RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বুধবার   ২৫ নভেম্বর ২০২০ ||  অগ্রাহায়ণ ১১ ১৪২৭ ||  ০৮ রবিউস সানি ১৪৪২

ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য সাভার সিআরপি রোড

আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪৮, ২৫ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ০৯:৩৮, ২৬ অক্টোবর ২০২০
ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য সাভার সিআরপি রোড

শিমুলতলা-সিআরপি শাখা সড়ক। সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শিমুলতলা স্ট্যান্ড থেকে সিআরপির দূরত্ব ৭শ’ মিটার। পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনবার্সন কেন্দ্রে (সিআরপি) প্রতিদিন শত শত রোগীর চলাচল এ সড়ক দিয়েই। এছাড়া সিআরপির স্টাফ ও এলাকার লাখো মানুষতো রয়েছেই। এতো মানুষের চলাচল তারপরও ভয়ানক এ সড়কটি। রাত যত গভীর হয় ভয়াবহতার মাত্রা ততো বাড়ে এই সড়কে। ছিনতাইকারীদের যেন আতুরঘর হয়ে ওঠে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচিত সড়কটি।

মাঝে-মধ্যেই এ সড়কে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও চোখ বাঁধা যেন প্রশাসনের। ছিনতাইকারীর ছুরির নিচ থেকে বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগীর অভিযোগেও নেওয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা। প্রশাসনের গা ছাড়া ভাব আর খামখেয়ালিপনায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে মেধাবী এক যুবকের রক্ত ঝড়েছে এ সড়কে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ শিক্ষার্থী মুস্তাফিজুর রহমানকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা। ছিনিয়ে নিয়ে গেছে তার কাছে থাকা ১০ হাজার টাকা।

ছিনতাইকারীদের কবল থেকে বেঁচে ফেরা আইনুর নিশাত রাজীব বলেন, সিআরপিতে ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে তিনি কাজ করছেন। ভেতরে সিআরপির নিজস্ব কোয়াটারেই থাকতে হয়। গত ৬ আগস্ট ঈদের ছুটি শেষে বাড়ি থেকে সিআরপি ফিরছিলাম। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শিমুলতলা স্ট্যান্ডে বাস থেকে নামি। সময়টা ফজর আজানের একটু আগে। রিকশা না পেয়ে এক-দুই মিনিট অপেক্ষা করি। এরপর সিআরপি রোড দিয়ে হাঁটা শুরু করি।

কিছুক্ষণ পরই অটোরিকশা নিয়ে তিন-চার জন আসে। তবে তারা আমার সামনে কিছু দূরে গিয়ে অটোরিকশাটি থামায়। একজন অটোতেই থাকে। রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকা অবস্থায় তিন যুবক আমার কাছে আসে। দুইজন আমার গলায় ও পেটে ছুরি ধরে সড়কের পাশেই থাকা ছ’মিলের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে রাখা কাঠের গুড়ির পাশেই তারা আমাকে মাটিতে ফেলে দেয়। পরে আমার মোবাইল, মানিব্যাগ ও ল্যাপটপ ছিনিয়ে নেয়। এমনকি বাড়ি থেকে আনা কিছু কোরবানির মাংস ও খাবার পর্যন্ত নিয়ে যায় তারা। ছিনতাই শেষে অটোতে উঠে পাশের গলি দিয়ে সিটি সেন্টারের দিকে চলে যায়। সেদিন পরনের কাপড় বাদে কিছু্ ছিল না আমার কাছে। ছিনতাকারীরা দেখতে বেশ স্মার্ট ছিল। টি-শার্ট, জিন্স ও ক্যাপ পরিহিত।

এঘটনার পরদিন সাভার মডেল থানায় জিডি করি। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনো ব্যবস্থা নেননি। এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে ট্র্যাকিং করে ২০-২৫দিন পর ময়মনসিংহ থেকে ফোন উদ্ধার করা হয়। যদিও ছিনতাই হওয়া বাকী জিনিস এখনো মেলেনি।

তিনি আরও বলেন, ওই সময় সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। এঘটনার পর ১০-১৫ দিন পর্যন্ত আমার অনেক ভয় লাগতো। রাস্তায় একসঙ্গে কয়েকজন ছেলেকে দেখলেই মনে হতো তারা ছুরি ধরে আছে। মেন্টালি ঘটনাটি ওভারকাম করতে আমার প্রায় এক মাস লেগেছে। এরপর গত সপ্তাহে বাড়ি গিয়েছিলাম। তবে দিনে দিনেই ফিরে এসেছি। আর রাতে কখনও বের হলে কয়েকজন একসঙ্গে যাই।

ছিনতাইকারীদের কবলে পড়া নাইমুল ইসলাম নয়ন নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, চট্টগ্রামের সিআরপি অফিসে এডমিন অ্যান্ড ফাইন্যান্স পদে কর্মরত আমি। তবে মাঝে মধ্যেই মিটিংয়ের জন্য সাভারের সিআরপিতে আসতে হয়। ২-৩ বছর আগে মিটিংয়ের জন্য তাদের এ অফিস থেকে কল করা হয়। রমজান মাসের রাতে চট্টগ্রাম থেকে সাভারের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সাধারণত সকাল বেলা আমাদের মিটিংগুলোতে অ্যাটেন্ড করতে হয়। ভোরে ফজর আজানের কিছুটা সময় আগে শিমুলতলা পৌঁছাই। ওই সময় সিআরপি যাওয়ার জন্য একটি প্যাডেল চালিত রিকশা ঠিক করি। কিন্তু চালক খুব রুগ্ন হওয়ায় রিকশা খুব আস্তে চলছিল। সামনের দিকে যাওয়ার সময় কেন জানি ভয় লাগছিল। কিছু দূর যেতেই ছ’মিল এলাকায় দুইজন কিশোর রিকশা থামায়। তারা গায়ের গেন্জি খুলে নিজেদের মুখ বেঁধে রেখেছিল। দুইজনের হাতেই লম্বা দুটি ছুরি।

ছিনতাইকারী বুঝতে পেরেই আমি নিজে থেকে মোবাইল দিয়ে দেই। এসময় আরেক কিশোর আমার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমি নিজেকে সিআরপির স্টাফ পরিচয় দিয়ে কাপড় রাখা ব্যাগটাও তাদের দেই। কিন্তু ওই কিশোর আমার পকেটে হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আমি নিজেই মানিব্যাগ বের করে দিতে যাই। হঠাৎ সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস তাদের বিপরীত পাশে সড়কে থেমে যায়। ওই গাড়িতে সম্ভবত ডিবি পুলিশ ছিল। গাড়ির দরজা খুলতেই ছিনতাইকারী কিশোরদল দ্রুত পালিয়ে যায়। তার কাপড়ের ব্যাগটিও ফেলে রেখে যায় তারা। এসময় মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন ছিনতাইকারীদের ধরতে গলিতে চলে যায়। পরে তিনি রিকশাযোগে সিআরপিতে পৌঁছান।

তবে এঘটনায় তিনি আর পুলিশি কোনো পদক্ষেপ নেননি। ভয়াবহ এমন মুহূর্ত থেকে ফিরে আর কখনো সিআরপিতে গভীর রাতে আসেননি।

সিআরপির কর্মকর্তা জাহেদ উদ্দিন জানান, শিমুলতলা-সিআরপি সড়কটিতে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ব আগে থেকেই। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের শিমুলতলা স্ট্যান্ড থেকে সিআরপি অনেকটা দূর। রিকশায় দশ টাকা ভাড়া দিতে হয়। রাত ১২টার পর এ সড়ক দিয়ে চলাচল করতে অনেক ভয় লাগে। সিআরপির স্টাফ কিংবা রোগীদের মাঝে মধ্যেই গভীর রাতে এখানে আসতে হয়। কিন্তু ছিনতাইকারীদের ভয়ে আতঙ্কে থাকেন তারা। প্রশাসনেরও এ বিষয়ে খুব একটা মাথা ব্যথা নেই। যার ফলশ্রুতি গতকাল একজনকে ছুরিকাঘাতে প্রাণ দিতে হয়েছে।  

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম বলেন, শনিবার সিআরপি এলাকায় মুস্তাফিজুর খুনের ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। পরিবারকে খবর পাঠানো হয়েছে। তবে আগে সিআরপি এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও কেউ অভিযোগ করেনি।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, মুস্তাফিজ খুনের ঘটনায় ২-৩ দিনের মধ্যেই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে। এ জন্য তাদের বিশেষ টিম অভিযান চালাচ্ছে। তবে ইতোপূর্বে সিআরপি এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে কেউ অভিযোগ করেনি। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীর অভিযেগা করা উচিত ছিল।

এসএম/আমিনুল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়