ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হিজড়াদের জীবন বদলানোর গল্প

আব্দুল্লাহ আল নোমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২২ ১২:৪৯:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-৩০ ৩:০২:৫৭ পিএম

লোকজন তাদের বলে 'হিজড়া'। সমাজে অবহেলিত তারা। পথে-ঘাটে চাঁদাবাজি আর নানা অপরাধ করে বেড়াত তারা। পরিবার পরিজনও তাদের পরিচয় অস্বীকার করত। অথচ তারাই এখন পরিবারের মধ্যমণি, অপরাধের পথ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেরাই স্বাবলম্বী। শুধু তাই নয়, অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও তারা করেছেন। তারা বলছেন, ইচ্ছাশক্তি আর মনোবল থাকলে অপরাধের পথ ছেড়ে ভালো পথে আসা সহজ, এজন্য প্রয়োজন ভালো মানুষের সহযোগিতা।

এদেরই একজন হচ্ছেন সুমি। তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ায় সিলেটের বিয়ানীবাজারে সুমিকে পরিবারের সদস্যরাই তাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা বলতো, সুমির কারণে পরিবারের মানসম্মান ডুবছে; বিয়ে হবে না অন্য কন্যাদের। এ কারণে জন্মভিটায় দরজা বন্ধ হয়ে গেছিল তার। বাড়ি থেকে বের হয়ে সুমি অন্য হিজড়াদের দলে যোগ দেন। রাস্তায় চাঁদা তুলে বেড়াতেন তিনি।

এই সুমিই এখন পরিবারের মধ্যমণি। একটি ফুডকার্ট (খাবারের ভ্যান) বদলে দিয়েছে তার জীবনের গতি। এখন তিনি দিনে আয় করেন ১৩/১৪ হাজার টাকা। সাধারণ মানুষকে হয়রানি কিংবা জিম্মি করে নয়; বরং তাদের ভালোবাসায়ই তিনি এ টাকা আয় করছেন। তার ফুডকার্টে কাজ দিয়েছেন আরও ছয়জনকে।

সুমি জানান, গত বছরের নভেম্বরে তাকে বিশেষায়িত ভ্যানগাড়িটি দেওয়া হয়। এটি প্রদান করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার জাবেদুর রহমান। এরপর থেকে বিয়ানীবাজার উপজেলার কলেজ রোডে ভ্যানগাড়ি নিয়ে বসেন তিনি। এরপর থেকেই তার বদলে যাওয়ার দিন শুরু হয়।

বদলে যাওয়াটা অবশ্য সহজ হয়নি জানিয়ে সুমি বলেন, ‘প্রথম দিকে বাজারের কমিটি সেখানে বসতে নিষেধ করেছিল। এছাড়া স্থানীয় বখাটেরা নানা কটুক্তি করত। পাশাপাশি চাঁদাও দাবি করত। পরে জাবেদ স্যারের কারণে বিয়ানীবাজার থানা পুলিশের সহযোগিতা পাই। এখন এই দোকানের খাবারের স্বাদ নিতে লম্বা লাইন পড়ে। প্রতিদিন ১৩/১৪ হাজার টাকার খাবার বিক্রি করি’।

সুমির দোকানে চানা (ছোলা), পিঁয়াজু, খিচুড়ি, আখনি, ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা বিক্রি হয়। আর স্পেশাল আইটেম হিসেবে রয়েছে ৭৫ প্রকারের ভর্তা। ক্রেতার চাপ সামাল দিতে দুই ভাইসহ মোট ছয়জনকে কাজে রেখেছেন তিনি।

সুমি বলেন, ‘বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার পর ভারতেও গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই ভর্তা তৈরির রেসিপি রপ্ত করি’।

সুমি তার দিন বদলের এই কৃতিত্ব দেন  মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার জাবেদুর রহমানকে।

তিনি বলেন, ‘জাবেদ স্যার না হলে আমরা আলোর পথ দেখতাম না। তিনিই আমার মতো হিজড়াদের খারাপ পথ থেকে তুলে এনে ভালো পথ দেখিয়েছেন। এখন আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী। আমি খুব খুশি, আমার পরিবারও আমাকে আপন করে নিয়েছে; তারা এখন আমাকে নিয়ে গর্ব করে’।

সুমির মতো ফুডকার্টে স্বাবলম্বী হয়েছেন আকাশ।

তিনি বললেন, ‘আগে মানুষদের বিরক্ত করে তোলা (চাঁদা) আদায় করতাম। কেউ না দিলে মারধরও করেছি। চলাফেরাও ছিলাম উগ্র। তবে এখন অপরাধ ছেড়ে ভালোর পথে ফিরেছি। জাবেদ স্যারের দেয়া গাড়ি নিয়ে নগরীর সুবিদবাজারে বসেছি।’

শুরুর দিকে স্থানীয় বাজারের লোকজন তাদের বসতে বাধা দিলেও এখন কোনো সমস্যা করে না। চাঁদাও চায় না। প্রতিদিন তিন-চার হাজার টাকার খাবার বিক্রি করেন বলে জানান আকাশ। তার চটপটি ও ফুঁচকার দোকানে আরো দুজনের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সিলেটের ত্রিশেরও বেশি হিজড়াকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তা জাবেদুর রহমান। গত বছরের নভেম্বরে বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি আটটি বিশেষায়িত ফুড ভ্যান তুলে দেন ২৪ জন হিজড়ার হাতে।

এর জন্য স্বউদ্যোগেই হিজড়া জনকল্যাণ সংস্থা,সিলেট নামে একটি সংগঠনেরও জন্ম দিয়েছেন তিনি, যেটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধনও পেয়েছে। বিশেষায়িত ফুডভ্যান থেকে প্রতিদিন ১০০টাকা করে সংস্থায় জমা রাখা হয়। এজন্য সংস্থার পক্ষ থেকে একজন হিসাব কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংস্থার তহবিলে জমাকৃত অর্থ থেকে বৃহস্পতিবার আরও চারজন হিজড়াকে দুটি ফুডকার্ট দেওয়া হয়েছে। ভ্যান পেয়ে খুশি বৃহন্নরা বলছেন, আমাদের নিজেদের টাকায় নিজেরাই গাড়ি কিনতে পেরেছি। এখন ব্যবসার মাধ্যমে হালাল রোজগার করতে পারবো।

সংস্থার সভাপতি সুক্তা হিজড়া বললেন, ‘জাবেদ স্যারের কারণে আমরা আলোরপথ দেখতে পেয়েছি। এখন আমরা নিজেরাই স্বাবলম্বী। আমাদের কেউ খারাপ বলে না’।

উপ-কমিশনার জাবেদুর রহমান বলেন, ‘হিজড়ারাও মানুষ।  তারা সমাজে অবহেলিত। তাদের প্রতি প্রায় সবারই রয়েছে ‘নাক সিঁটকানো’ মনোভাব।  এই বিচ্ছিন্ন হিজড়া সম্প্রদায়কে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসতেই এ উদ্যোগ।  এক বছরে এর সফলতাও পাওয়া গেছে’।

 

সিলেট/ আব্দুল্লাহ আল নোমান/শাহেদ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন