রাজশাহী অঞ্চলে গাছে গাছে মুকুল, স্বপ্ন বুনছেন চাষিরা
মাহী ইলাহি, রাজশাহী || রাইজিংবিডি.কম
রাজশাহী শহরের একটি আম গাছ মুকুলে ভরে উঠেছে।
প্রকৃতিতে এখন ফাল্গুনের ছোঁয়া বিরজমান। গাছে গাছে ফুল আর ফলের আগমন বার্ত। পাখিদের কিচিরমিচির কলরব ও চারদিকে বিভিন্ন ফুলের সুবাসে মাতোয়ার প্রকৃতি। এই সময় আম্রকানন সুবাসিত হবে না, এটা তো হতে পারে না। মুকুলের গন্ধে মৌ মৌ করছে রাজশাহী অঞ্চলের আমবাগানগুলো। প্রায় প্রতিটি গাছ ভরপুর হয়ে উঠতে শুরু করেছে আমের মুকুলে।
রাজশাহী অঞ্চলের শতভাগ গাছেই কম-বেশি মুকুল এসেছে এবার। ইতোমধ্যে আগাম জাতের কিছু গাছে আমের সবুজ গুটিও দেখা যাচ্ছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে। তাই বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আমের বাম্পার ফলন হবে এমনটি আশা করছে কৃষি বিভাগ। বাগানিরা বলছেন, গাছে মুকুলের সমারোহ দেখে তাদের মন ভরে উঠেছে। গতবারের লোকসান কাটিয়ে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় তারা।
বাগানিরা জানান, গেল বছর ফলন ভালো হলেও অতিবৃষ্টির কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাদের। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ এবং রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন বাগানিরা।
রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠন করা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল। এই চার জেলায় ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে। গাছ আছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। এসব গাছে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত মুকুল এসেছে। পর্যায়ক্রমে সব গাছে মুকুল চলে আসবে আশা করছে কৃষি অফিস।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের তথ্য বলছে, গেল মৌসুমে রাজশাহীতে ২ লাখ ৬০ হাজার টন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ লাখ ৫০ হাজার টন, নওগাঁয় ৪ লাখ ৩২ হাজার টন এবং নাটোরে ১ লাখ ৩৪ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছে। এবার উৎপাদন আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজশাহী জেলাতে আমবাগান আছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে। গাছ আছে ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৭টি। মুকুল এসেছে ৬০ শতাংশ গাছে। নওগাঁ জেলাতে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আছে আমের বাগান। ২ কোটি ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩২৫টি আমগাছ আছে। মুকুল এসেছে ৭১ শতাংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগান আছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে। গাছ আছে ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৬৫টি। আমের মুকুল এসেছে ৭০ শতাংশ। নাটোরে আমবাগান আছে ৫ হাজার ৬৯ হেক্টর জমিতে, গাছ আছে ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৭টি। মুকুল এসেছে ৫৩ শতাংশ গাছে। কৃষিবিভাগ বলছে, এখনও অনেক গাছে মুকুল আসেনি। যেগুলোতে মুকুল এসেছে মৌসুমের শুরুতে সে আমগুলো পাওয়া যায়।
রাজশাহী বাঘা উপজেলার আমচাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, “গেলবারের চেয়ে এবার গাছে বেশি মুকুল এসেছে। বড় ঝড় না হলে প্রচুর আম পাওয়া যাবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলনো ভালো হবে। তবে, এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত কীটনাশক দেওয়া হচ্ছে। সন্তানের মতো করে গাছ পরিচর্যা করা হচ্ছে।”
পুঠিয়ার আমচাষি মোহাম্মদ আলী বলেন, “এ বছর মুকুল আসার জন্য আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো আছে। দিনের বেলায় যে তাপমাত্রা দরকার তা রোদের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গাছে গাছে অনেক মুকুল এসেছে। এই রকম আবহাওয়া আরো ১০ দিন থাকলে ভালো পরিমাণে মুকুল আসবে।”
তিনি বলেন, “গত বছর মুকুল ভালো হলেও বাজারজাতের সময় টানা বৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়ে যায়। দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। এ বছর আমের ভালো ফলনের আশাতেই সবাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, “আমের ফলন এবার খুবই ভালো হবে আশা করছি। পাশাপাশি এবার যাতে চাষিরা আম রপ্তানি করতে পারেন, সে লক্ষ্যেও কাজ চলছে। প্রতিটা উপজেলায় এ ব্যাপারে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। আশা করছি, এবার ভালো আম রপ্তানি হবে।”
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার শীত খুব সুন্দরভাবেই শেষ হয়েছে। শেষের দিকে কোনো কুয়াশা ছিল না, বৃষ্টিও হয়নি। তাপমাত্রাটা বেড়েছে ধীরে ধীরে। হঠাৎ করে তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ফলে গাছ মুকুল দেওয়ার সিদ্ধান্ত ধরে রাখতে পেরেছে।”
তিনি বলেন, “এবারের আবহাওয়া মুকুলের জন্য একেবারেই উপযোগী ছিল। তা ছাড়া, গতবার মুকুল একটু কম এসেছিল। যেসব গাছে মুকুল কম ছিল, সেগুলোতেও এবার মুকুল এসেছে। এ কারণে প্রচুর মুকুল দেখা যাচ্ছে। এখন চাষিদের গাছে সেচ দিতে হবে। মুকুল আসার পর একবার ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। তাহলে মুকুল টিকে যাবে।”
ঢাকা/মাসুদ