Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২৬ জুলাই ২০২১ ||  শ্রাবণ ১১ ১৪২৮ ||  ১৩ জিলহজ ১৪৪২

‘ত্রাণ নয়, স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই’

আবু কাওছার আহমেদ, টাঙ্গাইল || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:০৪, ১২ জুন ২০২১   আপডেট: ১২:৫৯, ১২ জুন ২০২১

‘রাক্ষুসে যমুনা আমাদের বাড়ি গিলে খেয়েছে। কয়েক বছর অন্যের বাড়িতে ছিলাম। ছেলে-মেয়ে নিয়ে পরের বাড়িতে তো আর বেশি দিন থাকা যায় না। তাই ঋণ করে ছোট ঘর তুলেছি। বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে চিন্তায় আছি। ঘরটা আবার ভেঙে যেতে পারে। আমরা ত্রাণ সামগ্রী চাই না, স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই।’

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর দুর্গাপুর ইউনিয়নের সিংগুলীর চরের বাসিন্দা অভিরন বেগম কথাগুলো বলছিলেন। শুধু অভিরন বেগম নন, তার মতো শত শত পরিবারের মানুষ ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। 

ওই এলকা থেকে আবুল কালাম নামে ৫২ বছর বয়সী এক শ্রমিক বলেন, ‘১৯৮৮ সাল থেকে আমাদের গ্রামে ভাঙন শুরু হয়। আমাদের বাড়িটি প্রথম ১৯৯০ সালে যমুনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর ওই গ্রামের পূর্ব পাশে বাড়ি করলে তারও ১৯৯৫ সালে যমুনার গর্ভে চলে যায়। আলীপুর এসে বাড়ি করলে সেই বাড়িটি ২০০০ সালে বিলীন হয়ে যায়। আলীপুর থেকে বেলটিয়া বাড়ি করলে সেটি ২০০৪ সালে বিলীন হয়ে যায়। বেলটিয়া থেকে আবার আলীপুর গিয়ে বাড়ি করলে ২০১০ সালে সেটি যমুনা গিলে খায়। এরপর বেলটিয়া আসলে ২০২০ সালে ওই বাড়িটিও নদীর গর্ভে চলে যায়। এখন অন্যের জায়গায় টিনের চাল ও কাগজের বেড়া দিয়ে ছাপড়া তুলে থাকি। তারপর ভাঙন আমাদের পিছু ছাড়েনি। ৩১ বছরে ৬ বার বসত ভিটা বিলীনের পরও ভাঙন আতঙ্কে রাতে ঘুম আসে না।’

যমুনা নদীতে একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধের দাবি জানিয়ে আসছেন  কালিহাতী,  ভূঞাপুর, গোপালপুর, টাঙ্গাইল সদর ও নাগরপুর উপজেলার লাখ লাখ মানুষ।

সিংগুলীর চরে গিয়ে দেখা যায়, টিনের চাল ও কাগজের বেড়ার ১২ হাত ছাপড়া ঘরে দিন মজুর আবুল কালামের ৬ সদস্যের পরিবার বসবাস করছে। দুই পাশে দুটি চৌকি থাকলেও তাতে নেই কোনো তোষক। কোনো রকম কাথা বিছিয়ে থাকছেন তারা। যেকোনো মুহূর্তে নদীতে বিলীন হতে পারে তাদের ঘরটি।

আবুল কালামের স্ত্রী রেহেনা বেগম বলেন, ‘আমার বিয়ের পর থেকে শুধু ঘর বাড়ি টানতে শুরু করেছি। এখনও শেষ হলো না। সে কামাই করলে পেটে ভাত যায়, না করলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে ঘর দিলেও আমরা একটি ঘরও পাইনি। একটা ঘর হলে আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম।’

এ দিকে আলীপুর এলাকায় বিবিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাইড বাঁধের মাঝখানের ১০০ মিটার অংশে জিও ব্যাগ ও ভরাটের জন্য ২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। মেসার্স গুডম্যান এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি কাজটি বাস্তবায়ন করেছে। তবে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এলাকাবাসীর দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের যোগসাজসে ঠিকাদার নিম্মমানের কাজ করছে। 
ওই গ্রামের জামাল আকন্দ বলেন, ‘ঠিকাদার নামে মাত্র বস্তা ফেলছে। তারা শুকনো মৌসুমে কোনো কাজই করেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের জানালে তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

শুকুর মাহমুদ নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘গত বছর ২২টি বাড়ি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে শুকনো মৌসুমে কাজ করলে আমাদের আর আতঙ্কে রাত কাটাতে হতো না। শুধু আমরা নয়, আমাদের মতো আলীপুর, বেলটিয়া, পৌলি, কাকুয়া, পানাকুড়া, রাঙাচিরা এলাকার হাজার হাজার মানুষ ভাঙন আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারছে না। পানি উন্নয়নের বোর্ড নিচে কোনো বস্তা না দিয়েই উপরে বস্তা দিচ্ছে। তাতে কোনো কাজই হবে না। নিচ থেকে তো ধসে যায়।’

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

কালিহাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী বলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকি। ত্রাণ সামগ্রী ও আশ্রয়নের ব্যবস্থা করা হয়। স্থায়ী বেরিবাঁধের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বার বার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত তা বাস্তবায়ন করা হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জিও ব্যাগ উপরে দিলে ভাল হবে, না নিচে দিলে ভাল হবে সেটা আমরা ইঞ্জিনিয়ারই ভালো জানি। নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে। সাব ঠিকাদার নিয়োগ ও চাঁদা না দেওয়ায় মিথ্যা অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।’

টাঙ্গাইল/ইভা 

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়