নিয়েছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিকের ভূমিকা পালন করেছেন। তবে দেশ স্বাধীন হবার পরে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ভাতা বা কোনো সুবিধা নেননি। স্বাধীন দেশে স্বৈরশাসন ফিরে আসতে দেখে ফুঁসে উঠেছেন। লিখেছেন শাসকের তখ্ত নাড়িয়ে দেওয়া কবিতা। তাঁর কলম থেকে কালি নয়, বারুদ বেরিয়েছে! সে বারুদ প্রতিবাদী তারুণ্যের হাত ধরে আগুন লাগিয়েছে সারাবাংলায়, যার উত্তাপ পৌঁছে গিয়েছিল চীন থেকে মিশর- সবখানে। অর্থাৎ তাঁর প্রতিবাদী কবিতার বইয়ের অনুবাদের কপি পৌঁছেছিল দেশে-বিদেশে। 

কবি কাব্যপ্রতিভার জন্য পেয়েছেন নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ ভাষা ও সাহিত্যে পেয়েছেন একুশে পদক। কিন্তু তিনি আড়ালে থাকতেই পছন্দ করতেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুর পরে গার্ড অব অনার নেওয়ার বাসনা তাঁর ছিল না। প্রথিতযশা কবি হিসেবে তাঁর মরদেহ বাংলা একাডেমি বা শহিদ মিনারে এনে প্রথাগত শ্রদ্ধা নিবেদন করা স্বাভাবিক ব্যাপার হতো। তিনি সুযোগটুকুও দেননি। কবির ছোটছেলে অধ্যাপক ড. শুদ্ধস্বত্ব রফিক যেমনটা বললেন আমাকে, ‘বাবার চাওয়া মতো তাঁকে দ্রুত তাঁর মায়ের কবরের পাশে কবর দেওয়া হয়েছে।‘ দীর্ঘ জীবনের শেষদিকে এসেও কবির বারবার গ্রামে ছুটে যাওয়ার কারণ কি তবে মা! 

দুই.

কবি ফারুক আহমেদের সম্পাদনায় ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাজারে আসে মাসিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘অধ্যায়’। প্রথম সংখ্যাতেই মোহাম্মদ রফিকের কবিতা ছাপা হয়েছিল। ‘অধ্যায়’ সম্পাদকের সহযোগী হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমি কবি মোহাম্মদ রফিকের বাসায় প্রথম যাই বিশেষ একটি লেখা সংগ্রহের প্রয়োজনে। কবির স্নেহের বন্ধনে জড়িয়ে যাওয়ায় পরে একাধিকবার তাঁর বাসায় গিয়েছি। 

সর্বশেষ কবি মোহাম্মদ রফিকের মৃত্যুর ১৩ দিন আগে ২৪ জুলাই তাঁর উত্তরার বাসায় যাওয়া হয়েছে আমার। বরাবরের মতোই নানা বিষয়ে আলাপের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আমাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন তিনি। কথা ছিল সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফের দেখা করব আমরা। কিন্তু ৬ আগস্ট রাতে গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট থেকে ঢাকা ফেরার পথে বরিশালে মৃত্যু হয় কবির। 

২০২২ এর মার্চের শুরুতে কবি মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাতেও সাহিত্য ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ রেকর্ড করেছিলাম। সংরক্ষণ করা ছিল একটি পেনড্রাইভে। সম্প্রতি সেই রেকর্ড উদ্ধার করতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। পেনড্রাইভে ভাইরাস আক্রমণ করায় পুরো আলাপই বেহাত হয়ে গিয়েছে। তাই সর্বশেষ আলাপ আর স্মৃতিই ওপর ভরসা করেই এই লেখা এগুতে হচ্ছে।    

ফেব্রুয়ারির এক সকালে কবি মোহাম্মদ রফিকের বাসায় গেলাম। সেলফোনে আগেই কথা বলে যাওয়ায় কবি প্রস্তুত ছিলেন। দোতলায় উঠে কলিংবেল চাপতেই ভেতর থেকে শব্দ এলো- ‘আসেন, দরজা খোলা’। দরজা ভেতরের দিকে খানিক ঠেলতেই দেখি কবি বসার কক্ষের এক পাশের বিশাল খাবারটেবিলে দুহাত রেখে চেয়ারে বসে আছেন। গায়ে শাল জড়ানো। সোফায় নাকি চেয়ারে বসব, আমি দোটানায়। কবি বললেন, আসুন খাবার টেবিলেই বসি। 

আমি বসতে বসতে চারদিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। খাবার টেবিল হলেও এর অর্ধেক জায়গুজুড়ে নানা রকমের বইয়ের একাধিক স্তূপ। দরজা লাগোয়া দেয়ালটির পাশে বইয়ের বিশাল তাক। আরেকটি বইয়ের তাক খাবার টেবিলের এক পাশে। কবির শয়নকক্ষের দরজা বরাবর দেয়ালে তাঁর বেশ কিছু ছবি। দরজার পাশে একটি ছবিতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। উল্টোপাশের দেয়ালে নানা সময় পাওয়া কবি মোহাম্মদ রফিকের বিভিন্ন সময় পাওয়া সম্মাননা স্মারক, সনদ, মানপত্র ও এসব গ্রহণের ছবি। সেই দেয়ালে টেলিভিশন থাকলেও পাশেই রাখা একটি ক্যাসেট প্লেয়ার। কিছু পুরোনো সিডিও রয়েছে। 

আমি তাঁর আপনি সম্বোধনটা তুমিতে নামিয়ে আনার অনুরোধ করলাম। তিনি হাসলেন। বললেন, ‘এবার তাহলে কাজের কথায় আসা যাক।‘ টেবিলের রাখা হাতে লেখা একটি পুরনো খাতা আমার সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখো তো পড়া যায় কি না।‘ 

আমি লেখার খাতায় চোখ বুলাতে শুরু করেছি। কিছু শব্দ পড়তে কষ্ট হচ্ছে। যেখানে যেখানে আটকে যাচ্ছি, কবি সেখানে চোখ বুলিয়ে শব্দগুলো বলে দিচ্ছেন। কয়েক জায়গায় তিনি নিজেও আটকে যাচ্ছিলেন। বয়সজনিত কারণে বোধকরি চোখ তাঁকে ফাঁকি দিতে শুরু করেছিল। কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর আমার কাছে অনেকটাই সহজ হয়ে এলো। কবি আমাকে ধীরে ধীরে শেষ করার তাগিদ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি কী একটা ওষুধ খাবেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামও নেবেন। শয়নকক্ষে যাওয়ার আগে আমাকে বললেন, ‘দুপুরের খাবার আমার সঙ্গে খেয়ে যাবে কিন্তু।‘ 

ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম শেষে কবি ফিরে এলেন খাবার টেবিলে। ততক্ষণে আমার পড়া শেষ। ভেতরে উত্তেজনা। এতক্ষণ যা পড়লাম, পরতে পরতে চমকপ্রদ তথ্য। বিশেষত, সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়টিকে তাতিয়ে দিতে সহায়তা করা কবির ‘খোলা কবিতা’ লেখার প্রেক্ষাপট আর প্রভাব বিস্তারিত লেখা রয়েছে এ খাতায়। কবিতাটি লেখার কারণে সাভার সেনানিবাসে কবিকে সাড়ে ৩ ঘণ্টার ইন্টারোগেশন, এমনকি তারও আগে আরেক সামরিক শাসক [পাকিন্তান পর্বে] আইয়ুব খানের শাসনামলে ছাত্রাবস্থায় সামরিক আদালতে সশ্রম কারাদণ্ড হওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা করা। সত্যি বলতে এর আগে মোহাম্মদ রফিকের কবিতা খুব একটা পড়িনি। তবে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ভাষা ও সাহিত্যে একুশে পদক পাওয়া এই কবির ‘খোলা কবিতার’ বিখ্যাত লাইন, ‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,/ দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।’— এই দুই পঙ্ক্তি মাথায় গেঁথে ছিল।  

‘যা ছিল বলার’ শিরোনামের বিশাল লেখাটির অল্প কিছু জায়গা বুঝতে অসুবিধা হওয়ায় চিহ্নিত করে রেখেছিলাম। মোহাম্মদ রফিক বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর ধারণা ছিল আমি অনেক শব্দেই আটকে যাব। এমনটা ঘটেনি বলে তিনি খুশি। আমি সুযোগ বুঝে ‘খোলা কবিতা’ প্রসঙ্গ তুললাম, যা একটু আগেই পড়েছি। তখন এত সাহস কিভাবে করলেন জিজ্ঞেস করায় বললেন, সময়ই তাঁকে এ পথে নামতে বাধ্য করেছে। এরশাদের সামরিক শাসন জারির পর মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ করার ঘটনা; বিশেষত লম্বা চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা তাঁকে অপমানিত করেছিল। কারণ কবি তখন লম্বা চুল রাখতেন। পরে জাতীয় পত্রিকায় এরশাদের নামে কবিতা ছাপা হতে দেখে একে বাংলাসাহিত্যের বড় কবিদের তথা জাতীয় অপমান হিসেবে নিয়েছিলেন। যে কারণে ‘খোলা কবিতা’র অবতারণা।

‘আমি বিশ্বাস করতাম আমার যা কিছু বলার মতো, তার বাহন তো কবিতাই। তা ছাড়া আর কী বা হতে পারে।‘ বলছিলেন মোহাম্মদ রফিক। 

তিন.

‘যা ছিল বলার’ থেকে কিছু অংশ এখানে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। 

কবি মোহাম্মদ রফিক লিখেছেন: ২৪ মার্চ ১৯৮২। আমি ফিরছিলাম খুলনা থেকে। সকালের বাসে। আগের দিন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আযম খান কমার্স কলেজের নবনির্বাচিত ছাত্র-সংসদের অভিষেক। আমি ছিলাম প্রধান অতিথি। গরীব নেওয়াজ কোম্পানির (এখন নেই, উঠে গেছে) খুলনা-ঢাকা রুটের লাক্সারি বাস শিরমনি পৌঁছতেই, আমাদের স্থানটিকে অতিক্রম করে গেল দু-তিনটে মিলিটারি ট্রাক। ট্রাকের ছাদ খোলা, গাদাগাদি করে, দাঁড়িয়ে ডজনতিনেক সশস্ত্র মিলিটারি সেপাই, সামরিক পোশাকে। সামান্য খটকা লাগল। তাহলে কিছু কী ঘটেছে, ঢাকায়। ভাবলাম তেমন তো হওয়ার কথা নয়, অন্তত এই সময়ে। যে ভাবেই নির্বাচিত হোন না, প্রেসিডেন্ট জাস্টিস সাত্তারের সরকার, কাজ তো মোটামুটি, জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। জনমনে প্রত্যাশাও জেগেছে, হয়তো অমূলক তবু, আগামীতে সুষ্ঠ নির্বাচন হলেও হতে পারে। নচেৎ আদায় করে নেয়া যাবে, যা-ঠুনকো এই প্রশাসন। সংশয় রয়েই গেল। অগত্যা, ক্লান্ত ও নির্ঘুম মাথা এলিয়ে দিলাম সিটে।

হতে পারে, বাসের ঝাকুনিতে, পাতলা নিদ্রায় জড়িয়ে গিয়েছিল চোখ দু’টি, ঘোর কাটল ফরিদপুরের মোড়ে পৌঁছে। টনটন করছিল পা। সামান্য সময় পার হতেই বুঝলাম, পরিশ্রান্ত যন্ত্রদানব এখন ক্ষানিকক্ষণ জিরোবে, জল খাবে। উঠে পড়লাম, দাঁড়ালাম বাইরে এসে, বাতাসে। সামনে, একটা ছনছাওয়া ঘর। লোকজন ঢুকছে, বের হচ্ছে। চায়ের দোকান বোধহয়। দেরি না করে, আড়মোড়া ভেঙে, পা বাড়ালাম। অর্ডার দিতেই এক কাপ ফুটন্ত চা-ও এসে গেল। এইসব দোকানে, গরম-গরম চা, সদাই প্রস্তুত, ফুটছে উনুনে। স্বাদ যেমনই হোক! ভয়ে-ভয়ে ঠোঁট নেমে এল। দুটি চুমুক দিয়েছি কি দিইনি, সেই চা নামক বিস্বাদ বস্তুতে, সামনে দেখি উৎসুক জনতার ভিড়। বিস্ময় কাটতে না কাটতেই; উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, প্রায় একসঙ্গে, আপনি কোন তরিকার লোক! আপনি কোন পীরের মুরিদ। বুঝলাম, আমার ঘাড় অবদি ছড়ানো চুলের রাশি, তাদের উৎকণ্ঠার কারণ। আমি তরিকাও বুঝি না, পীর চেনার কোন হেতুও ঘটেনি, ততদিনে। আমি হতবাক দুটি বোকা-বোকা চোখ মেলে তাকিয়ে রইলাম। একজন সামান্য এগিয়ে এসে বলল, জানেন না সামরিক আইন জারি হয়েছে! গোয়ালন্দ ঘাটে চুল কাটছে। আপনার চুলও কেটে দেবে। আমার চুল কাটবে, কে? নিজের অজান্তেই কুঁচকে গেলাম, আত্মসম্মান! একজন, বোধহয় অযাচিত ভাবে পরোপকারি, এগিয়ে এলেন, দেখুন বলবেন, আপনি অমুক পীরের মুরিদ। একজন পীরের নাম-পরিচয়ও বাতলে দিলেন ভদ্রলোক। এতদিনে ভুলে বসে আছি। তাদের উৎসাহ ও উপদেশে, আমার অপমান বোধহয় শুধু বেড়ে গেল।

এক সময় বাস ছাড়ল। গোয়ালন্দ ঘাটও পার হলাম। বিপত্তি কিছু ঘটল না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও পৌঁছলাম সন্ধে-সন্ধি, অক্ষত। তবে, অপমানবোধ, আত্মসম্মান আমাকে ছাড়ল না। ঘুম হয়নি সে রাতে। সুখে-দুঃখে কেটে যেতে থাকল দিবস-রজনী। ভারাক্রান্ত মন। ক্লাস নিচ্ছি, কাজকম্মও করছি, কিছু কিছু, তবে সামান্যই। হঠাৎ একদিন, দৈনিক বাংলার, প্রথম পৃষ্ঠায়, আবিষ্কার করে বসলাম, বড়-বড় হরফে মুদ্রিত একটি কবিতা। এমন ঘটনা সচরাচর ঘটে না। ঘটার কথাও নয়। ঘটেওনি ইতিপূর্বে। রচয়িতা প্রধান সামরিক আইন প্রণেতা; লে: জে: মুহাম্মদ এরশাদ। স্বঘোষিত কবি, তার কবিতা, মুদ্রিত দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায়, উজ্জ্বল হরফে। আমার মনে হলো, আমার ব্যক্তিগত অপমান, রূপান্তরিত হলো জাতীয় অপমানে। শুধু তা-ই নয়, এ যেন গোটা বাংলা কাব্য সাহিত্যের অপমান, সমগ্র সাহিত্যের ওপর বজ্রাঘাত। অসহনীয়। শুধু কী অসহনীয়, না, তারও থেকে বেশি কিছু! হারাম হয়ে গেল ঘুম, দিনের পর দিন। কোথায় পালাল স্বপ্ন, আত্মধিক্কারে।

১৯৫৮। একটু পিছনে ফেরা যাক। খুলনা জিলা স্কুল থেকে সবে মেট্রিক দিয়েছি। সে কালে বর্তমানের এস. এস. সি-কে বলা হতো মেট্রিক। বয়স ১৫। জারি হলো সামরিক আইন। শুরু তদানীন্তন অখণ্ড পাকিস্তানে আইউবি সামরিক শাসন। কী দৌর্দণ্ড প্রতাপ তার। মাথার ওপর সর্বক্ষণ বিজাতীয় কালো বুর্য। প্রাণখুলে কথা বলারও উপায় নেই, অথচ তখনই তো আমার নিজেকে ব্যক্ত করার কাল, মুক্ত হওয়ার উদার পরিবেশ। গুটিয়ে এল, চতুর্দিকে প্রতিক্রিয়ার বেড়াজাল। দিন-দুপুরে ছায়া ফেলত বিদেশী ভূতেরা। কী চেহারা তার, আস্ফালন। ’৫৮ থেকে ’৬৮। দীর্ঘ দশটি বছর। ঢাকা-বগুড়া-রাজশাহী হয়ে ফের ঢাকা। পুরো ছাত্রজীবন ধরে সংগ্রাম সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে, মুক্তবুদ্ধির স্বপক্ষে, কথা বলার অধিকার চেয়ে লড়াই। লড়াই, সংগ্রাম, জেল, জুলুম, দফারদা হয়ে গেল ছাত্রত্বের। ছাত্র জীবনের স্বাদই বঞ্চিত রয়ে গেলাম। আইউবের পর ইয়াহিয়া। অতঃপর ঊনসত্তরের উত্তাল গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা। কী আশ্বাস ও বিশ্বাস বুকে ভরে নিয়ে দেশে ফিরে এলাম, মুক্ত স্বদেশে, ভাবতে আজও শরীরের লোম শিউরে ওঠে। কিন্তু সামরিক আইনের ভূত-পেত্নি, অপদেবতা কী পিছু ছাড়ল। না! প্রথমে জিয়াউর রহমান এবং তার লেজে-লেজে এই লে. জে. মুহাম্মদ এরশাদ। 

ভাবলাম, কে চিনত তাকে, এতদিন। মুষড়ে ছিলাম, এখন মর্মও ভেদ হয়ে গেল। যেন নেমে এল, মড়ার ওপরে খাড়ার ঘা, তিনি কবি! মেনে নিতে হবে। কাকে? সমগ্র দেশবাসীকে। তার সঙ্গে, আমাকে! আত্মারাম খাঁচা ছেড়ে যাওয়ার তা হলে বাকি রইল কী আর! ধৃষ্টতা, অপমান। অপমান কার? বাংলা কবিতার কবিকূলের। রবীন্দ্রনাথের! নজরুলের! জীবনানন্দের। অথচ দেখলাম, কোন কোন খ্যাতিমান কবিও, ইতিমধ্যে জুটে গেছে, সামরিক শাসকের আশেপাশে। পরিষদবর্গ আর কাকে বলে! আর এইসব বরেণ্যবর্গদের উপস্থিতিও লোকচক্ষুর সম্মুখে কার্পণ্য নেই লে. জে.’র। না থাকারই কথা। নিজের হাত নিজেই দংশন করা ছাড়া, যেন আর উপায় রইল না।
আত্মধিক্কারের বিষে-বিষে, নীল হতে হতে, এক রাতে বসে পড়লাম, টেবিল-চেয়ারে, সম্মুখে খাতা-কলম বিছিয়ে। মুক্তি চাই, আমি মুক্তি চাই, এই আত্মধিকার, অক্ষমতাবোধ, দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই। 

মনে পড়ে, লিখেছিলাম সারারাত ধরে। জানালায় আলো এসে টোকা দিতে, চমকে গেলাম। আর কত!

চার.

১৯৪৩ সালে বাগেরহাটে জন্ম নেওয়া মোহাম্মদ রফিক পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলন ও কবিতায় ভূমিকা রাখেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ২০০৯ সালে অবসরে যাওয়ার পর থেকে সময় কাটছিল বাসায়। আসলে সময়ই তাঁকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি করে তুলেছিল। এরশাদের শাসনামলে সেনানিবাসে সাড়ে ৩ ঘণ্টার ইন্টারোগেশন যাঁকে দমাতে পারেনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যিনি উপেক্ষা করতে পারেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। মরণোত্তর গার্ড অব অনার বা ফুলেল সম্মানের মোহ যাকে ছোঁয় না- সেই তেজী কবি মোহাম্মদ রফিক কি মরণে হারিয়ে যেতে পারেন? একেবারেই না। মরদেহ মাটি গ্রাস করে সত্য, মানুষের পক্ষে লিখে যাওয়া কাব্য-কথা কবিকে মরতে দেয় না। মোহাম্মদ রফিকের সৃষ্টিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে।  

লেখক: গল্পকার ও সাংবাদিক   
 

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়