খাগড়াছড়ির তীর্থস্থান নুনছড়ি মাতাই পুখিরি
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
মাতাই পুখিরি
পাহাড়ের একপাশে ঝরনা ও অন্যপাশে সিঁড়ি। এই পথ ধরে ১৪৬৫ ধাপ ওপরে ওঠার পর দেখা মেলে স্বচ্ছ পানির পুকুর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ফুট ওপরে অবস্থিত এই পুকুরকে স্থানীয় বাসিন্দারা মাতাই পুখিরি বলে ডাকেন। ত্রিপুরা ভাষায়, এর অর্থ দেবতা পুকুর।
খাগড়াছড়ির নুনছড়ি এলাকায় পাহাড়ের ওপর অবস্থিত প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট এই পুকুরটি এখন নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। মাটি ক্ষয়সহ পানির স্তর কমে যাচ্ছে পুকুরটির। এলাকাবাসী, পুকুর রক্ষা এবং এর সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সরকার ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
জনশ্রুতি আছে, এই পুকুরে বিশ্বাস করে বাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করলে মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ হয়। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের তিনদিন তীর্থ মেলা বসে এই পুকুর পাড়ে, এতে হাজারো মানুষ জমায়েত হয় আর প্রার্থনা করেন। শুধু তাই নয়, সারা বছর স্থানীয়দের যে যখন সময় পান, পুকুর পাড়ে গিয়ে বাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন।
এই পুকুরে শুধু ত্রিপুরা নয়; চাকমা, মারমাসহ সব সম্প্রদায়ের লোক গিয়ে প্রার্থনা করেন। এক সময় এই পুকুরের পানিস্তর সারা বছর সমানভাবে থাকতো। কিন্তু এখন চারিদিকে বন আর গাছ গাছালি কাটার কারণে পুকুরে পানির স্তর অনেকটা কমে যেতে বসেছে। এই পুকুকের ধরে রাখার জন্য এর চারপাশে গাছ লাগানোসহ পুকুর সংস্কার করে এই তীর্থস্থান রক্ষা করা উচিত বলেন মনে করেন এলাকাবাসী ও পূর্ণাার্থীরা।
স্থানীয়র শিমুললতা ত্রিপুরা ও প্রশ্নাদেবি ত্রিপুরা জানান, দেবতা পুকুরটি ঐতিহ্যবাহী তীর্থস্থান। এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ আসেন। এখানে বাতি জ্বলিয়ে প্রার্থনা করলে মানুষের মানস পূর্ণ হয়। আগে, এই পুকুরে সারা বছর সমানভাবে পানি থাকতো এখন আর আগের মতো সারা বছর সামানভাবে থাকে না। এখন পানিটা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, পানিটা কিভাবে ধরে রাখা যায় সে জন্য, কোনো সরকারী প্রতিষ্ঠান বা কোনো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার এগিয়ে এলে রক্ষা হবে এই তীর্থস্থান।
পুকুরে আসা পূর্ণার্থী ও উন্নয়ন কর্মী তনয়া চাকমা বলেন, “এই দেবতা পুকুর অনেক পুরানো। অনেকে বিশ্বাস করেন, এখানে আসলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় তাই, এ কারণে এটা তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। এই দেবতা পুকুরের চারপাশে যদি বিভিন্ ধরনের বনজ-ওষুধি গাছ পালা লাগিয়ে যদি সংরক্ষণ করা এর সৈন্দর্য বৃদ্ধি হবে আর মানুষের জন্য সুবিধা হবে প্রকৃতি রক্ষা হবে।”
আরেক উন্নয়নকর্মী নবলেশ্বর দেওয়ান লায়ন বলেন, “এই পুকুরেরর পানির লেয়ার কমে যাচ্ছে, পানি ধরে রাখার জন্য চারপাশে গাছপালা লাগাতে হবে। আগে যখন গাছ ছিল তখন পানির লেয়ার ওপরে ছিল। এটাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন রাখার জন্য এলাবাসীর সহযোগিতা দরকার।”
নুনছড়ি মৌজার হেডম্যান ক্ষেত্র মোহন রোয়াজা বলেন, “নুনছড়ি মাতাই পুখিরি বা দেবতা পুকুর এটা একবারের প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তির তিনদিন তীর্থ মেলা বসে এই পুকুর পাড়ে। এ সময় সেখানে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। এখানে শুধু ত্রিপুরা নয়, চাকমা, মারমাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন এসে সমাগম হয় আর র্তীর্থ স্নান করার জন্য সবাই আসে। প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট এই পুকুরকে রক্ষার জন্য ২০০৬ সালে ১০১ জনের একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির লোকজন এখন চেষ্টা করতেছে পানির স্তর কিভাবে ধরে রাখা যায় আর কিভাবে জীব বেচিত্র্যা সংরক্ষণ করা যায় তা নিয়ে।”
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, “দেবতা পুকুর একটি তীর্থ স্থান। এই পুকুর রক্ষার জন্য ইউএনডিপির বায়োডার্ভাসিটি প্রকল্পের অর্থায়নের খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানকার পাড়াবাসীরা যাতে গাছ কেটে জীবন নির্বাহ না করেন তাদের জন্য অন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
ঢাকা/রূপায়ন/মাসুদ