ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৯ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৬ ১৪৩২ || ২৯ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

তেলের দাম কি ২০০ ডলার ছাড়াবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৯, ১৯ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৩:২৮, ১৯ মার্চ ২০২৬
তেলের দাম কি ২০০ ডলার ছাড়াবে?

প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতির জন্য বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানে আক্রমণ করার পরপরই বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আরো পড়ুন:

এখন, সংঘাত শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই বাজার পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন, তেলের দাম ১৫০ বা এমনকি ২০০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আল-জাজিরা। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৯ মার্চ বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল এবং ১৩ মার্চের পর থেকে এটি ১০০ ডলারের নিচে নামেনি।

গতকাল বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের ‘সাউথ পার্স’ গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলার ফলে এদিন অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেলে ১০৮ ডলারের বেশি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা একমত যে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি যদি আগামী সপ্তাহগুলোতে কার্যত বন্ধ থাকে, তাহলে দাম আরও অনেক উপরে ওঠার সুযোগ রয়েছে। এখন একমাত্র বিতর্কের বিষয় হলো, এই দাম ঠিক কতটা বাড়বে।

ভার্জিনিয়াভিত্তিক ‘ভান্ডা ইনসাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি আল-জাজিরাকে বলেন, “ওমান ও দুবাইয়ের মতো মধ্যপ্রাচ্যের ক্রুড তেলের দাম ইতিমধ্যে ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।” তিনি আরো বলেন, “তেলের দাম এখান থেকে আর কতটা বাড়বে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি আর কতদিন বন্ধ থাকে তার ওপর।”

সংঘাতের শুরুতেই ইরান প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করার পর এবং সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী যেকোনো জাহাজে হামলার হুমকি দেওয়ার পর জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণালিটি পুনরায় খোলার জন্য একটি নৌ-বহর গঠনে আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে দেশগুলো নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করার চেষ্টা করছে। গত কয়েক দিনে মাত্র অল্প কিছু জাহাজ- যার বেশিরভাগই ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক এবং চীনের পতাকাবাহী- সেখান দিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দেশগুলো তাদের জরুরি মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, এই জলপথ দিয়ে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঘাটতি পূরণ করতে তা যথেষ্ট নয়।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওসিবিসি গ্রুপ রিসার্চের অনুমান অনুযায়ী, জরুরি মজুদের হিসাব ধরলেও বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

উড ম্যাকেঞ্জি বিশ্লেষকরা গত সপ্তাহে বলেন, ব্রেন্ট ক্রুড শিগগির ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে ২০০ ডলার হওয়া ‘অসম্ভব নয়’। এমনকি ইরানও ২০০ ডলারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে গত সপ্তাহে এক সামরিক মুখপাত্রের মাধ্যমে বিশ্বকে এই দাম বৃদ্ধির জন্য ‘প্রস্তুত থাকার’ সতর্কবার্তা দিয়েছে।

শিল্প প্রকাশনা ‘রিগজোন’-এর প্রেসিডেন্ট চ্যাড নরভিল আল-জাজিরাকে বলেন, “যদি বাজার বিশ্বাস করে যে সরবরাহ চাহিদাকে পূরণ করতে পারবে, তাহলে কৌশলগত মজুদ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে তেলের দাম ১০০ ডলারের অনেক উপরে, এমনকি ২০০ ডলারের কাছাকাছি যাওয়াও স্বাভাবিক।”

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৫০ ডলার বা তার বেশি হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুমান করছে যে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.১৫ শতাংশ হ্রাস পায়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আদি ইমসিরোভিচ আল-জাজিরাকে বলেন, প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার তেল ‘বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে’। তিনি এই দামের সম্ভাবনাকে ‘সম্পূর্ণভাবে সম্ভব’ বলে বর্ণনা করেন। তার মতে, এটি মুদ্রাস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং কেবল জ্বালানি নয়, সার ও প্লাস্টিকের মতো কাঁচামালেরও সংকট তৈরি করবে।

তবে লন্ডনভিত্তিক ‘মারেক্স’-এর বিশ্লেষক সাশা ফস কিছুটা আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি ২০০ ডলারের সম্ভাবনাকে ‘বেশ অদ্ভুত’ বা অবাস্তব বলে মনে করেন। ফসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং গায়ানার মতো দেশগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর মতো বিকল্প পথগুলো পরিস্থিতির ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত তেলের দাম হরমুজ প্রণালি খোলার ওপর নির্ভর করলেও, এটি চাহিদা ও সরবরাহের চিরাচরিত নিয়মের ওপরও নির্ভরশীল। সাধারণত দাম একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে ক্রেতারা খরচ কমিয়ে দেয়, যাকে বলা হয় ‘চাহিদা ধ্বংস’।

র‍্যাপিদান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি বলেন, ‘কেউ জানে না সেই সীমাটি ঠিক কত, তবে এটি সম্ভবত আগের সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারের উপরে হতে পারে।”

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়