ঢাকা, সোমবার, ১৬ চৈত্র ১৪২৬, ৩০ মার্চ ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বদলগাছীর আরেক চমক হলুদ বিহার

এ.কে.সাজু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-১৭ ১২:১৬:১৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১৭ ১:০৯:২৩ পিএম

নওগাঁর বদলগাছী যেন ঐতিহ্যের নিদর্শন ভাণ্ডার। এখানে কেবল পাহাড়পুরই নয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আরো অনেক প্রাচীন বৌদ্ধ বসতির নিদর্শন। তারই অন্যতম একটি হলুদ বিহার।

হলুদ বিহার প্রত্নস্থলটি পাহাড়পুর বৌদ্ধমঠ হতে পনেরো কিলোমিটার দক্ষিণে, মহাস্থান হতে পঞ্চাশ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং নওগাঁ জেলা শহর হতে আঠারো কিলোমিটার উত্তরে।

বদলগাছির বিলাসবাড়ি ইউনিয়নে তুলসীগঙ্গা এবং যমুনা নদীর মাঝখানে অবস্থিত হলুদবিহার গ্রামে অনেকগুলি বিক্ষিপ্ত প্রাচীন ঢিবি আছে। এ নিদর্শনগুলি এক বিশাল এলাকা জুড়ে বিদ্যমান। স্থানীয়ভাবে দ্বীপগঞ্জ নামে পরিচিত সম্পূর্ণ গ্রামটিতে প্রচুর পুরনো ইট, ভাঙ্গা মৃণ্ময় পাত্রাদির টুকরা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক ধ্বংসাবশেষ অগোছালোভাবে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। এ পুরানো ঢিবিগুলি এবং গ্রামের নাম থেকে ধারণা করা যায় যে, এখানে প্রাচীন বৌদ্ধ বসতির নিদর্শন রয়েছে।

বর্ষাকালে হলুদ বিহার ঢিবিটি দ্বীপের ন্যায় দেখাত, এ কারণে এটি দ্বীপগঞ্জ নামে পরিচিত। দ্বীপগঞ্জ গ্রামের হাটের পাশে স্তূপকৃত মাটির ঢিবি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ঢিবির পরিধি প্রায় ১০০ ফুট এবং সমতল ভূমি থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২৫ ফুট। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অনুসন্ধানে এটি একটি বৌদ্ধ বিহার বলে ধারণা পাওয়া যায়। কিছু কিছু ঐতিহাসিকরা এটিকে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের সম-সাময়িক বলেই মনে করেন। তবে এর নির্মাণে শুধু সিঁড়ির ইটের সঙ্গে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দিরের পশ্চিম পাশের ইটের মিল পাওয়া যায়। হলুদ বিহারের একটি প্রাচীন পথ কোলা অতিক্রম করে পাহাড়পুর, আরেকটি পথ জগদল মহাবিহারের দিকে অগ্রসরমান। অবস্থাদৃষ্টে এ বিহার তিনটির মধ্যে গভীর যোগাযোগ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ এই হলুদ বিহার কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এখন বিলুপ্তির পথে। হলুদ বিহারটি পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে। ভেঙ্গে পড়ছে বিহারের চারিধার।

ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের পাশাপাশি হলুদ বিহারেও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা দেখার জন্য আসেন। এছাড়া শিক্ষা সফরেও দেশি বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসেন। বিহারটির চারদিকে বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় গরু-ছাগল অনায়াসে প্রবেশ করে এতে বিহারের সৌন্দর্য নষ্ট করছে। যা দেখারও কেউ নেই।

সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে জানা যায়, ইতিহাস ও প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন এই দ্বীপে নজর পড়লেই দর্শকরা আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এটি ছিল এক সময় গাছ গাছড়া ঝোপ জঙ্গলে পরিপূর্ণ উঁচু একটি দ্বীপ। দ্বীপের মাথায় ছিল একটি বড়ই গাছ, যার নিচে ছিল একটি গভীর কূপ। দ্বীপের ঝোপ জঙ্গল গাছপালা কেটে ফেলার আগেই কূপটি ভরাট হয়ে যায়।

পরবর্তীতে দ্বীপটি সংস্কারকালে এই কূপের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। আশে পাশের লোকজন দ্বীপের চারধারে মাটি কেটে বাড়ি ঘর নির্মাণ করেন। মাটি কাটার এক পর্যায়ে দ্বীপের পূর্ব দিকে ইটের সিঁড়ি বের হয়। তখন এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তার পরেই এই দ্বীপটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে নেয়া হয়। হলুদ বিহার গ্রামে ছিল অনেকগুলো বিক্ষিপ্ত ঢিবি তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়েছিল পুরনো ইট, ভাংগা মৃৎ শিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন। এথেকেই এখানে বৌদ্ধ বসতির প্রমান মিলে। ১৯৭৬ সালে এই দ্বীপটি সংরক্ষিত করা হয়।

১৯৮৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১ম বারের মত খনন কাজ শুরু করেন। ১৯৯৩ সালে ২য় বার খননকালে দ্বীপের অভ্যন্তরে ১টি মন্দির আবিষ্কৃত হয়। এটি খননকালে বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন সামগ্রী মানুষের মূর্তি সম্বলিত ভাঙ্গা, পোড়া মাটির ফলক, পাথর সামগ্রী ও মূর্তির স্তম্ভ মূল অলংকারের ঢালাই ছাচ এবং চুর্ণ যন্ত্র উদ্ধার করা হয়। প্রশাসনিক উদাসীনতা ও সংরক্ষণের অভাবে এই প্রাচীনতম নিদর্শন আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে।

 এ বিষয়ে ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাস্টডিয়ান আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল এর সঙ্গে মুঠো ফোনে কথা বললে তিনি জানান, বিহারটি নিয়ে আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে আরও খননের প্রয়োজন আছে। চতুর্দিকে তার কাঁটা দিয়ে ঘিরতে হবে। যাতে করে বাহির থেকে বিহারটি সাধারণ লোকজন দেখতে পায়। এছাড়াও এই বিহারটি ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা আছে। বিহারটি সর্বাক্ষণিক দেখাশোনার জন্য একজন কর্মী নিয়োজিত আছে।

 

নওগাঁ/শাহ মতিন টিপু

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : নওগাঁ, রাজশাহী বিভাগ