ঢাকা     সোমবার   ১৫ জুলাই ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

অগ্রন্থিত গল্প

জীয়নকাঠি

জহির রায়হান, সংগ্রহ ও ভূমিকা: কাজী জাহিদুল হক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ৩০ জানুয়ারি ২০২৪   আপডেট: ১৬:৫৪, ৩০ জানুয়ারি ২০২৪
জীয়নকাঠি

'ভোর অইছে। দুয়ার খোলা। ভোর অইছে।'
ময়নার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল রমজানের। মাদুরসহ কাঁথাবালিশটাকে মুড়িয়ে রেখে, দোকানের ঝাঁপিটা তুলে দিলো সে। বাইরের কনকনে শীত। ঝাপিটা তুলে দিতেই এক হলকা ভিজে বাতাসে শরীরটা শিরশির করে উঠলো তার। ময়লা চাদরটা ভালো করে গায়ে-মাথায় জড়িয়ে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে বেরিয়ে এলো রমজান। শেষ রাতের কুয়াশায় মাটিটা ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। গাছের পাতা চুইয়ে চুইয়ে এখনো টিপটিপ শব্দে শিশির ঝরে পড়ছে মাটিতে। ভেজা মাটিতে পা পড়তে গায়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠল তার। রাস্তাটি ডিঙিয়ে অনেকটা লাফাতে লাফাতে ওপাশে এঁদো ডোবাটায় নামলো সে। ওরে বাপরে কি ঠান্ডা! পানিতে হাত দিয়েই হাতটা টেনে নিলো রমজান। অনেক কসরত করে তারপর হাত ধুলো সে। দোকানে ফিরে এসে মাচাঙ্গের ওপর থেকে শুকনো কাঠগুলো নামিয়ে নিয়ে চটপট চুলোর আগুনটা ধরিয়ে দিলো রমজান। হাত দুটো আগুনে সেঁকে নিলো। তারপর ঘরটা ঝাড় দিয়ে, টেবিল-চেয়ারগুলো গুছিয়ে নিয়ে চুলের ওপর চায়ের কেটলিটা চড়িয়ে দিয়ে, আরাম করে হুকোতে তামাক সাজলো সে।

এখন নয়, আরো অনেক পর যখন কুয়াশা কেটে যাবে, তখন লোক চলাচল শুরু হবে এ-সড়কে। দূর গ্রাম থেকে দল বেঁধে লোকজন এ-সড়ক বেয়ে সদরে যাবে। কেউ যাবে সওদা করতে। কেউ যাবে পেটের ধাঁধায়। কেউ যাবে মামলা মকদ্দমার তদবির করতে। বেলা থাকতেই আবার ফিরে আসবে তারা, ফিরে আসবে দলে দলে।
দিনের বেলা লোকজনের চলাচল হরদম লেগেই থাকে। শুধু রাতের বেলা নির্জীবের মতো পড়ে থাকে বহুদিনের পুরনো এই আঁকাবাঁকা সড়ক। দুধার তার বিস্তীর্ণ মাঠ আর অসমতল ভূমি। বর্ষায় অথৈ জলের নাচন ওঠে। গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ করে সমস্ত প্রান্তর।

আশে-পাশে দু'চার মাইলের মধ্যে রমজানের চায়ের দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান নেই। সদরের যাওয়া-আসার পথে অনেকে তার দোকানে কিংবা দোকানের সামনের চত্বরটাতে বিশ্রাম নেয়। চা বিস্কুট খায়। হাত-পা ছড়িয়ে গল্পগুজব করে। বিড়ি ফোকে।  তারপর চলে যায়। বিকেলে ফিরতি পথে আবার দেখা হয় ওদের সাথে।
হুঁকোতে ধুয়া ছাড়তে ছাড়তে আগুনের পাশে এসে বসলো রমজান। একবার বাইরে রাস্তার দিকে তাকালো আরেকবার তাকালো নিজের ঘরটার দিকে। তারপর, গায়ের চাদরটা ঠিক করতে করতে বলল, 'বাপরে বাপ, কি শীত! এমন শীত তো চৌদ্দ পুরুষের জন্মেও দেখি নাই!'
উপরে ঝুলানো খাঁচা থেকে ময়লাটা বলে উঠলো, 'দেহ নাইরে-দেহি নাই-দেহি নাই।'

রমজান ঘাড় বাঁকিয়ে এক পলক দেখে নিলো ময়নাটাকে। ওই ময়নাটাই ওর দিনরাতের সাথি। যখন একা একা মনটা একেবারে নির্জীব হয়ে পড়ে তখন ওটার সাথে কথা বলে রমজান।

রমজান বিয়ে করেনি। বিয়ে করলে এত দিনে হয়তো ছেলেপিলেতে ঘর-সংসার ভোরে উঠত ওর। কিন্তু বিয়ে... বিয়ের কথা ভাবতে গেলে মনটা বিষিয়ে ওঠে। বাবাকে মনে পড়ে। মাকে মনে পড়ে। আর ওদের কথা মনে পড়লে সমস্ত শরীর রাগে জ্বলে ওঠে ওর। সারাটা জীবন বাবাকে জ্বালিয়ে মেরেছে মা। বাবাও কম জ্বালায়নি মাকে। রাত দিন শুধু ঝগড়া, ঝগড়া আর ঝগড়া। বাবার হয়তো সংসার চালাবার পুরো সামর্থ্য ছিল না। আর তাই নিয়ে সকাল-সন্ধ্যে বাবাকে খোটা দিতো মা, বলতো, ভাত-কাপড় দিবার মুরাদ নাইতো বিয়া করছো ক্যান।

বাবাও কম যেত না। চুলের ঝুঁটি ধরে সময়ে-অসময়ে এলোপাতাড়ি মারতো মাকে। মাঝে মাঝে রমজানের মনে হতো, এতো সংসার নয়, দোজখ-খানা। তারপর এক রাতে মার খেয়ে মা কোথায় বেরিয়ে গেল। কোথায় যে গেল, আর ফিরলো না। আর তার দিন সাতেক পরে কী যে হলো, গলায় কলসি বেঁধে শেখদের বড় পুকুরে ডুবে মরল বাবা। সেই থেকে সংসারের প্রতি একটা গভীর বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে রমজানের। বিয়ে করে জীবনে অশান্তি বাড়ানোর কোন অর্থই হয় না। এমনিতে বেশ সুখেই আছে সে। ভালই আছে।

হুঁকোটা একপাশে ঠেলে রেখে চুলোর আগুনটা আরো একটু বাড়িয়ে দিলো রমজান। সামনের সড়ক দিয়ে তিনটে গরুর গাড়ি কর্কশ শব্দ করতে করতে এগিয়ে গেল সদরের দিকে। সেদিকে এক নজর তাকালো সে।

একটু পরেই একদল লোক জোর গলায় কথা বলতে বলতে ওর দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো। বুড়োগোছের একজন লোক এগিয়ে এসে বলল, ‘ভাই গো রমজান আলী আগুন জ্বালাইছ না কি : চা বিস্কুট দাও আমাগোরে, খাই।’

‘আরে চাচা মিয়া যে, আহেন আহেন’ লম্বা টুলটা মুছে দিয়ে চাচা আর তার সাথি তিনজনকে বসতে বলল রমজান। তারপর চা তৈরি করতে করতে আবার ভললো, ‘তারপর, আজকাও কি চাচার হামলার তারিখ নাকি?’
'হু, আজকা মামলার তাই বাহির আইবো।’ দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে চাচা বললো, ‘কে জানে কি রায় বাহির অয়!’
সাথের একজন অভয় দিলো। 'ঘাবড়ায়েন না হুজুর, মামলায় আপনেই জীতবেন। যেই সাক্ষী দিছি...।'
আর একজন বললো, ‘আপনের বাপজান সারাটা জিন্দেগি কত মামলা-মোকদ্দমা কইরছে। হারে নাই কোনদিন।’

‘আরে তিনিতো আছিলেন রীতিমতো পাকাপোক্ত আদমি।’ তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তৃতীয়জন বললো, ‘মামলা-মকদ্দমার সকল রকমের মারপ্যাঁচ তার একেবারে মুখস্ত আছিল। কোন সময় কোন চাল চালাইতো অইবো, সব জানতেন। মুইর মনে আছে, একবার এক মামলায় বড় বেকায়দায় পইড়া গেছলেন তিনি। প্রায় হার হয় হয় অবস্থা। এমন সময় গোপনে বিবাদীর উকিলরে মোটা রকমের ঘুষ দিয়া, মামলার চেহারায় বদলাইয়া দিছলেন তিনি। এমন পাকাপোক্ত মানুষ আইজকাইলকার দিনে কই পাইবেন?’
‘হা, তাতো ঠিক, ঠিক।' চাচা ঘাড় নাড়লো।
ময়নাটা বোল দিয়ে উঠলো, ‘ঠিকরে ঠিক ঠিক।’
মুখ তুলে সেদিকে তাকিয়ে চাচা হেসে উঠলো। ‘বাঃ তোমার ময়নাতো দেহি আচ্ছা বোল শিখছে মিয়া।’
রমজান কিছু বললো না। মৃদু হেসে কিছু বিস্কুট আর চার কাপ চা তাদের সামনে এগিয়ে দিলো।

চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে চাচা উঠে দাঁড়ালো। ‘চললামরে রমজান আলী, দোয়া করিস। মামলায় জিতলে লাল টুকটুক একটা মাইয়া দেইখা তোরে বিয়া করাইয়া দিমু, বুঝলি?’
'না হুজুর, আর যা করেন, ওই কারবারটা কইরেন না।’ রমজান রেগে উঠলো, ‘বিয়াশাদির ভেতর আমি নাই।’
‘দুর পাগলা।’ চাচা হেসে উঠলো, ‘আচ্ছা যাই। দোয়া করিস।’
‘হ-তা তো করমু চাচা একশোবার করমু। আল্লায় আপনেরে মানে-সম্মানে জিতাইয়া আনুক।’ বলে উর্ধ্বে  হাত তুলে চাচার জন্য দোয়া করলো রমজান।
ওরা চলে গেলে একতালা মুড়ি নিয়ে বাইরে চত্বরটার উপর এসে বসলো রমজান। কুয়াশা কেটে গিয়ে সূর্য উঠেছে। আগের মতো শীত আর লাগছে না এখন, বসে বসে আপন মনে মুড়ি চিবাচ্ছিল রমজান। একটা বুড়ো; বাঁ হাতে তার একটা কাপড়ের পুটলি; লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে বসলো চত্বরটাতে। দেখে মনে হলো, দীর্ঘ পথ হেঁটে সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে। অসংখ্য ভাঁজ পড়া কপাল আর ভাঙা, চিপুক ফোঁটা ফোঁটা ঘাম নেমেছে তার। গায়ের ফতুয়াটা সাদা সবুজ অনেকগুলো তালির নিখুত কারুকার্যে ভরা।

লাল চামড়ায় ঢাকা ধূসর চোখ দুটো মেলে পিটপিট করে বারকয়েক রমজানের দিকে তাকালো সে। মুড়ি চিবোতে চিবোতে স্বভাবসুলভভাবে রমজান জিজ্ঞেস করল, ‘বুড়ো মিয়ার বাড়ি কই?'
‘নবীনগর, চৌদ্দগ্রাম।’ মিনমিনিয়ে জবাব দিলো বুড়ো। তারপর হাতের পুটলিটা খুলতে খুলতে বলল, ‘এক বাটি পানি দিবার পারেন মোরে?’
‘দিই' বলে পানি আনতে উঠে দোকানে গেল রমজান। বুড়ো ততক্ষণে পুটলি থেকে একটা রশসর পিঠা বের করে চিবুচ্ছিল আপন মনে। পানির বাটিটা হাতে তুলে নিয়ে রমজানকে দোয়া করলো সে। ‘আল্লাহ আপনারে বাচাইয়া রাখুক। আহেন, পিঠা খান।’ 
রমজান সসঙ্কোচে হাত নাড়লো, ‘না, না, আপনি খান। আমি মুড়ি খাইতাছি।’

‘আরে খান না। নেন নেন খান। কী আইবো?' বুড়ো জোর করে দুটো পিঠে গুঁজে দিল ওর হাতে। তারপর বললো, ‘রসের পিঠা, আমার মাইয়ায় নিজ হাতে বানাইয়াছে।’
বুড়োর পাশেই বসেছিল রমজান। পিঠে খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো, ‘সদরে কী কাজ বুড়া মিয়ার?'
‘মামলা আছে একখান। আইজকা রাই বাহির আইবো।’
‘কী মামলা, দেওয়ানী না ফৌজদারি?’
‘ফৌজদারি।’ হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেল বুড়ো। বিড়বিড় করে বলল, ‘মিথ্যা মামলা... ডাহা মিথ্যা মামলা ঝুলাইয়া দিছে মুইর নামে। খোদায় ইনসাফ করবো। খোদা মুইর সাক্ষী।’
খোদা সাক্ষীরে। খোদা সাক্ষী। খোদা সাক্ষী। ময়নাটা বোল দিয়ে উঠল খাঁচার ভেতর থেকে। এতদূরে, বুড়োর কানে এলো না তার বোল।
ঔৎসুক্য ভরে রমজান জিজ্ঞেস করলো, ‘কার সঙ্গে মামলা?’
উত্তরে যার নাম বললো বুড়ো, তার নাম শুনে ঈষৎ চমকে উঠলো রমজান।
‘চাচা মিয়া?’
পলকে ভুরু কুঞ্চিত করল সে।

পিঠে খেতে খেতে অনেক কথাই বলল বুড়ো। নবীনগর খালপাড়ে ছোট্ট এক টুকরা জমি ছিল ওর বাবার। সে জমিতেই সকাল থেকে সন্ধ্যা খাটতো ওরা। ফসল বুনতো। কিন্তু সেবার সেই বছর চল্লিশেক আগে হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে সমস্ত ফসল মারা গেল। নতুন করে বীজ ধান কেনার সামর্থ্য ছিল না। ঘরেও খাবার চাল ছিল না ওদের। আর তাই, চাচা মিয়া বাবার কাছ থেকে মাসে টাকা প্রতি দুআনা সুদে ত্রিশটা টাকা ধার নিয়েছিল বাবা। কথা ছিল, এমনিতে টাকাগুলো শোধ করার সামর্থ্য তো ওদের নেই। তাই ওরা বাপ-ছেলে গায়ে খেটে শোধ করবে ওই টাকা। কথামতো খেটেছেও ওরা। একদিন নয়, এক বছরও নয়, বছরের পর বছর। প্রতিবছর শেষে চাচা মিয়ার বাবা হিসাবের খাতা দেখিয়া বলেছে আসল টাকা শোধ তো দূরের কথা, গত বছরের সুদের টাকা শোধ করার লাগিয়াই আরো এক বছর খাটতে অইবো তোমাগরে।

ইতা কিতা কন হুজুর! বাবা অবাক হয়ে শুধু তাকিয়েছিল তার দিকে। মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস করেনি। তারপর আরো অনেক বছর গেছে। কত বছর তা হিসাব নেই বুড়োর। বাবা মারা গেল ওর। চাচা মিয়ার বাবাও মরলো। মরলো গাঁয়ের অনেকে। কিন্তুক, শুইনতে কিচ্ছার মতো শোনায়, ত্রিশ টাহার সুদে আসলে ত্রিশ বছর খাইটাও শোধ অইল না। যে শুইনছে এই কথা, পাগল বইলা গাল দিছে মোরে। কইছে, তোমারে বোকা পাইয়া খাটাইয়া নিতাছে চাচায়। কাজ বন্ধ কইরা দাও মিয়া। দেহি কী করে। আর তাই সত্যি সত্যিই একদিন কাজ বন্ধ করে দিলো বুড়ো। বলল, হুজুর! মুইতো জিন্দেগিভর খাইটলাম। মুইর চৌদ্দ পুরুষও যদি জিন্দেগিভর খাইট্টা মরে, আপনের ত্রিশ টাকা শোধ যাইবো না। দোয়াই আপনের মাফ কইরা দেন। আর পারবু না।

শুনে তির্যক হাসি ছড়িয়েছে চাচা মিয়া। অত শত কথা বুঝি না। টাকা আমার শোধ করা লাগবই। তা গায়ে খাইটা পারো কি ঘর ভিটা বেইচা পারো যেমন কইরা হোক।
তবু কোথা থেকে যে তখন এত মনের জোর পেয়েছিল বুড়ো কে জানে। চাচা মিয়ার কঠোর শাসানি উপেক্ষা করে কাজ বন্ধ করে দিলো সে। আজ তারপর মাস দুয়েক যেতে না যেতেই তার নামে একটা মিথ্যে চুরির মামলা ঢুকিয়ে দিয়েছে চাচা মিয়া। 

‘আল্লাহই ইনসাফ করবো, ইনসাফ করবো আল্লায়।’ বুড়ো বিড়বিড় করে উঠলো। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, নিজের জায়গা তো কোনো চিন্তা নাই বুড়ো মানুষ কবরে ডাক দিছে কিন্তু চিন্তা ওর এক রুপি মাইয়াটার লাইগা। 

লুঙ্গির ফুটে চোখের পানি মিশলো তারপর ঢক ঢক করে পানিটা খেয়ে নিয়ে ধীরে উঠে দাঁড়ালো সে। ‘দোয়া কইরেন যদি জিতি, ফিরবার পথে দেখা আইবো আবার।’ বলে রাখি ঘর দিয়ে আবার সদরের পথে হাঁটতে শুরু করলো বুড়া। রমজান অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, খোদা হাফেজ খোদায় তোমারে বাঁচায় আনুক। দুপুরটা কাটলো রমজানের একটা গভীর অসোয়াস্তির ভেতর। দোকানটিকে দু-দুবার ঝাঁট কি দোষে চায়ের কাপগুলো ধুলো মুছলো। ময়নাটাকে গোসল করিয়ে খেতে দিলো। খদ্দেরও বিদায় করল জনা বিশেক। কিন্তু সব কাজের ফাঁকে দূরের কথা মনে পড়ল ওর, চাচা মিয়ার কথা মনে পড়ল, কি রায় বেরোলো ওদের মোকদ্দমায়? দোকানে আর চত্বরে বেশ কবার আনাগোনা করলো সে, লম্বা সড়ক পেয়ে সদরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে বারবার করে তাকালো- কেউ কি ফিরে আসছে সেই বুড়ো কিংবা চাচা মিয়া। একজন নিশ্চয়ই ফিরে আসবে কিন্তু রমজানের অসোয়াস্তি বেড়েই চলল কারো ফিরে আসার নাম নিশানাও দেখা গেল না। 

সকালে যারা গিয়েছিল তাদের মাঝে অনেকেই ফিরে আসতে লাগলো। কারো হাতে বউয়ের জন্য নতুন কাপড়। নিজের জন্য কিনা লাল লুঙ্গি। কারো মাথায়  লাউ কুমড়ার ঝুড়ি। কারো বগলে টুকরো মালপত্রের বোঝা। তাদের অনেকেই সামনের চত্বরে বসে বিশ্রাম নিলো। চা বিড়ি খেলো গল্পগুজব করল তারপর চলে গেল।

পড়ন্ত বিকেলে অদূরে বটগাছটার নিচে এসে বসলো রমজান। একটা গোল ৪ আনি ঊর্ধ্বে ছুড়ে মেরে মামলার রায় কার পক্ষে যেতে পারে তা বিচার করে দেখলো। সে যদি চাঁদ তারা উপরে থাকে তাহলে বুড়োর হার হয়েছে। আর যদি লতাপাতার দিকটা উপরে থাকে তাহলে চাচা মিয়ার হার। রমজান অবাক হয়ে দেখলো চাঁদ তারা তাই উপরে রয়েছে। না এবার হলো না মনে মনে ভাবলো সে। তারপর আর একবার চার আনিটা উঠিয়ে ছুড়ে মারল। এবারও চাঁদ তারা উপরে! দূর এবারও হলো না। আর একবার এই শেষবার, এবার যা হবে তাই মকর তোমার রায়। রমজান দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলো এবার। কিন্তু লতাপাতার দিকটাই উপরে রইল দেখে আনন্দে চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো রমজানের। বুড়োই জিতেছে হ্যাঁ বুড়োই জিতবে।

‘রাত হয়েছে। বাতি জ্বালো রাত হয়েছে।’ ময়নার ডাকে চমক ভাঙলো তার। উঠে এসে ভাঙ্গা লন্ঠনটাই তেল ঢেলে আগুন জ্বালালো। শীত পড়তে শুরু করেছে কনকনে শীত খদ্দরের মোটা চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল সে। কানজোড়া ঢেকে দিল, তারপর চত্বরে বসে সদরের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তীব্র প্রতীক্ষা ব্যাকুল করে তুলল তাকে। মূলত এখনো ফিরল না চাচামিয়ার কি খবর রমজান ভাবছিল। চাচামিয়ার কণ্ঠস্বরে হঠাৎ চমক ভাঙলো তার। কই গো রমজান আলী- কোন হানে আছো তুমি জলদি কইরা চায়ের পানি চড়াও, পানি চড়াও জলদি কইরা। 

রমজানের মনে হলো যেন পায়ের তলার মাটিটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল ওর। বট গাছটার ডালে যেনো একটা বজ্রপাত হলো। 
‘আরে মিয়া হা কইরা দাঁড়াইয়া রইলা কেন? চায়ের পানি চড়াও।’ মামলায় জিত হইছে মোর জিৎ হইছে।’ ময়লা দাঁত বের করে হাসলো চাচা মিয়া। একজন সাথী বলল, ‘মুই জানতাম হুজুর আপনি জিতবেন আপনের বাবা জানো মামলায় কোনদিন হারে নাই।’
রমজান তখনও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল ওদের দিকে। সম্বিত ফিরে আসতে ব্যস্ত সরে জিজ্ঞেস করল, কি রায় হয়েছে- মামলায় বুড়ো মিয়ার কি খবর?’
‘আর বুড়ো মিয়া! বুড়ো মিয়ার তিন বছর জেল হইয়া গেছে।’ মুখ বিকৃত করে দ্বিতীয় সাথী বলল। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো রমজানের। চাচা মিয়া বাঁকা হেসে বলল, ‘জেল হইবো না আমার সঙ্গে লেখা চিঠি এইবার বুঝুক ঠেলা।’
তৃতীয়সাথী বলল, ‘কে জানে বুড়া বোধহয় আপিল করবার পারে।’ ‘
‘আরে দূর!’ চাচামিঞা হেসে উড়িয়ে দিল। ‘কানা পয়সা নাই বেটার এমনিতেই মামলা চালাইতে চালাইতে ফকির হইছে আবার আপিল করবো? দেহ নাই মামলার রায় সুইনা ব্যাটা কেমন করে কাইন্দা দিছিল।’
‘হ্যাঁ হুজুর দেখেছি।’ বাকি চারজনে একসাথে সমর্থন জানালো তাকে। খাচার ভিতর থেকে ময়নাটা হঠাৎ পাখা ঝাপটিয়ে উঠলো। ‘দেখছি রে দেখছি খোদা সাক্ষী রে খোদা সাক্ষী।’ 

ওরা চলে যেতে বেঞ্চের উপর ঝিম ধরে অনেকক্ষণ বসে রইলো রমজান। উঠে ঝাপিটা বন্ধ করে দিল। বাতিটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ল সে।
রাত যত এগোচ্ছিল শীতের প্রকোপ ততই বাড়ছিল প্রান্তরের উপর দিয়ে হু হু করে ছুটে আসা বাতাসে যেন হিমালয়ের তুষার ভেসে আসছিল। বাইরে আর কোন সাড়াশব্দ নেই, শুধুমাত্র ঝিঝি পোকার একটানা ডাক। হাজার চেষ্টা করেও ঘুমোতে পারল না রমজান। চোখ বন্ধ করলেই বুড়োর মুখটা ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে তার কুঁজো হয়ে পড়া দেহ, ঘোলাটে চোখ। 

দোয়া কইরেন চলি এইবার যদি মকদ্দমায় জিতি ফিরবার পথে দেখা অইবো আবার।’ হঠাৎ ধরফর করে উঠে বসালো রমজান। নিজের লাইগা তো কোন চিন্তা নাই। চিন্তা কেবল ওই এক রতি মাইয়াটার লাইগা। মুই ছাড়া দুনিয়াতে আর কেউ নাই ওর।’ বুড়োর কথাগুলো কানে বাজতে লাগলো। ওর মেয়েটার কথা মনে পড়ল রমজানের। কি করছে এখন মেয়েটা? বিদিন হাতে হয়তো এখনো সে দাঁড়িয়ে আছে দাওয়ায়। অপেক্ষা করছে বুড়ো বাপ কখন ফিরবে। বুকটা দুরু দুরু করে কাঁপছে তার ভয়ে আতঙ্কে আর দুশ্চিন্তায়। একটু পরেই হয়তো খবরটা শুনবে সে। শুনেই তীব্র আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়বে দেওয়ার উপর মুর্ছা যাবে। ভাবতে গিয়ে বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠলো রমজানের। ইনসাফ কি উঠে গেল নাকি দুনিয়ার উপর থেকে খোদা কি নেই?

যাবার পথে সবাই দেখলো রমজানের চায়ের দোকানের ঝাঁপিটা বন্ধ। দেখে অবাক হলো সবাই। এমন তো কোনদিন হয় না! কী হয়েছে রমজানের?
দু একজন এগিয়ে এসে ঝাঁপির উপর টোকা মেরে ওর নাম ধরে ডাকলো- রমজান আলী ও রমজান আলী ভিতরে আছোনি? রমজান আলীর কিন্তু কোন সারা শব্দ পাওয়া গেল না। তার শুধু খাঁচার ভিতর থেকে ময়নাটা চিৎকার করে বলল, ‘মুই চললাম রে ময়না সদরে চললাম। আপিল করতাম চললাম রে মুই আপিল করতাম চললাম।'

উৎস : ইত্তেহাদ, আজাদী সংখ্যা : ১৯৫৫ 

ভূমিকা

কিংবদন্তিতুল্য চলচ্চিত্রনির্মাতা হলেও প্রথমজীবনে লেখালেখির মধ্য দিয়েই সংস্কৃতির বৃহত্তর অঙ্গনে পা রাখেন জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২)। মাত্র ৩৭ বছরের জীবনে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি এমন কিছু গল্প–উপন্যাস রচনা করেছেন, বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে যা তাঁকে স্থায়ী আসন দিয়েছে।

জহির রায়হানের মৃত্যুর পর তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত একমাত্র ছোটোগল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ-এ গ্রন্থিত গল্পগুলোসহ মোট ১৯টি গল্প নিয়ে ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের গল্পসমগ্র। জুলাই ২০২২-এ প্রকাশিত জহির রায়হান রচনাসমগ্র’র সবশেষ সংস্করণে গ্রন্থিত গল্পের সংখ্যা ২২টি। কিন্তু এ কথাশিল্পীর অনেক গল্পই অগ্রন্থিত। অনুসন্ধানে এখনও তাঁর অগ্রন্থিত গল্পের খোঁজ মিলছে। প্রকাশিত ‘জীয়নকাঠি’ গল্পটি প্রথম ছাপা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে ‘ইত্তেহাদ’, আজাদী সংখ্যায়। পরে এ গল্পটি আর কোনো গল্পগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। গল্পে লেখক গত শতকের পঞ্চাশের দশকের গ্রামের জোতদার-মহাজন কর্তৃক গরিব কৃষক নিপড়নের চিত্র গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।

গল্পটি মুদ্রণের সময় বর্তমানে প্রচলিত বানানরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়