RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০ ||  আশ্বিন ১৬ ১৪২৭ ||  ১৩ সফর ১৪৪২

যতীনের হারমোনিয়ামের ১০৯ বছর!

জাহিদ সাদেক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:১৮, ২১ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
যতীনের  হারমোনিয়ামের ১০৯ বছর!

যারা সংগীত চর্চা করেন তাদের কাছে নামটি পরিচিত। যারা রাজধানীর ঐতিহ্যের খোঁজ রাখেন তারাও কম-বেশি নামটি জানেন। যাদের স্মৃতিশক্তি কম, তারাও নামটি শুনে বিস্মিত কণ্ঠে বলেন- ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে! এই শহরের ‘যতীন এন্ড কোং’ তেমনই একটি নাম।

পুরোনো ঢাকার কোর্ট কাচারী পেরিয়ে শাঁখারী বাজারের বড় গলি দিয়ে যেতেই ১৪ নম্বর দোকানটি এর বর্তমান ঠিকানা। দোকানের মাথার ওপর পুরোনো সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা স্থাপিত ১৯১০ ইং। দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কেরানীগঞ্জের বাঘৈরে জন্ম নেয়া যতীন্দ্র মোহন মন্ডল। ১৯৭০ সালে তার মৃত্যুর পর এখন পরিচালনা করছেন ছেলে সুনীল কুমার মন্ডল। তাকে সহযোগিতা করছেন নাতি সরজিৎ মন্ডল। অর্থাৎ বংশ পরম্পরায় এটি তাদের পারিবারিক ব্যবসা।

‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ গ্রন্থে মুনতাসীর মামুনের বর্ণনায় জানা যায়, ‘যতীন্দ্র মোহনের জন্ম ১৮৮০ সালে। প্রাইমারী স্কুল শেষ না করতেই বসত বাড়ি চলে যায় বুড়িগঙ্গায়। অভিভাবকহীন কিশোর জীবিকার সন্ধানে ঢুকে পড়েন যাত্রাদলে। যাত্রাদলের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হন। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে হারমোনিয়াম। উনিশ শতকের শুরুতেই ঢাকা বিখ্যাত ছিল বাদ্যযন্ত্রের জন্য। সেসময় পাটুয়াটুলী, শাঁখারীবাজার, ইসলামপুর, তাঁতীবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় গড়ে ওঠে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের দোকান। ঢাকার আমপট্টিতে ছিল হারমোনিয়ামের দোকান- দাস অ্যান্ড কোং। যতীন্দ্র মোহন ঢাকায় এলেন হারমোনিয়াম সম্পর্কে জানতে। চাকরি করতে চাইলেন সে দোকানে। মালিক রাজি হলেন না। যতীন্দ্র মোহন বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুদিন দোকানে হারমোনিয়াম নির্মাণ দেখলেন। এরপর পিসির কাছ থেকে ১২ টাকা ধার নিয়ে নিজেই একটি হারমোনিয়াম তৈরি করলেন। বিক্রি করলেন ২৫ টাকায়। সেই মুনাফা দিয়ে ১৯১০ সালে আশেক লেনে দোকান খুলে বসলেন তিনি। নাম দিলেন ‘যতীন এন্ড কোং’। এভাবে বেশকিছু হারমোনিয়াম তৈরি করে বিক্রি করলেন। তারপর মুনাফা দিয়ে ১৯২০ সালে দোকানটি ইসলামপুরে, এরপর পাটুয়াটুলীতে স্থানান্তর করেন। পাটুয়াটুলীতে দীর্ঘ ৭০-৮০ বছর ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দোকানটি পুরো ভবনসহ ধ্বংস হয়ে যায়। হারিয়ে যায় দুর্লভ সব বাদ্যযন্ত্র। পরে তার ছেলে সুনীল কুমার মন্ডল দোকানটি ১৪ নম্বর শাঁখারীবাজারে নতুনভাবে করেন।’

যতীন এন্ড কোং নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আজিম বকশ বলেন, ‘আমি নিজেও যতীনদাকে হারমোনিয়াম বানাতে দেখেছি। স্কুলে পড়ার সময় পাটুয়াটুলীতে গেলে তার সঙ্গে কথাও হতো আমাদের। পরিশ্রমী আর আমুদে লোক ছিলেন যতীনদা।’

‘ঢাকা পচাশ্‌ বারস্‌ পহেলে’ গ্রন্থে হাকিম হাবিবুর রহমান লিখেছেন: ‘এমন এক সময় ছিল যখন যতীন বাবুর দোকানে নিয়মিত শনি ও মঙ্গলবার গানের জলসার আয়োজন হতো। জলসায় ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খাঁ, কাজী মোতাহের হোসেন, প্রসন্ন বণিক, ভগবান চন্দ, সেতারী থেকে শুরু করে সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ যোগ দিতেন। সমঝদার সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে যতীন বাবু ঢাকার নবাববাড়ি, রূপলাল হাউস, গৌরীপুর, মুক্তাগাছার জমিদার বাড়ি, ত্রিপুরার রাজদরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। সঙ্গীত জগতের এ নক্ষত্রের স্মৃতিবিজড়িত ‘যতীন অ্যান্ড কোং’ শাঁখারীবাজারে তার স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।’

সরেজমিনে দেখা যায়, যতীন এন্ড কোং-এ হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে আছে তবলা, গিটার, দোতারা, একতারা, ঢোলক, নাল, মেন্ডলীন, সারিন্দা, ভায়লীন, জিপসী, খোল, এস্রাজ, তানপুরা, সেতার, বেহালা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, ঢুমকো, ঢোল, জিপসী, খোল, মন্দিরা, কঙ্গো- সবই এখানে পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় হারমোনিয়াম ও তবলা। এখানে ব্যবস্থাপক হিসেবে আছেন নবকুমার সাহা। কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘ব্রিটিশ আমলে গ্রামোফোন নামে কলের গান আবিষ্কার হলে হিজ মাস্টার ভয়েজ-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা ‘যতীন ফোন’ নামে কলের গান বাজারে ছেড়েছিলাম।’ তিনি আরো জানালেন, বর্তমানে এ দোকানে তৈরি হারমোনিয়াম মান অনুযায়ী ৭ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। তবে ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকার হারমোনিয়ামের চাহিদা বেশি। সবচেয়ে বেশি দামি হলো বক্স হারমোনিয়ামের- দাম প্রায় ২৩ হাজার টাকা।

এখন ব্যবসা কেমন জানতে চাইলে নবকুমার মন্ডল বলেন, ‘জুন- জুলাই মাসে হারমোনিয়ামের বিক্রি ভালো হয়। এর কারণ সংগীত বিদ্যালয়গুলোতে এ সময় ভর্তি শুরু হয়। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময় তেমন হয় না। তবে বছরের যে কোনো সময় অন্যান্য যন্ত্রপাতির বিক্রি ভালো নয়। আবার বর্ষা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে। সব মিলিয়ে এখন আগের চেয়ে বেচা-বিক্রি কম।’

যে বাদ্যযন্ত্রগুলো বিক্রির জন্য রয়েছে প্রায় সবই নিজস্ব কারিগর দিয়ে তৈরি। ক্রেতাদের অধিকাংশ আসেন মফস্বল থেকে। আবার অনেক সময় বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান থেকে টেন্ডার দিয়েও কাজ করিয়ে নেয়া হয়। নবকুমার মন্ডল বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে ইতালি, ভারত, জার্মানি, ফ্রান্স থেকেও প্রবাসী বাঙালিরা হারমোনিয়াম কিনে নিয়ে যান। আগে পাকিস্তান থেকে কাওয়ালী গানের দল যারা চালাত তারাও আসত। সবই আমাদের নিজস্ব, তবে গিটার ভারত থেকে নিয়ে আসি। কেউ বিদেশী যন্ত্র অর্ডার দিলে এনে দেই।’

দোকানের পেছনেই বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারখানা। কাজ করছিলেন ছয়জন কারিগর। প্রত্যেকেই হারমোনিয়াম বানান এবং সবাই প্রায় ৩০ বছর এই কাজ করছেন। কারিগর লক্ষ্মণ সরকার বলেন, ‘একটি হারমোনিয়াম বানাতে প্রায় ৮ দিনের মতো লাগে। একমাসে সর্বোচ্চ ৪টি হারমোনিয়াম বানানো যায়। একটি বানালে সাড়ে তিন হাজার টাকা মজুরি পাই, চারজনের সংসার চালাতে কষ্ট হয়।’

সুনীল কুমার মন্ডল বলেন, ‘দক্ষ কারিগর তেমন পাওয়া যায় না। যারা দক্ষ তারা নিজেরাই বানিয়ে বিক্রি করে। এজন্য বাইরে থেকে বানিয়ে আনতে হয়। তিন পুরুষ ধরে এই ব্যবসা করছি। তবে এখন দেখছি, নানা অস্থিরতার কারণে দেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আগের চেয়ে কমে গেছে। শুদ্ধ সংগীত চর্চা করা লোকের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। সে কারণে বাদ্যযন্ত্র দিয়ে গান শেখার প্রবণতাও অনেক কমে গেছে।’ তিনি আক্ষেপ করে আরো বলেন, ‘সংগীত হচ্ছে আত্মার যোগ। গুরুমুখী বিদ্যা। কণ্ঠের কথা বলি, আর বাদ্যযন্ত্র চর্চার কথাই বলি- বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সঙ্গীতচর্চা অসম্ভব। তবে এখন কালের বিবর্তনে এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে যেন হারিয়ে না যায় অতীতের অনেক বাদ্যযন্ত্র- এটাই আমার চাওয়া।’



ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়