ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩০

র‌্যাব হেফাজতে জেসমিনের মৃত্যু, বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি

রাজশাহী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৬, ১ এপ্রিল ২০২৩  
র‌্যাব হেফাজতে জেসমিনের মৃত্যু, বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি

র‌্যাব হেফাজতে নওগাঁ ভূমি অফিসের কর্মচারী সুলতানা জেসমিনের (৩৮) মৃত্যুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন রাজশাহীর বিশিষ্টজনেরা।

শনিবার (১ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি জানানো হয়। এর আগে, গতকাল সরেজমিনে অনুসন্ধানে যান রাজশাহীর কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।

সেই অনুসন্ধান দলে ছিলেন- রাজশাহীর বিশিষ্ট গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ, আইনজীবী হাসনাত বেগ প্রমুখ। আজ তারা সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন।

অনুসন্ধান দলের গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘‘জেসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনও মামলা হয়নি। জেসমিনের মামা এ নিয়ে মামলা করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, মামলা তো পরের কথা, আমরা কি অবস্থায় আছি তা আপনারা বুঝতে পারছেন না। কোনও রকম চাপে আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, এটা কি বোঝাতে হবে! অথচ এই ব্যক্তি ওই এলাকায় পাঁচবার পৌরসভার কাউন্সিলর ছিলেন। এলাকায় তিনি প্রভাবশালী হিসেবেই পরিচিত। এখন জেসমিনের পরিবার ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তারা আতঙ্কিত।’

অনুসন্ধান দলটি নওগাঁর মুক্তির মোড়ে গিয়ে জেসমিনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছে উল্লেখ করে মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘‘প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, জেসমিনকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয়েছিল সাদা পোশাকে। র‌্যাবের সেই দলে কোনও নারী সদস্যকে প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেননি। ধাক্কা দিয়ে তাকে মাইক্রোবাসের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ ছাড়া এ রকমভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া ‘আটক’ নয়, এটিকে আমরা ‘অপহরণ’ হিসেবে মনে করছি। এটাও একটা অপরাধ।’’

তিনি বলেন, ‘‘এলাকার লোকজন বুঝতে পারেননি, যে র‌্যাব তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কারা তাও নিশ্চিত হতে পারেননি তারা। ঘটনার সময় র‌্যাবের সঙ্গে যুগ্ম সচিব এনামুল হকও ছিলেন। পরবর্তীতে জেরার মুখে তিনি স্থানীয় এক সাংবাদিককে বলেছেন, তিনি নওগাঁ গিয়েছিলেন বিরিয়ানি খেতে।’’

মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘জেসমিনের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না। একজন নাগরিক যদি অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন তার বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সেখানে কোনও রকম আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া একজন নাগরিককে সরকারি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৌখিক কথায় এবং তার উপস্থিতিতে উঠিয়ে নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, যার পরিণতিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। জেসমিনের ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে, এ দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মানবাধিকার রক্ষায় দুঃখজনকভাবে উদাসীন। রাষ্ট্রযন্ত্র মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েও তা রক্ষায় বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।’

মাহবুব সিদ্দিকী মনে করেন, এই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি এই দাবি জানান। পাশাপাশি জেসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় একটি মামলা করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘জেসমিনও একজন সরকারি সরকারি কর্মচারী ছিলেন। কোনও অপরাধ করলে সহজেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। তা না করে যে প্রক্রিয়া বেছে নেওয়া হয়েছে তা রহস্যজনক। ইতিমধ্যে যুগ্ম সচিব এনামুল হকের বিষয়েও গণমাধ্যমে নানা তথ্য উঠে এসেছে। সব কিছুর সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’

উল্লেখ্য, র‌্যাব-৫ এর জয়পুরহাট ক্যাম্পের একটি দল গত ২২ মার্চ সকালে জেসমিনকে আটক করে। স্থানীয় সরকারের রাজশাহী বিভাগের পরিচালক মো. এনামুল হকের মৌখিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে নিয়েই র‌্যাব এ অভিযান চালায়।

এনামুল হকের অভিযোগ, জেসমিন ও আল-আমিন নামের এক ব্যক্তি তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছিলেন বিভিন্ন জনকে। এভাবে তারা প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিলেন।

এদিকে, আটকের একদিন পর ২৪ মার্চ সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জেসমিন মারা যান। তার মৃত্যুর পর রাজশাহীর রাজপাড়া থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যুগ্ম সচিব এনামুল হকের করা একটি মামলার কথা জানা যায়, যেটি রেকর্ডের সময় ২৩ মার্চ বিকেলে। জেসমিন ও তার কথিত সহযোগী আল-আমিনকে এতে আসামি করা হয়। আল-আমিনকে ২৬ মার্চ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তিনি একজন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট।

জেসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় র‌্যাব-৫ এর জয়পুরহাট ক্যাম্পের ১১ জন সদস্যকে রাজশাহীতে ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে আনা হয়েছে। র‌্যাবের গঠিত একটি তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।

এ ঘটনায় যুগ্ম সচিব এনামুল হকের ব্যাপারেও তদন্ত হয়েছে। জেসমিনের মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আগামী ৫ এপ্রিলের মধ্যে হাইকোর্টে জমা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। তবে শনিবার পর্যন্ত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়নি।

কেয়া/কেআই

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়