ঢাকা     রোববার   ৩১ মে ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৭ ১৪৩৩ || ১৪ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভক্ত কিংবা ভালোবাসার মানুষ দূরে থাকলেই ভালো: কোনাল

জান্নাতুল ফেরদৌস || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:১৬, ২৯ মে ২০২৬   আপডেট: ১৫:২০, ২৯ মে ২০২৬
ভক্ত কিংবা ভালোবাসার মানুষ দূরে থাকলেই ভালো: কোনাল

শ্রোতাপ্রিয় সংগীতশিল্পী সোমনূর মনির কোনাল। দেড় দশকের সংগীত ক্যারিয়ারে বেশ কিছু জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। সংগীত জীবন, ঈদস্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন এই শিল্পী। আলাপচারিতায় তার সঙ্গে ছিলেন রাইজিংবিডির সহ-সম্পাদক জান্নাত। 

রাইজিংবিডি: ঈদুল আজহায় আপনার নতুন কোন গানগুলো রিলিজ হচ্ছে?

কোনাল: ঈদে কয়েকটি নাটকে আমার গান রিলিজ হবে। তবে শেষ পর্যন্ত কয়টি সিনেমা মুক্তি পাবে নিশ্চিত বলতে পারছি না। এর মধ্যে ‘পিনিক’ গানটি আমি গেয়েছি। আরেকটি সিনেমায়ও আমার গান আছে, এটা ববি আপুর জন্য গেয়েছি—পার্টি সং। সব মিলিয়ে দুটো সিনেমায় আমার গান আছে। 

রাইজিংবিডি: ছোটবেলায় আপনার ঈদের স্মৃতিকথা শুনতে চাই। 

কোনাল: ছোটবেলার ঈদ গ্রামের বাড়িতে কেটেছে। দাদাবাড়ি ছিল মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে। ঈদে আমরা সবাই দাদাবাড়ি চলে যেতাম। চাচা, ফুফু, দাদা-দাদি, কাজিন—সবাই মিলে বিশাল আয়োজন হতো। আনন্দে বাড়ি ভরে থাকত। তারপর আমরা কুয়েত চলে যাই। তখন আমার বয়স প্রায় পাঁচ বছর। এরপর ঈদ কেটেছে কুয়েতে। সেখানে ঈদ একদম আলাদা—শুধু বাবা-মা, আমি আর আমার ছোট ভাই। প্রবাসের ঈদে বড় পরিবারের সেই আনন্দটা ছিল না। আসলে খুব বেশি স্মৃতি নেই, কিন্তু ছোটবেলার সেই অল্প কিছু স্মৃতিই অনেক সুন্দর। সবাই মিলে চাঁদরাত পালন করা, কাজিনদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ফুফু-চাচিদের ব্যস্ততা—এসব এখনো মনে পড়ে। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। চাঁদরাতের আসল আলো ছিল চাঁদের আলো। আগে রাতে জোনাকি পোকা দেখা যেত। এখনো সেসব মনে পড়ে। একদিকে মেহেদি বাটা হচ্ছে, অন্যদিকে রান্না হচ্ছে—এই দৃশ্যগুলো মনে আছে। কিন্তু প্রবাসের ঈদ ছিল অনেকটা একা; একই নিয়মে কাটত। খুব বেশি রঙিন ছিল না। 

রাইজিংবিডি: কুয়েতে কোরবানির ঈদের অভিজ্ঞতা আরেকটু বিস্তারিত যদি বলতেন। 

কোনাল: কুয়েতে বাসার সামনে পশু জবাই বা কোরবানি দেওয়ার অনুমতি নেই। কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট কিছু জায়গা থাকে, সেখানেই পশু কোরবানি করা হয়। এরপর মাংস বাসায় নিয়ে আসা হয়। তাই গরু আনা হলে মাঝে মাঝে দেখতে পারতাম, আবার অনেক সময় সেটাও পারতাম না। এ কারণে ছোটবেলায় কোরবানির পুরো আবহ সেভাবে অনুভব করতে পারিনি। বড় হয়ে বাংলাদেশে এসে সেই অভিজ্ঞতা পাই। সবাই মিলে একসঙ্গে কোরবানি দেওয়া, উৎসবের আমেজ, মানুষের ব্যস্ততা—এসব তখন কাছ থেকে দেখেছি। 

কিছুদিন আগে আমার এক খালাত ভাইয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছিল। তখন মনে হলো, কোরবানি শুধু পশু এনে জবাই করা, মাংস ভাগাভাগি করা বা খাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কয়েকদিনে পশুটার সঙ্গে একটা মায়া বা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাওয়া। আর যখন সেই পশুটাকে কোরবানি দেওয়া হয়, তখন যে খারাপ লাগা বা মায়ার অনুভূতি কাজ করে, সেটাও আসলে কোরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাইজিংবিডি: কোরবানির পশুর সঙ্গে মায়ার বন্ধনের কথা বললেন, আপনার সঙ্গে এমনটা হয়েছে?

কোনাল: অলমোস্ট প্রতি বছরই এমন হয়। তবে গত বছর একটু ভিন্ন ছিল। সাধারণত, আমরা চেষ্টা করি অন্তত তিনদিন আগে পশু কিনে এনে রাখার। কারণ ঢাকার অ্যাপার্টমেন্টে অনেক আগে থেকে পশু রাখা আসলে সহজ নয়। তারপরও যতটা সম্ভব চেষ্টা করি। সময়-অসময়ে নিচে গিয়ে খোঁজ নেওয়া, গরম লাগছে কিনা, ঠিকমতো খাবার ও পানি পাচ্ছে কিনা, কী করছে—এসব দেখার একটা কৌতূহল কাজ করে। মাঝেমধ্যে নিচে গিয়ে একটু দেখে আসা, মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করা—যতটুকু সম্ভব, সেই চেষ্টা সবসময়ই থাকে।

জীবনে ধীরে ধীরে একটা বিষয় শিখেছি—এটা শুধু পশুর ক্ষেত্রে নয়। বাবার মৃত্যু, দাদা-দাদির মৃত্যু, যে কোনো মানুষ, সৃষ্টি বা কোনো কিছুর সঙ্গে যখন গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন তার বিচ্ছেদে কষ্ট তত বেশি। এই কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে। তবে সময়ের সঙ্গে কষ্টের রং বদলায়, কষ্ট থেকে যায়। কোরবানির ক্ষেত্রেও বিষয়টা আমার কাছে তেমনই।

রাইজিংবিডি: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের অনুভূতিও বদলে যায়। এই পরিবর্তনের অনুভূতি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

কোনাল: পার্থক্যটা আমি সেভাবে অনুভব করি না। ছোটবেলায় যেভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতাম, এখনো ঠিক সেভাবেই করি। শুধু একটা বড় শূন্যতা অনুভব করি—আমার বাবা নেই, দাদা-দাদি নেই, নানা-নানি নেই। এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুভব করি। তাছাড়া ঈদ আমার কাছে এখনো আগের মতোই আছে।

রাইজিংবিডি: ঈদ সালামির স্মৃতি নিশ্চয়ই আছে? 

কোনাল: আগে ঈদে অনেক সালামি পেতাম, এখন উল্টো ঘটে। আমি এখন ছোটদের সালামি দেই। তবে সালামি নেওয়ার মতো দিতেও ভালো লাগে। আমি দুই বংশেরই বড়—দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি দুই দিকেরই। তাই ছোটবেলা থেকে সবার কাছে অনেক আদর পেয়েছি, কখনো কম পাইনি। আমার চাচা-ফুফু, খালা-মামা—সবার কাছেই আমার অবস্থান একটু আলাদা ছিল। সবসময়ই বেশি আদর আর ভালোবাসা পেয়েছি, সালামিও পেয়েছি। আমিও একইভাবে আমার ভাই-বোনদের সঙ্গে আচরণ করি। কাউকে বেশি বা কম দেই না, সবসময় সমান রাখার চেষ্টা করি। তবে যারা বয়সে বড়, তারা একটু বেশি পায়, আর যারা ছোট, তারা একটু কম—এটাই আমাদের নিয়ম।

রাইজিংবিডি: ঈদে ভক্তদের সঙ্গে মজার কোনো অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

কোনাল: প্রতি ঈদেই কম-বেশি এক বা একাধিক গান রিলিজ হয়। ভক্তরাও সেগুলো নিয়ে রিলস, টিকটক করেন। কেউ নতুন জামা নিয়ে করেন, কেউ গরুর সঙ্গে করেন, কেউ বাইরে বের হওয়ার সময় করেন—দেখতে ভালোই লাগে। আমি এগুলোর জন্য অপেক্ষা করি। আমার কাছে মনে হয়, ভক্ত কিংবা ভালোবাসার মানুষ একটু দূরে থাকলেই ভালো। তবে এর মধ্যেও এমন হয়েছে, অনেক ফ্যান আমার সঙ্গে দেখা করতে চলে এসেছেন। কেউ রংপুর থেকে, কেউ টাঙ্গাইল থেকে এসেছেন। তখন বাধ্য হয়েই দেখা করতে হয়েছে। ওরা আমার মায়ের সঙ্গে ফেসবুকে যুক্ত হয়েছিল। কীভাবে যেন বাসার ঠিকানাও পেয়ে গিয়েছিল—সম্ভবত আম্মাই না বুঝে দিয়ে দিয়েছেন। কারণ ওরা তো সরাসরি আমাকে রিচ করতে পারত না। আমি বিভিন্ন সময় পোস্টে আম্মুকে ট্যাগ করতাম, সেখান থেকেই হয়তো যোগাযোগ হতো। আসলে আম্মু এসব খুব একটা বুঝতেন না। কেউ জানতে চাইলে বলে দিতেন, তারপর মানুষজন বাসায় চলে আসত। তবে এখন বিষয়টা বন্ধ হয়েছে। আমি আম্মুকে বুঝিয়ে বলেছি।

রাইজিংবিডি: নিজের গাওয়া কোন গানটি বারবার শুনতে ইচ্ছা করে?

কোনাল: আমি আমার সব গানই শুনি। কোন গানটি বেশি ভালো লাগে, তা বলা কঠিন। বিশেষ করে নাটকের কিছু গান আছে, যেগুলো খুব সুন্দর হলেও প্রচারের অভাবে সেভাবে ছড়ায় না। অন্যদিকে, ফিল্মের গানগুলো বেশি ছড়িয়ে যায়, কারণ সেগুলোর মার্কেটিং অনেক বেশি হয়। ‘মেঘের নৌকা’ গানটা আমার খুব ভালো লাগে। ‘প্রহেলিকা’ সিনেমার গান এটি। 

রাইজিংবিডি: অনেক অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে আপনার কাজের সুযোগ হয়েছে। কার কাছ থেকে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন?

কোনাল: কবরী আপা আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর একটি চলচ্চিত্রে কাজ করার কথা ছিল, যেখানে সাবিনা ইয়াসমীন ম্যাডাম সংগীত পরিচালক হিসেবে ছিলেন। সেই চলচ্চিত্রের একটি গান আমি গেয়েছিলাম। গানের মাঝে একটি হাসির অংশ ছিল, আমি হাসিটা দিচ্ছিলাম। কিন্তু সেটা কবরী আপার মনমতো হচ্ছিল না। তখন তিনি নিজে স্টুডিওতে এসে তার নিজের হাসি রেকর্ড করে আমাকে বলেছিলেন, ‘এই দেখো, এভাবে হাসবে।’ শুধু এটুকুই না, গানের আগে-পরে কথা বলে, আদর দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিতেন। তাকে আমি অনেক মিস করি।

রাইজিংবিডি: পাঁচ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

কোনাল: নিজেকে এমন জায়গায় দেখতে চাই, শুধু গান গাওয়া নয়, গান ঘিরে নানা ধরনের কাজ করছি। পাশাপাশি শিশুবিকাশ নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তাই গান ও শিশুবিকাশ—দুটি বিষয় একসঙ্গে যুক্ত করে কাজ করতে চাই। আমি চাই, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য এমন কিছু কাজ করতে, যাতে তারা নিরাপদে ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে। আমার কাছে বিষয়টি শুধু চ্যারিটি নয়, এটা মানবিক দায়িত্ব, সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব। আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, ঈশ্বর আপনাকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন—আপনি যাই বিশ্বাস করুন না কেন, একজন মানুষ হিসেবে আপনার দায়িত্ব রয়েছে অন্য মানুষের প্রতি, পশুপাখির প্রতি, গাছপালার প্রতি, পুরো সৃষ্টির প্রতিই। আমার মনে হয়, যে মানুষ যেভাবে পারে, যতটুকু এই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেন, সেই মানুষই উত্তম। আমিও সেই দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করতে চাই।

ঢাকা/শান্ত//

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়