Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ১৮ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ৬ ১৪২৮ ||  ০৬ জিলক্বদ ১৪৪২

‘পুলিশের নির্যাতনেই রায়হানের মৃত্যু’

আব্দুল্লাহ আল নোমান, সিলেট || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৪৮, ৫ মে ২০২১  
‘পুলিশের নির্যাতনেই রায়হানের মৃত্যু’

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনেই মৃত্যু হয়েছে রায়হান আহমদের। এর সঙ্গে জড়িত ওই ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) আকবরসহ ছয় জন।

বুধবার (৫ মে) পিবিআই সিলেট কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির।

প্রায় সাত মাস পর বুধবার সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার দাসের কাছে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) হস্তান্তর করেন পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক আওলাদ হোসেন। অভিযাগপত্রে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে প্রধান করে ৫ জন পুলিশসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বেলা ১২ টায় পিবিআই সিলেট কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে অভিযোগপত্র নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির। 

তিনি জানান, কেস ডকেটসহ অভিযোগপত্র ১৯৬২ পৃষ্ঠার। এরমধ্যে অভিযোগপত্র ২২ পৃষ্ঠার। এ মামলায় সাক্ষ্য করা হয়েছে ৬৯ জনকে। এর মধ্যে ১০ জনের ১৬৪ ধারার জবানবন্দিও রয়েছে।

তিনি আরও জানান, মামলায় প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে এসআই আকবরকে। অন্যান্য অভিযুক্তরা হলেন— এসআই হাসান আলী, এএসআই আশেকে এলাহীম কনস্টেবল হারুনুর রশীদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও আকবরের সহযোগী আব্দুল্লাহ আল নোমান। 

এদের মধ্যে নির্যাতনে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে এসআই আকবর, এএসআই আশেক, কনস্টেবল হারুন ও টিটুর বিরুদ্ধে। এসআই হাসানের বিরুদ্ধে আকবরকে পালাতে সহায়তা এবং নোমানের বিরুদ্ধে আলামত নষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে চার্জশিটে। আসামিদের মধ্যে নোমান পলাতক। অন্য পাঁচজন কারাগারে।

ব্রিফিংয়ে পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন বলেন, ‘রায়হান নিজেও একজন মাদক বিক্রেতা ছিলেন। ঘটনার দিন মধ্যরাতে নগরীর কাষ্টঘর এলাকায় জনৈক সাইদুল শেখ ও রনি শেখের কাছে ইয়াবা বিক্রি নিয়ে কথা কাটাকাটির পর রায়হান সাইদুল শেখের মোবাইল ও নগদ ৯ হাজার ৭০০টাকা নিয়ে যান। এরপরই তার অভিযোগের ভিত্তিতে কাষ্টঘরের সুইপার চুলাই লালের ঘর থেকে রায়হানকে আটক করে ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।’

‘ফাঁড়িতে রায়হানকে নির্যাতন করার প্রমাণ তদন্তে উঠে আসে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘‘ফাঁড়িতে নিয়ে এসআই আকবরসহ ওই তিন জন বেতের লাঠি দিয়ে রায়হানকে মারপিট করেন। এরপর তাকে সকালে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

‘ঘটনাকে শুরুতে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য রায়হান ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছে বলে তথ্য প্রচার করে ঘটনার সংশ্লিষ্ট আলামত ধ্বংস করে তারা। তবে ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে নির্যাতন পূর্ব পরিকল্পিত কিংবা পূর্ব বিরোধের জেরে হয়নি।”

অভিযোগপত্রে যেসব আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে বলে জানান তিনি। 

তিনি বলেন, ‘অভিযোগপত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে ৩০২, ৫০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ এর ১৫(২), ১৫(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এই দুই আইনের একটিতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও অপরটিতে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।’

রায়হান আহমদ (বাঁয়ে), এসআই আকবর (ডানে)

সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার দাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র পিবিআই তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। করোনার কারণে আদালত ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে চলমান থাকায় অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়নি। আদালতের কার্যক্রম শুরুর পরই তা আদালতে দাখিল করা হবে।’
 
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম এ ফজল চৌধুরী বলেন, ‘পিবিআই দাখিলকৃত চার্জশিটে আপাতত কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়েনি। তারা চার্জশিটের পূর্ণাঙ্গ কপিসহ যাবতীয় কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরবেন। তবে আপাতত যে ছয় জনকে আসামি করা হয়েছে তাতে তারা সন্তুষ্ট।’

এদিকে আলোচিত এ ঘটনার চার্জশিট প্রদান করা হলেও এতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন রায়হানের মা সালমা আক্তার। 

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ তদন্তে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই। কারণ এতে যে পাঁচ পুলিশের নাম এসেছে এর বাইরে আরও দুই/তিন জন রায়হান হত্যায় জড়িত রয়েছেন। তাদের কীভাবে বাদ দেওয়া হলো?’

তিনি দাবি করেন, ‘ঘটনার রাতে কনস্টেবল তৌহিদ মিয়ার ফোন থেকে কল করে তার কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। অথচ চার্জশিটে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সে যদি জড়িত না থাকে, তাহলে তার ফোন থেকেই কেন কল এলো? চার্জশিটের কপি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীর সাথে আলোচনা করে চার্জশিটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ অক্টোবর ভোরে নগরীর আখালিয়ার এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুঁইয়াসহ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে। পরে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় রায়হানের।

ঘটনার পরদিন রাতে কোতোয়ালী মডেল থানায় পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যু অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার। ওইদিন ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তিন জনকে প্রত্যাহার করা হয়।
১৪ অক্টোবর পিবিআইকে আলোচিত এ মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। তদন্তভার পেয়ে ১৫ অক্টোবর কবর থেকে রায়হানের মরদেহ উত্তোলন করে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়। দুই দফার ময়নাতদন্তে রায়হানের দেহে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৪টি আঘাত ছিল গুরুতর।

এ ঘটনায় দেশব্যাপী প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গড়ে ওঠে আন্দোলন। চলে নানা কর্মসূচি। নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম রাজপথে নামেন। বন্দর ফাঁড়ির সামনে কাফনের কাপড় মাথায় দিয়ে অনশন করে ছেলে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।

এ নিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশসহ আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। সাময়িক বরখাস্তের পরপরই পুলিশ লাইন থেকে পালিয়ে যান মূল অভিযুক্ত এসআই আকবর। ২০ অক্টোবর ঘটনার তথ্য গোপন ও আকবরকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে ফাঁড়ির টু-আইসি এসআই হাসানকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

ঘটনার এক মাসের মাথায় ৯ নভেম্বর পলাতক ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবরকে সিলেটের কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী দনা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে জেলা পুলিশ। এর পরদিন তাকে পিবিআই-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাকেও দুই দফায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

রায়হান হত্যার ঘটনায় বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর, এসআই হাসানসহ ৬ পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

অন্য চারজন হলেন— এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল হারুনুর রশীদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাস। দীর্ঘ দিন পর আলোচিত এই মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করলো পিবিআই।

নোমান/সনি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়