ঢাকা     শনিবার   ২১ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৮ ১৪৩২ || ২ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:২৯, ২১ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২২:২৩, ২১ মার্চ ২০২৬
ইরান যুদ্ধ নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ট্রাম্প

হোয়াইট হাউসে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে প্রায় দৈনিক ব্রিফিংয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানোর মতো বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করেছেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এই যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্ভবত তার জন্য সবচেয়ে কঠিন।

আরো পড়ুন:

ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের অনেক মিত্রের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েনের অর্থ হবে যুদ্ধের প্রতি তাদের প্রকাশ্য সমর্থনের দ্রুত সমাপ্তি। এছাড়া হোয়াইট হাউস শিগগিরই যে শত শত বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল চাইবে, তা সরবরাহ করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

কিন্তু ট্রাম্পের জন্য, তার উদ্দেশ্যগুলো সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে এবং যুদ্ধের পরিণতি প্রশমিত করতে মার্কিন সেনা পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে, যা তার ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট চলতি সপ্তাহে বিষয়টি একেবারে বাতিল না করলেও এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। যদি পাঠাতামও, আমি অবশ্যই আপনাদের বলতাম না।”

ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করায় এই সংঘাতের সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে সে সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়ার জন্য চাপ বাড়ছে। এর অর্থনৈতিক পরিণতির কারণে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কঠিন রাজনৈতিক পথের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাম্পের অনেক রিপাবলিকান মিত্র তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজে বের করার জন্য অনুরোধ করছেন।

ঠিক কীভাবে তা ঘটবে, তা এখনো অনেকাংশেই অজানা। শুক্রবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প তার যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে সংশয়গুলোকে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। ট্রাম্প বলছিলেন, তিনি শিগগিরই যুদ্ধ ‘শেষ করার কথা বিবেচনা করবেন।’ তবে তিনি যখন এই বক্তব্য রাখছিলেন, তখন নতুন মেরিন ইউনিটগুলো ওই অঞ্চলের দিকে রওনা হচ্ছিল।

ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টারা প্রকাশ্যে যে সময়সূচি দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী চার সপ্তাহের সময়সীমা — যা আগামী শনিবার শেষ হবে — এই সামরিক অভিযানের পরিকল্পিত সমাপ্তির সুযোগ তৈরি করবে। ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘নির্ধারিত সময়ের আগেই’ সফল বলে ঘোষণা করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটি যে কেউ যা ভাবছে তার চেয়েও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে এক সপ্তাহ দূরে থেকেও যুদ্ধের শুরুতে তিনি যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন, তা এখনো বাস্তবায়নের পথেই রয়েছে। এর সমান্তরালে যুদ্ধের পরবর্তী প্রভাবগুলো ক্রমাগত বেড়েই চলেছে এবং এর মূল্য — ডলার ও জীবন উভয় দিক থেকেই — বেড়েই চলেছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ইরানের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং এই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে যে, ইরানের ওপর হামলা চালানোর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি ভেবেচিন্তে নেওয়া হয়নি।

মার্কিন কর্মকর্তারা সম্ভাব্য মাসব্যাপী এই অবরোধ এড়ানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া একটি সমস্যা যার কোনো সুস্পষ্ট সমাধান নেই এবং এটি অন্তত আংশিকভাবে নির্ভর করছে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে বাধ্য করতে ট্রাম্প কতটা কঠোর হতে ইচ্ছুক তার ওপর।

যদিও ট্রাম্প ইরানে সেনা পাঠানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, তবুও প্রশাসন সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

আরো হাজার হাজার মার্কিন মেরিন ও নাবিক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হচ্ছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপের মোতায়েনের পথ পরিবর্তন করে ত্বরান্বিত করা হয়েছে এবং এখন তাদের মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার কথা রয়েছে।

কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে যেসব অভিযানের কথা বিবেচনা করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে: ইরানের খার্গ দ্বীপ দখল করা অথবা দ্বীপটির তেল পরিকাঠামো কার্যকরভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এই দ্বীপটি ইরানের জন্য একটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন এবং দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটিতে থাকা সামরিক পরিকাঠামোতে হামলা চালিয়ে আসছে, যা প্রশাসনের অভ্যন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় এবং যা সম্ভবত ইরানকে প্রণালীটি পুনরায় খোলার বিষয়ে সম্মত হতে বাধ্য করতে পারে।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে, খার্গ দ্বীপ দখল করা গেলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর ‘সম্পূর্ণ দেউলিয়া’ হয়ে যাবে, বলেছেন একজন কর্মকর্তা এবং এর ফলে সম্ভবত যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটতে পারে। কিন্তু প্রশাসনের ভেতরের অনেকেই এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে সন্দিহান, বিশেষ করে যেহেতু এটি সম্পন্ন করতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থলসেনা প্রয়োজন হবে।

অপরদিকে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করার জন্য একটি পৃথক স্থল অভিযান সম্ভবত আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ক্যানিস্টারগুলো, যা তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ব্যবহার করতে পারে, গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলার পর ফেলে রাখা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে মনে করা হয়।

মাটির নিচে পুঁতে রাখা ইউরেনিয়াম উদ্ধারের যেকোনো অভিযান অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। 

চলিতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরকালে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, এই পদার্থের ‘ব্যারেল ও সিলিন্ডারগুলো’ ‘তাত্ত্বিকভাবে’ সরানো যেতে পারে। তবে, সামরিক অভিযানের সময় ‘সরাসরি আঘাত লাগলে’ দূষণের ঝুঁকি থাকবে।

অনেক রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের স্থলসেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আছেন।

উইসকনসিনের রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডেরিক ভ্যান অর্ডেন প্রশাসনকে স্থলভাগে কোনো সৈন্য পাঠানোর বিরুদ্ধে বিশেষভাবে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, “আমি এটা দেখতে চাই না।”

টেনেসির প্রতিনিধি টিম বারচেট বলেছেন, “আমার মনে হয়, আমাদের যত দ্রুত সম্ভব একটি প্রস্থানের কৌশল খুঁজে বের করা দরকার। আমি কোনোভাবেই আমেরিকানদের সেখানে পাঠাতে চাই না।”

রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক ফ্লড বলেন, “সবাই চায় এটা শেষ হোক।”

সবমিলিয়ে ঘরে-বাইরে চাপের মুখে আছেন ট্রাম্প। ইরানে স্থল অভিযান শুরু করতে চাইলেও তার জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল হয়ে উঠছে। তাই তিনি কখনো বলছেন, সেনা পাঠাবেন না, আবার কখনো ইসরায়েলের চাপের মুখে বলছেন সেনা পাঠাবেন। যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে কঠিন এই প্রশ্নে ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেন তা হয়তো চলতি সপ্তাহেই জানা যাবে।

ঢাকা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়