বৈশ্বিক বাণিজ্য হুমকির মুখে: ডিসিসিআই সভাপতি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের কারণে সামগ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছে, বিশেষ করে আমাদের শিল্প খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশ আমদানি নির্ভর হওয়ায় দেশের বেসরকারি খাতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই সাথে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক নতুন শুল্ক নীতি স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব আসতে পারে।
সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীর মতিঝিল ডিসিসিআই মিলনায়তনে বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করার সময় ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ এসব কথা বলেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সেমিনারটির আয়োজন করে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি প্রধান অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন।
এছাড়া বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন, সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি) এর অতিরিক্ত সচিব ও প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা চেম্বার সভাপতি বলেন, “দেশের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় এলডিসি উত্তরণ আরো ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজকরণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পাশাপাশি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর তিনি জোরারোপ করেন। সেই সাথে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অটোমেশন, প্রত্যক্ষ করের ওপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে আওতা বৃদ্ধি, দেশীয় ব্যাংক ব্যবস্থার হতে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা হ্রাস ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, “অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিয়তা, স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে স্থবিরতা প্রভৃতি কারণে দেশের বেসরকারি খাতের অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয়।”
মূল প্রবন্ধে তাসকীন আহমেদ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, এলডিসি উত্তরণ, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ও ম্যানুফেকচারিং খাত, সিএমএসএমই, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং আর্থিক খাতের ওপর আলোচনা করেন।
তিনি আরো বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রত্যহার, সুদহার হ্রাস, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সাপ্লাইচেইন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ়করণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার কোন বিকল্প নেই।”
এছাড়া স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে গতি আনার লক্ষ্যে ব্যবসা পরিচালন ব্যয় হ্রাসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত নিশ্চিতকরণ ও সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন।
টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্প-কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনশোর ও অফশোর অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরাদারের আহ্বান জানান তাসকীন আহমেদ।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, “এ সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে বর্ণিত আর্থিক সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর নীতি প্রণয়নে কাজ করে যাচ্ছে।”
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সরকার সচেতন এবং এ অভিঘাত মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ এ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “দেশের উন্নয়নের সুফল যেন প্রতিটি মানুষ পেতে পারে তার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
তিনি জানান, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দক্ষজনবল তৈরিতে সরকার প্রাধান্য দিবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, “আয় ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সহায়তা প্রদানের কাজ করছে নতুন সরকার, যা প্রশংসার দাবি রাখে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, “মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৯ এ রয়েছে। তবে সম্প্রতি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিতে হবে। তা না হলে মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, “সরকারকে আয়ের জন্য শুল্কের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কমাতে হবে এবং সেই সাথে স্থানীয় শিল্প সুরুক্ষার বিষয়টিও একটি নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন।”
বিআইডএস’র মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, “দেশের কৃষি খাতে দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ দিকে ধাবিত হচেছ। ফলে বিশেষ করে চাল উৎপাদন লাভজনক না হওয়ায় কৃষকের হতাশা হচ্ছে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে চাল উৎপদান হ্রাস পেতে পারে, এছাড়াও বাজারের সাপ্লাইচেইন ব্যবস্থাপনাও কার্যকর নয়, এ বিষয়গুলো সচেতনভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।”
তিনি বলেন,“আমাদের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো অর্থায়ন, যা মোকাবিলায় ব্যাংক খাতকে সংষ্কারের মাধ্যমে আরো উদ্যোগী হতে হবে।”
ঢাকা/নাজমুল/এসবি