ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৫ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২০ ১৪৩২ || ১৫ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

খুলনার ত্রাস আশিক বাহিনীর প্রধান কে এই আশিক?

মো. নুরুজ্জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫৮, ৫ মার্চ ২০২৬  
খুলনার ত্রাস আশিক বাহিনীর প্রধান কে এই আশিক?

খুলনার অপরাধ জগতের ত্রাস আশিক বাহিনীর প্রধান আশিক।

খুলনা মহানগর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা আশিক বাহিনীর প্রধান আশিক মাত্র ৩০ বছর বয়সি এক তরুণ। কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সন্ত্রাসের জগতে নাম লেখানো আশিক অস্ত্র কেনা-বেচা, মাদক ব্যবসায় হাত পাকিয়ে একের পর এক খুনের মামলায় নাম লিখিয়েছেন। বুধবার রাতে খুলনা শহরে শ্রমিকদল নেতা মাসুম বিল্লাহ হত্যায় আশিক বাহিনীর নাম এসেছে। এই তরুণের দৌরাত্ম্য দাপটে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে বিভাগীয় শহর খুলনা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার (সিটিএসবি) মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা .. রোকনুজ্জামান বিষয়টি সম্পর্কে রাইজিংবিডি ডটকমকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনার রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক এবং রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুমকে খুলনা মহানগরীর ডাকবাংলো মোড়ের বাটার দোকানের ভিতরে গুলি করে কুপিয়ে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এই হত্যায় অংশ নেন সাত-আটজন অস্ত্রধারী।

আরো পড়ুন:

তিনি আরো জানান, মাসুমকে হত্যার ঘটনায় বিদেশি পিস্তলসহ অশোক ঘোষ নামে এক অস্ত্রধারীকে আটক করা হয়। তিনি নগরীর লবণচরা থানার সাচিবুনিয়া এলাকার বিশ্বনাথ ঘোষ সুমিত্রা ঘোষের পুত্র।

খুলনা মহানগর পুলিশের সূত্র বলছে, আটক হওয়া সন্ত্রাসী অশোক ঘোষ আশিক গ্রুপের একজন অস্ত্রধারী সদস্য। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

ঈদের আগে মধ্য রমজানে খুলনার প্রাণকেন্দ্রে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর থমথমে হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। আর তাতে ঘুরে ফিরে আসছে আশিক বাহিনীর ত্রাসের গল্প।

কে এই আশিক?

খুলনা শহরের বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করা সন্ত্রাসী গ্রুপ আশিক বাহিনী। এই বাহিনীর নাম কেএমপির তালিকায় রয়েছে, যেখানে বাহিনীপ্রধান হিসেবে নাম রয়েছে আশিকের। আশিকের বাড়ি খুলনা মহানগরীর সদর থানার চানমারী এলাকায়। আশিকের বাবা জুলফিকার আলী ওরফে জুলফি ছিলেন সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত। তিনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হন। তখন আশিক বয়সের কম থাকলেও ধীরে ধীরে কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে অপরাধ জগতে পা বাড়ায়।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বর প্রথম হত্যা মামলায় নাম আসে আশিকের। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় তার নামে পাঁচটি-সাতটি মামলা হয়েছে। আশিক নিজে গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও তার বাহিনীর সদস্যরা খুলনায় দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে। জমি দখল, ঘাট-ভেড়ি দখল, পরিবহনে চাঁদাবাজির মতো কাজ করে থাকেন আশিকের অনুসারীরা।

পুলিশ গোপন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আশিক বাহিনীতে অস্ত্রধারী সদস্য ২০-২৫ জনের মতো। এসব অস্ত্রধারীদের নামে বিভিন্ন থানায় ১১০টির বেশি মামলার তথ্য রয়েছে।

খুলনায়ওপেন সিক্রেটনাম আশিকের প্রধান সহযোগী ফয়সাল। খুলনা সদরের দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা এই ফয়সালের নাম প্রথম হত্যা মামলায় আসে ২০১৬ সালে। যতদূর জানা যায়, ২০১৮ সালে আশিকের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয় এবং আশিক বাহিনীর প্রধান অনুচর হিসেবে ভূমিকা রাখা শুরু করেন তিনি। এই ফয়সালের নামে বিভিন্ন থানায় আটটি মামলার তথ্য রয়েছে।

আশিক বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম বস মিজান, আব্দুল্লাহ, পালসার সোহেল, কাউট বাসার, জাহিদুল ইসলাম, হেলাল, নাদিম, ডালিম, পারভেজ, দুলাল, অপু, সাগর লেলিন, জিহাদ হোসেন জিয়া, আরমান, সাইফুল ইসলাম পিটিল, গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যারা মোস্ত, মো. ইয়াছিন, মো. নিয়াজ মোর্শেদ, শেখ বাবুল এবং স্পিকার মিরাজ। এরমধ্যে পিটিল জোড়াহত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ড নিয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

দাপুটে নাম গ্রহণকারী বস মিজান, ট্যারা মোস্ত, স্পিকার মিজান খুবই ভয়ংকর স্বভাবের, হামলা-হাঙ্গামায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ডজনের ওপরে মামলা রয়েছে।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, বছর দশেক আগে এলাকার কিশোরদের নিয়েকিশোর গ্যাংতৈরি করে আশিক। দলবেঁধে মহড়া দিয়ে শক্তি প্রদর্শন করতেন তারা। সেই দাপটের ফল হিসেবে তাদের হাতে আসে মাদক অস্ত্র। জনশ্রুতি আছে, সেই জোরে জমি দখলের কাজ পেতে শুরু করেন আশিক।

বর্তমানে খুলনা শহরের মাদক কারবারেও আশিক বাহিনী শীর্ষে রয়েছে। আশিকের সঙ্গে তার বড় ভাই সজিবের নামও জড়িয়ে রয়েছে এই সন্ত্রাসী জগতে। গত বছর বিপুল পরিমাণ মাদকসহ যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয় সজীব।

সর্বশেষ বুধবার রাতে মাসুম বিল্লাহ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আবার আলোচনায় কেন্দ্রে উঠে এলো সংঘবদ্ধ এই সন্ত্রাসী চক্র, যার নাম আশিক বাহিনী। এই বাহিনীর অন্যতম অস্ত্রধারী সদস্য অশোষ ঘোষ মাসুমকে হত্যার ঘটনায় আটক হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সাত-আটজনের বাকিদের ধরতে পারলে বেরিয়ে আসবে, তারাও আশিক বাহিনীর সদস্য কি না।

খুলনায় আরো বাহিনী সক্রিয়, ১৩ মাসে খুন ৬১

খুলনায় গত ১৩ মাসে গড়ে প্রায় পাঁচটি খুন হয়েছে। পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে অন্তত ৬১টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে।

এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গুলি করে হত্যা ২৬টি, কুপিয়ে হত্যা ১৯টি, বাকিগুলো গুম-অপহরণের পর খুন। মূলত মাদক সাপ্লাই রুটের নিয়ন্ত্রণ টাকা ভাগাভাগি নিয়েই খুনগুলো হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

সন্ত্রাস মদক কারবার বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর রয়েছে। কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমকে জানান, খুলনায় ৪০টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

খুলনার ্যাব কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, একের পর এক অভিযান চালিয়ে তারা একাধি সন্ত্রাসী বাহিনীর ৩০-৪০ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছেন। বাহিনীগুলোর হোতাদেরও টার্গেটে রেখেছেন তারা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, এসবের পেছনে রয়েছে নগরীর ৮টি সন্ত্রাসী বাহিনী। তারাই খুলনার অপরাধজগত নিয়ন্ত্রণ করছে।

গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে একাধিক সন্ত্রাসী সংগঠনের উত্থান, মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে প্রতিনিয়ত খুনোখুনি হচ্ছে। সময়ে ৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, খুলনা নগরীতে কিশোর গ্যাং নিয়ে গড়ে ওঠে রোহান পলাশ গ্রুপ। পরে এই দুই গ্রুপ ভেঙে গিয়ে চারটি বাহিনীতে রূপ নেয়। পলাশ, গ্রেনেড বাবু, আশিক নুর আজিম আলাদা বাহিনী গঠন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলিয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে পলাশ গণপিটুনিতে নিহত হলেও তার বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে।

অন্যদিকে দৌলতপুরের শীর্ষ চরমপন্থি হুমায়ুন কবীর হুমা, আরমান শেখ ওরফে আরমিন নাসিমুল গণি ওরফে নাসিমের আলাদা বাহিনী রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, নাসিম শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকন হত্যা মামলায় দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে জেলহাজতে থাকায় এই বাহিনী কিছুটা নিষ্ক্রিয় ছিল। গত ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নাসিম এবং অন্য বাহিনীর প্রধান আরমান খুলনার নতুন কারাগার থেকে মুক্তি পান। ফলে খুলনায় এখন ৮টি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।

এর বাইরে ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দৌলতপুর, তালাসহ বেশ কিছু এলাকায় চরমপন্থিদের তৎপরতা রয়েছে। উপকূলের কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, মোংলা, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা এলাকায় বনদস্যুদের ব্যাপক দাপট রয়েছে। এসব অপরাধী রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝেমধ্যে কিছু সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ আটক হলেও তা খুবই সামান্য।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) রোকনুজ্জামান বলেন, ‘খুলনার প্রতিটি বস্তিতে কমপক্ষে দুজন করে শুটার রয়েছে। তারা এক স্থানে থাকে না। তারা ভাড়াটে হিসেবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে বেআইনি কাজ করে থাকে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করা খুবই কঠিন।

তিনি আরো বলেন, সন্ত্রাসী আশিক গ্রুপের প্রধান আশিক এবং বি-কোম্পানি গ্রুপের প্রধান গ্রেনেড বাবুর অবস্থান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর কাছে পরিষ্কার নয়। কারণ তারা মোবাইল সিম ব্যবহার করে না, ইন্টারনেট এবং অ্যাপস ব্যবহার করে অনলাইনে তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করে। ফলে তারা দেশে না বিদেশে অবস্থান করছে সেটিও ট্র্যাক করা যাচ্ছে না। মূলত এই কারণেই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তারের বিষয় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

্যাব- এর খুলনার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ সম্প্রতি খুলনায় হত্যাকাণ্ডের পরিমাণ বেড়েছে স্বীকার করে বলেন, হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলমান রয়েছে।

এদিকে খুলনায় পরপর চার খুন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খুলনার নাগরিক সমাজ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, “গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ। প্রায় দিনই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক বিক্রেতাদের দৌরাত্ম্যে খুলনাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।”

তিনি বলেন,আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নিরাপত্তা দাবি করেছিলাম। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। সন্ত্রাস দমনে নতুন সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম বলেন, “সন্ত্রাস দমনের এখনই উপযুক্ত সময়। সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে না পারলে খুলনায় মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

ঢাকা/রাসেল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়