বাগেরহাটে বিএনপির গলার কাঁটা বিদ্রোহী প্রার্থী
বাগেরহাট সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম
বাগেরহাটে সংসদীয় ৪টি আসনে ২৩ জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়ছেন। প্রতীক বরাদ্দের পর পুরোদমে চলছে নির্বাচনি প্রচার। প্রতিটি আসনে বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করছে সচেতন মহল ও ভোটাররা।
বিএনপির প্রার্থীদের উপর বাড়তি চাপে ফেলছে নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বাগেরহাট-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বাগেরহাট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা ও বাগেরহাট-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী খায়রুজ্জামান শিপনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম বাগেরহাট ১, বাগেরহাট ২ এবং বাগেরহাট ৩টি আসনে হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তিনি এবার তিনটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অংশ নেওয়ায় ভাসমান ভোটের কদর বেড়েছে। হাটে–ঘাটে মাঠে ময়দানে ও চায়ের দোকানে ভোটারদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। কেউ কেউ ব্যক্তি ইমেজ কাজে লাগাতে চাইছে।
বাগেরহাট-১ আসন
বাগেরহাটের চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাট এই তিন উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট-১ আসন। সরকার পরিবর্তনের পরে এই আসনে বিএনপির অর্ধ ডজন নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকলেও শেষ পর্যন্ত চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক কপিল কৃষ্ণ মন্ডলকে মনোনয়ন দিয়েছেন। মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে আছেন তিনি।
তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শেখ মাসুদ রানা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। দলীয় অনেক নেতাকর্মী এম এ এইচ সেলিম ও মাসুদ রানার পক্ষে কাজ করছেন।
এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির শুরা সদস্য অধ্যক্ষ মো. মশিউর রহমান খান। ৫ আগস্টের পরে দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা ও প্রচারে ভোটের মাঠে আলাদা সুবিধা পাচ্ছেন তিনি। সাধারণ মানুষের ধারণা, স্বতন্ত্র দুই প্রার্থীর কারণে বিএনপির প্রার্থী চ্যালেঞ্জে পড়বে।
এছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী আবু সবুর শেখ, এবি পার্টি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি-জেপির স ম গোলাম সরোয়ার, মুসলিম লীগের এমডি শামসুল হক নিজ নিজ দলের প্রতীক নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘‘দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলের সকল নেতাকর্মী আমার সঙ্গে রয়েছে। আমরা তারেক রহমানকে এই আসন উপহার দিতে পারব।’’ এ আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সচেতন মহল ও ভোটাররা।
বাগেরহাট-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬০ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৩৮ জন পুরুষ, ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭২০ নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের দুইজন ভোটার রয়েছেন।
বাগেরহাট-২ আসন
বাগেরহাট সদর, বাগেরহাট পৌরসভা ও কচুয়া উপজেলা নিয়ে বাগেরহাট-২ আসন। এই আসনটি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, এই আসন থেকে যে দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, তারাই সরকার গঠন করেছে। এই আসনে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেনকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক শুরু করেন। এখন সভা-সমাবেশেও যোগ দিচ্ছেন দলীয় প্রার্থী হিসেবে।
এই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচন করছেন বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ এইচ সেলিম। এম এ এইচ সেলিম বলেন, ‘‘২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত এই আসন থেকে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলাম। তখন জেলার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। শহর রক্ষা বাঁধ, মাজেদা বেগম কৃষি কলেজ, দড়াটানা ও মুন্সীগঞ্জ সেতু, বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজসহ জেলা জুড়ে আমার উন্নয়নের ছোয়া লেগে আছে। তাই আমি তিনটি আসনে নির্বাচন করছি। আশা করি, নির্বাচিত হয়ে তারেক রহমানকে আসন উপহার দেবো।’’
এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম মনোনীত প্রার্থী শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ বয়সে তরুণ হলেও ভোটের মাঠে বেশ প্রভাব বিস্তার করেছেন। সরকারি পিসি কলেজের সাবেক এজিএস থেকে শুরু করে ইসলামী ছাত্রশিবিরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলন সংগ্রামে সম্মুখভাগে থাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘‘বিএনপি সুসংগঠিত দল। দলের সকল নেতাকর্মী আমার সাথে আছেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই।’’ এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আতিয়ার রহমান প্রচারে আছেন।
এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সচেতন মহল ও ভোটাররা।
বাগেরহাট ২ আসনে দুই উপজেলা ও এক পৌরসভায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন পুরুষ, ১ লাখ ৭০ হাজার ২৬৫ জন নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ৫ জন।
বাগেরহাট-৩ আসন
রামপাল, মোংলা উপজেলা ও মোংলা পোর্ট পৌরসভা নিয়ে বাগেরহাট-৩ আসন। অন্যান্য আসনের মতো এই আসনে বিএনপি, স্বতন্ত্র, জামায়াত ও অন্যান্য দলের প্রার্থী রয়েছেন।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল ওয়াদুদ শেখের সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভাবনা রয়েছে।
এই আসনে ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে আসছে। যার ফলে এলাকার ভোটারদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীও দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থাকায়, তারও জনপ্রিয়তা রয়েছে।
বাগেরহাট-৪ আসন
মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা উপজেলা ও মোরেলগঞ্জ পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৪ আসন। অবকাঠামো, শিক্ষা ও উন্নয়নের দিক থেকে এই এলাকা পিছিয়ে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে এলাকার ভোটাররা সচেতন। বিগত দিনগুলোতে এখানে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য, সাবেক জাতীয় পার্টির নেতা এবং মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি সোমনাথ দে-কে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে। এই আসনেও বিএনপির প্রার্থীর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাজ করছে জেলা বিএনপির নেতা কাজী খায়রুজ্জামান শিপন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শিপন বলেন, ‘‘দলের নেতাকর্মীদের অনুরোধে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশ নিয়েছি। ফ্যাসিস্ট দেশ থেকে বিদায় হয়েছে। দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তিনি একজন ফ্যাসিস্ট দলের নেতা।’’
জামায়াতে ইসলামী থেকে এই আসনে নির্বাচন করছেন সাবেক ছাত্র নেতা অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই আসনের প্রার্থী হিসেবে এলাকায় জনসংয়োগ করে আসছেন। জামায়েতের নেতাকর্মীদের দাবি, এই আসনে জামায়েতের প্রার্থী আগেও নির্বাচিত হয়েছেন। এবার বিএনপির অন্তর্কোন্দল ও দুর্বল প্রার্থীর কারণে দাড়িপাল্লার জয় অনেকটা সহজ হবে।
তবে বিএনপির প্রার্থী সোমনাথ দের ভাবনা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘‘দলের চেয়ারম্যান সব জেনে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছে। এক সাথে কাজ করছে। হিন্দু ধর্মীয় নেতা হওয়ার কারণে সনাতনদের ভোট এককভাবে পাব।’’
জামায়াতের প্রার্থী আব্দুর আলিম বলেন, ‘‘আমরা দীর্ঘদিন মানুষের পাশে আছি। বিগত সময়ের থেকে দল এবং সংগঠন আরো বেশি সক্রিয়। সে হিসেবে এবার আমাদের জয় হবে ইনশাল্লাহ।’’
এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ওমর ফারুক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির আব্দুল লতিফ খান, জাতীয় পার্টি-জেপির সাজন কুমার মিস্ত্রি নির্বাচনের মাঠ দাফিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বাগেরহাট ৪ আসনে দুই উপজেলা ও এক পৌরসভায় ৩ লাখ ৮০ হাজার ৬৭৮ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯১ হাজার ৮১২ জন পুরুষ, ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৬৩ জন নারী ও ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার।
ঢাকা/আমিনুল/বকুল