কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি, হুমকিতে পরিবেশ
আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার || রাইজিংবিডি.কম
ঢাকার ধামরাইয়ে বালিয়া ইউনিয়নের টেটাইল ও দক্ষিণ গাঁওতারা গ্রামে অবৈধ চুল্লিতে অবাধে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে কয়লা। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছ কেটে এসব চুল্লিতে কাঠ সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য, কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা।
উপজেলার বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৩-৪ কিলোমিটার ভেতরে বংশী নদীর পাড়ে টেটাইল গ্রাম। ওই গ্রামের নির্জন এলাকার ১০০ গজের মধ্যে দুইটি ও নদীর অপর প্রান্তে দক্ষিণ গাঁওতারা এলাকায় আরেকটি কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানানোর চুল্লি রয়েছে। ওই সব চুল্লিতে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানানো হয়। কাঠ পোড়ানোর সময় নির্গত হয় প্রচুর কালো ধোঁয়া। এতে একদিকে যেমন বনজ সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অপরদিকে ধোঁয়ার কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত নানা রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
টেটাইল গ্রামের চুল্লি দুটির মালিক নাহিদ রানা ও মো. ইমরান। ইমরানের স্ত্রী ওই এলাকার সংরক্ষিত সাধারণ মহিলা সদস্য। তাঁরা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় চুল্লিগুলো তৈরি করেছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ গাঁওতারা এলাকায় কয়লা তৈরির চুল্লির মালিক হলেন নুরুল ইসলাম।
উপজেলা প্রশাসন বলছে, এসব চুল্লির জন্যে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেই।
স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা জানান, অনুমোদনহীন অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব কয়লা তৈরির চুল্লিতে অবাধে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। জনবসতি এলাকা ও ফসলি জমি নষ্ট করে এসব চুল্লি স্থাপন করা হয়েছে। লাল মাটি, ইট ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা চুল্লিতে প্রতিদিন কয়েক শ মণ কাঠ পোড়ানো হয়।
টেটাইল গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘চুল্লিতে কাঠ পোড়ানোয় সৃষ্টি হচ্ছে ধোঁয়ার। রাস্তার পাশ দিয়ে চলাচল করার সময় চোখ জ্বালাপোড়া করে। গাছপালা নষ্ট হচ্ছে। অনেকেই অসুস্থ হচ্ছেন।’
রোববার (৩০ জানুয়ারি) সরেজমিনে দেখা যায়, চুল্লির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে কাঠ সাজিয়ে একটি মুখ খোলা রেখে অন্য মুখগুলো মাটি ও ইট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খোলা মুখ দিয়ে আগুন দেওয়া হয় চুল্লিতে। আগুন দেওয়া শেষ হলে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ৫ থেকে ৬ দিন পোড়ানোর পর চুলা থেকে কয়লা বের করা হয়। এসময় প্রতিটি চুল্লি থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার কয়লা পাওয়া যায়। ১৫ টি চুল্লি থেকে মাসে ৩৫/৪০ লাখ টাকা আয় হয়। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। পরে এই কয়লা শীতল করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ধামরাই পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক সিয়াম সারোয়ার জামিল বলেন, এসব কয়লা কারখানা পরিবেশের জন্যে হুমকিস্বরূপ। সারা দিন ধোঁয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামের চাষবাদে এটার প্রভাব পড়ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
চুল্লির মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘লিখিত কোন অনুমতি নেই। অনুমতি সবারই মুখে মুখে আছে। পরিবেশের ক্ষতি তো একটু হবেই।’
নাহিদ রানা বলেন, ‘ক্ষতি তো একটু আকটু হবেই। অবৈধ ব্যবসার কোন অনুমতি হয় না। প্রশাসন যদি মনে করে ভাঙতে হবে তবে চুল্লিগুলো ভেঙে ফেলবে।’’
ধামরাই উপজেলা বনকর্মকর্তা মোতালেব আল মামুন বলেন, ‘দুই বছর আগে আমরা চুল্লিগুলো ভাইঙা দিয়েছিলাম। পরে আমার বদলি হওয়ায় আমি চলে আসি। সম্প্রতি আমি আবার এখানে জয়েন করেছি। আমি ইউএনও স্যারকে জানিয়ে অবৈধ চুল্লিগুলো ফের ভেঙে দেব। আগামী সপ্তাহের মধ্যে আমরা এই কাজটি করবো।’
ধামরাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, ‘কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ ব্যপারে দ্রুতই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ঢাকা/মাসুদ