RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৪ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১০ ১৪২৭ ||  ০৭ রবিউস সানি ১৪৪২

করতোয়া পাড়ের শেরপুরে দেড় কিলোমিটারে ২৯ পূজামণ্ডপ

এনাম আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৫৫, ২৫ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১২:২৯, ২৬ অক্টোবর ২০২০

করতোয়া নদীর পাড় ঘেঁষে পৌর শহর বগুড়ার শেরপুর। দুর্গাপূজা এলেই এই শহরটি পরিণত হয় পূজার শহরে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বগুড়া জেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরে পূজার উৎসবটা একটু বেশিই। পৌর শহরের পালপাড়া থেকে শুরু করে খন্দকারপাড়া পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে ২৯টি মণ্ডপ পূজার এই ৫টি দিন শহরকে করে রাখে উৎসবমুখর। 

এত অল্প আয়তনের মধ্যে এত সংখ্যক পূজামণ্ডপ শেরপুর পৌর শহর ছাড়া দেশের আর কোথাও মিলবে না। তাই এই শহরটিতে পূজা দেখতে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলাসহ এর আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্ত ও অনুরাগীরা আসেন।

তবে এবারের পূজার সপ্তমী ও অষ্টমীর দিনটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকটা পানসে ভাবেই কাটাতে হয়েছে। কারণ ষষ্ঠীর রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ঝরেছে সপ্তমী ও অষ্টমীর পুরোটা দিন। ফলে উৎসবের দুইটি দিন আক্ষেপ করেই কাটাতে হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের।

পুরো শেরপুর উপজেলায় এবার ৭৯টি মণ্ডপে পূজা উদযাপন করা হচ্ছে। প্রতি বছর পৌর শহরে ৩৩টি মণ্ডপে পূজা উদযাপন করা হয়।  এবার করোনার কারণে ২৯টিতে পূজা উদযাপন করা হচ্ছে। 

এই মণ্ডপগুলোর মধ্যে অনেক মণ্ডপই জমিদার আমলের। মণ্ডপগুলো দেড়শ থেকে ২শ বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এর মধ্যে শহরের সবচেয়ে পুরনো যে মণ্ডপ সেটি ষোলোআনা কাছাড়ি মন্দির। এই মণ্ডপে ২শ বছরেরও বেশি সময় ধরে দূর্গাপুজা উদযাপন করা হচ্ছে। 

পৌর শহরের দক্ষিণ সাহাপাড়ায় সে সময় জমিদারি স্টেট ছিল।  স্টেটটির নাম ছিলো ছোটবাড়ি স্টেট।  যেটি এখন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।  সে সময় ১৬ জন কুন্ডু জমিদার (শরিক) মিলে ওই স্টেটটি পত্তন নেন।  তারাই সে সময় এখানে বৈষ্ণব মতে দূর্গাপূজা চালু করেন।  যে কারণে এর নাম ষোলোআনা মন্দির।  তবে সময়ের সাথে সাথে এর শরিকের সংখ্যা বেড়েছে।  এখন এই মন্দিরের শরিক ৬৪ জন।  যাদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন অসীম কুমার কুন্ডু।  এই মন্দিরের দেবী দূর্গার রূপটিও ভিন্ন রকম।  অকালবোধনের সময় দেবীর যে রূপটি হয়।  সেই রূপেই এই মণ্ডপের প্রতিমার রূপ দেওয়া হয়।  তখন থেকে এখন পর্যন্ত ষোলোআনা কাছাড়ি মন্দিরে একই রূপে দেবী দূর্গাকে হাজির করা হয়।  মণ্ডপটি সোয়া দুই হাত প্রস্থ আর আট হাত দৈর্ঘ্যের কাঠামোতে নির্মাণ করা হয়।  মন্দিরটি জাগ্রত মন্দির হিসেবেও পরিচিত।  এই মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন কিছু মানত করলে সেই মানত পূরণ হয় বলেও ওই সম্প্রদায়ের লোকজনের মুখে মুখে ফেরে।  এটিই শহরের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সবচেয়ে বড় প্রতিমা।

ষোলোআনা কাছারি মন্দিরের পরেই পুরোনো মন্দিরটি হচ্ছে- চণ্ডী মন্দির।  এটিও প্রায় দুশো বছর পুরনো।  এই মন্দিরের যে বেদি সেটি পাঁচটি মৃত মানুষের মাথার উপর নির্মিত।  এখানে তান্ত্রিক (শাক্ত) মতে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।  এই মণ্ডপের প্রতিমাও এক কাঠামোতেই তৈরি। দূর্গাপূজার সময় ষষ্ঠীর ৭দিন আগে থেকে এখানে পূজা শুরু হয়। এরপর বোধনের সময় ঘট বসিয়ে প্রতিমা বেদিতে তোলা হয়।  স্বাধীনতার যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এই মন্দিরে দুর্গাপূজার সময় মহিষ বলি দেয়া হতো।  মহিষ বলি দেওয়ার পর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো।  যুদ্ধের পর থেকে এখানে পাঠা বলির চল শুরু হয়।  ষষ্ঠী থেকে নবমীর দিন পর্যন্ত এখানে পাঠা বলি হয়।  যেটি এখনও চলমান আছে।

ষোলোআনা এবং চণ্ডী মন্দির ছাড়াও পৌর শহরে আরো পুরনো মন্দির রয়েছে। যার মধ্যে মুন্সি এবং মজুমদারদের মন্দির উল্লেখযোগ্য।  এছাড়া শহরে শরিকি পূজার বাইরে শত বছরের পুরনো পারিবারিক পূজা হয় লক্ষ্মীকান্ত ভট্টাচার্যের বাড়িতে।  এখন প্রায় সব প্রাচীন মন্দিরে আধুনিকতা চলে এসেছে।  তবে পূজার রীতিটা আগের মতোই আছে। 

আজ থেকে ৬৯ বছর আগে শেরপুর পৌর শহরের দুর্গা পূজাকে জমিদারি বা ব্যক্তি মন্দিরের বৃত্ত থেকে বের করে বারোয়ারি পূজা। বারোয়ারি পূজার মধ্যে সবচেয়ে পুরনো স্যানাল বাড়ির মাঠের টাউন বারোয়ারির পূজা। এটিই পূজার প্রাণকেন্দ্র।  শেরপুর পৌর শহরের প্রায় সবাই চাঁদা দিয়ে টাউন বারোয়ারি মণ্ডপে পূজা উদযাপনে সহযোগিতা করে। যে কারণে এই মণ্ডপে লোক সমাগম বেশি হয়।  উৎসবটাও বেশি হয়। এই বারোয়ারির পূজাকে ঘিরেই মণ্ডপ এলাকায় পাঁচ দিন ধরে চলে মেলা।

উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সংগ্রাম কুন্ডু জানান, করোনার কারণে এবার পৌর শহরে ২৯টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের চেয়ে পৌর শহরের আয়তন খুবই কম।  খোঁজ নিয়ে জেনেছি এত কম আয়তনের ভেতরে এত সংখ্যক মণ্ডপ দেশের আর কোথাও নেই। শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লা ভাগ হয়ে নিজস্ব উদ্যোগে এই মণ্ডপগুলো বসিয়ে থাকেন।  ঐতিহ্যবাহী এবং ব্যক্তিগত মন্ডপও আছে।  সব মিলিয়ে এখানে এত অল্প আয়তনের মাঝে পূজার মন্ডপগুলো এত বেশি।  এখানে পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, নাটোর থেকেও দর্শনার্থীরা আসেন পূজা দেখতে।

শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। পূজা মণ্ডপগুলোতে আমাদের টহল ব্যবস্থা জোরালো আছে। এছাড়া নির্দেশনা অনুযায়ী সবাই যেন স্বাস্থ্যবিধিটা মেনে চলে সে জন্য জনগণকে সচেতন করছি। আমরা নিজেরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী মাস্ক কিনে বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে দিয়েছি।

বগুড়া/টিপু

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়