যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই!
মোহাম্মদ আশরাফুলের চোখের সামনে এখনো ভাসছে কত স্মৃতি! ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ। আশরাফুল তখন অধিনায়ক। বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একেবারেই নতুন। অভিজ্ঞতা বলতে মাত্র ৩ ম্যাচের।
২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক। ২০০৭ সালে বিশ্বকাপের ম্যাচের আগে কেনিয়া ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ১টি করে ম্যাচ। এরপর বিশ্বমঞ্চে ক্রিস গেইল, ব্রাভো, চন্দ্ররপল, সারওয়ানদের সামনে আশরাফুল, সাকিব, তামিম, মাহমুদউল্লাহ, মাশরাফিরা। নেতৃত্বে আশরাফুল। বোলিংয়ে বাংলাদেশ দুর্বার। ১৮তম ওভার পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ৫ উইকেটে ১৩১।
আশরাফুল ১৯তম ওভারে গিয়ে ডুবিয়ে আসেন। ২৪ রান খরচ করে বাংলাদেশ শিবিরে ধরিয়ে দেন কাঁপন। শেষমেশ ১৬৫ রানের লক্ষ্য পায় বাংলাদেশ। পরের গল্পটা তো ইতিহাসের অক্ষয় কালিতে লিখা। অধিনায়কের ২৭ বলে ৬১ রানের ঝড়ো ইনিংসে স্রেফ এলোমেলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সঙ্গে আফতাব আহমেদের ৪৯ বলে ৬২ রান। তাতে অবিস্মরণীয় এক জয়ের সাক্ষী বাংলাদেশ।
ওই ম্যাচের স্মৃতি আশরাফুলের কাছে অম্লাণ, ‘‘আমার তো ফাস্টেস্ট ফিফটি হয়েছিল। ২০ বলে দ্রুততম ফিফটি করেছিলাম ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে। অনেক বছর তো রেকর্ডটা ছিল আমার। ম্যাচটা আমরা দারুণ খেলেছিলাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন অনেক ভালো দল। বড় নামের। আমাদের দলটাও ভালো ছিল। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে আমরা অভিজ্ঞ ছিলাম না। তবুও সাহস করে খেলে ওদের হারায় দিলাম।’’
২০০৭ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু। বৈশ্বিক এই প্রতিযোগিতার বয়স এখন ১৯। দশম আসরের খেলা শুরু হচ্ছে আজ। আগের নয় আসরের প্রতিটিতেই ছিল বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিবারই বেজেছে ‘‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…।’’ সুরে সুর মিলিয়েছেন সাকিব, তামিম, লিটন, মোস্তাফিজুররা। কখনো সাফল্যের অমৃত স্বাদ পেয়েছেন তারা। কখনো যোগ হয়েছে দুঃস্মৃতি, তিক্ত অভিজ্ঞতা। অর্জনের চেয়ে হারানোর পাল্লা ভারী। তবুও লাল-সবুজের পতাকা প্রতিবারই উড়েছে পতপত করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার পর ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, ভারত, আবুধাবি, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র সবখানেই উল্লাস, উচ্ছ্বাসে মেতে ছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিনিধিরা। কখনো সমর্থকরা হেসেছেন। কখনো কেঁদেছেন। তবে প্রতিবারই বড় আশা নিয়েই অপেক্ষায় ছিলেন তারা। এবার হয়তো বাংলাদেশ করে দেখাবে!
২০১৪ সালে একই সঙ্গে নারী ও পুরুষ দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনও করেছিল বাংলাদেশ। অথচ সেই মঞ্চে এবার নেই লাল-সবুজের বাংলাদেশ। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজন করা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ। বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ ছিল ভারতে। তিনটি কলকাতায়। একটি মুম্বাইয়ে। কিন্তু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকায় সরকার থেকে বাংলাদেশ দলকে ভারতে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটের সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। মোস্তাফিজুরকে বাদ দেওয়ার ঘটনার জেরে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ইসু্যতে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যেতে রাজী নয়। সরকার থেকে আসে এই সিদ্ধান্ত। দাবি উঠে, যেখানে একজন ক্রিকেটারের নিরাপত্তা দিতে পারবে না ভারত, সেখানে পুরো ক্রিকেট দলকে নিরাপত্তা দেবে?
আইসিসিকে চিঠি দিয়ে ভেনু্য পরিবর্তনের অনুরোধ করে বিসিবি। আইসিসি পাল্টা চিঠিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা চাহিদা কী তা জানতে চায়। পরের চিঠিতে বিসিবি ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের পাশাপাশি ভারত থেকে পাওয়া হুমকির কিছু ভিডিও ফুটেজ এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের লিংকও আইসিসিকে পাঠায়।
পরবর্তীতে গত ১৩ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্স করে দুই পক্ষ। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনারও পরও কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারেনি আইসিসি ও বিসিবি। বাংলাদেশকে ভারতে খেলতে আইসিসি অনুরোধ করে। বাংলাদেশও সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের শক্ত অবস্থান দেখায়।
এরপর সামনাসামনি আলোচনা করতে আইসিসির একজন প্রতিনিধি বাংলাদেশে আসেন। অনলাইন সভায় যোগ দেন আইসিসির আরেক প্রতিনিধি। দুটি সভাতেই ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যেতে আগের অবস্থানেই অনড় থাকার কথা আইসিসিকে জানিয়ে দেয় বিসিবি। তবে আইসিসিও আরেক দফায় জানিয়ে দেয়, সূচিতে কোনো পরিবর্তন তারা আনবে না।
পরবর্তীতে আইসিসির বোর্ড সভাতেও বাংলাদেশের অনুরোধ তলিয়ে গেছে। বাংলাদেশ নিজের ভোট বাদে মাত্র একটি দেশের ভোট পেয়েছে। মোট ১৬টি দেশের ভোটের ১৪টিই বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে সাম্ভাব্য দুইটি পথ খোলা ছিল। এক, আইসিসির ওপর বিশ্বাস রেখে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা। দুই, ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তে অনড় অবস্থান। বাংলাদেশ পরের অপশনটাই বেছে নেয়।
আইসিসিকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে না জানিয়ে দেয়। আইসিসিও বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে র্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা দল স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দেয়। আজ ইডেনে তাদের ম্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করে বাংলাদেশ নানামুখী জটিলতায় পড়বে। বাংলাদেশের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী অপেক্ষা করছে তা সময় বলে দেবে।
ঢাকা/ইয়াসিন