শিশু কেন নিজেকে গুটিয়ে রাখতে চায়
ঈদের ছুটিতে বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছেন কিংবা আপনার বাসায় অনেক অতিথি এসেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আপনার শিশুটি কারও সঙ্গে মিশতে চাইছে না। সে নিজেকে গুটিয়ে রাখছে অথবা তার নিজের কী প্রয়োজন সে বিষয়ে কোনো কথা বলতে পারছে না। পরিস্থিতি যদি এই হয়, তাহলে বুঝতে হবে শিশুর বাড়তি স্নেহ দরকার। কেননা সে হয়তো ‘এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ সমস্যায় ভুগছে।
সন্তান লালন-পালন সম্ভবত মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। বিশেষ করে যদি বাবা-মা নিজেরাই অতীতের কোনো ট্রমা, আসক্তি বা মানসিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে করতে সন্তান বড় করেন, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সময় বাবা-মা সন্তানের পাশে সবসময় একইভাবে থাকতে পারেন না। এর ফলে শিশুর অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং আবেগ প্রকাশের ধরনে প্রভাব পড়তে পারে। তখন শিশুর মধ্যে এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে বা শিশু নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারে যা দীর্ঘমেয়াদে নানা প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্টের লক্ষণ, সম্ভাব্য কারণ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রতিরোধের বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো—
অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল কী?
অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল হলো মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অন্যদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার ধরণ। সাধারণত শৈশবে প্রধান যত্নদাতাদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি হয় এবং পরবর্তী জীবনের সম্পর্কগুলোতেও প্রভাব ফেলে। মোট চার ধরনের অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল রয়েছে—
**নিরাপদ সংযোগ, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ধরণ।
**এড়িয়ে চলা সংযোগ।
**উদ্বিগ্ন সংযোগ।
**অসংগঠিত সংযোগ।
এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্ট কী?
এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্টে সাধারণত মানুষ খুব বেশি স্বাধীন থাকতে চায়, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে বা নিজের আবেগ প্রকাশ করতে অসুবিধা বোধ করে। এর ফলে ভবিষ্যতে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রেমের সম্পর্ক এমনকি কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কসহ সব ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় বাবা-মা অজান্তেই শিশুর মধ্যে এই ধরনের অ্যাটাচমেন্ট তৈরি করতে পারেন। যখন শিশুর যত্নদাতা আবেগগতভাবে দূরে থাকেন, অনিয়মিতভাবে যত্ন নেন বা সন্তানের অনুভূতির প্রতি সাড়া দেন না, তখন এ সমস্যা তৈরি হতে পারে।
যেসব শিশু ছোটবেলায় নিজেকে অবহেলিত বা অযত্নে থাকা মনে করে, তারা বড় হয়ে অন্যদের ওপর সহজে ভরসা করতে পারে না। গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের প্রায় ২৩ শতাংশের মধ্যে এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্ট দেখা যেতে পারে।
শিশুদের মধ্যে এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্ট কেন তৈরি হয়?
এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি কোনো না কোনো ধরনের ট্রমা বা আবেগগত অবহেলার ফল। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাবা-মা সন্তানের আবেগগত প্রয়োজনের প্রতি সাড়া না দেওয়া, যথেষ্ট স্নেহ ও সমর্থন না দেওয়া, অত্যধিক সমালোচনামূলক আচরণ, শিশুর কান্না বা কষ্টকে উপেক্ষা করা, শিশুর সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়া, অবহেলা বা অনিশ্চিত আচরণ, পারিবারিক সমস্যা (যেমন: অসুস্থতা বা বিবাহবিচ্ছেদ) এবং জেনেটিক বা বংশগত কারণ।
অনেক সময় বাবা-মা নিজেরাই ট্রমা, মানসিক অসুস্থতা বা আসক্তির কারণে সন্তানের প্রতি যথাযথ সাড়া দিতে পারেন না। এ ধরনের পরিবারে শিশুদের প্রায়ই বলা হয়—“এটা নিয়ে এত নাটক করো না। ভুলে যাও। নিজেই সামলে নাও।” এর ফলে শিশুর মনে ধারণা তৈরি হয় যে, নিজের সমস্যার সমাধান তাকে একাই করতে হবে।
আপনার সন্তানের মধ্যে এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্টের লক্ষণ
নিচে কয়েকটি লক্ষণ দেওয়া হলো। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো সবসময় এভয়ড্যান্ট অ্যাটাচমেন্টের লক্ষণ নাও হতে পারে, কখনো কখনো এগুলো স্ট্রেস, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে—
**বাবা-মা বা বড়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভাব।
**শিশু বাবা-মার সঙ্গে কম কথা বলে, আবেগ ভাগ করে না বা শারীরিক স্নেহ (যেমন: আলিঙ্গন) এড়িয়ে চলে।
**অন্যদের প্রতি অবিশ্বাস।
**বন্ধু বা অন্য মানুষের প্রতি সহজে বিশ্বাস তৈরি হয় না। অনেক সময় তারা আক্রমণাত্মক বা অসামাজিক আচরণ করতে পারে।
**সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা।
**নিজের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা করে। ছোট সিদ্ধান্তও নিতে পারে না এবং প্রায়ই বলে—“আমি জানি না।”
**স্নেহ প্রকাশে সমস্যা।
**শিশু অন্যদের থেকে দূরে থাকতে চায় এবং স্পর্শ বা আদর পছন্দ করে না। অনেক সময় মনে হয় যেন তার চারপাশে একটি দেয়াল তৈরি করা আছে।
**আবেগগতভাবে দূরত্ব রাখা।
**বাবা-মা বা অন্য কেউ কাছে আসতে চাইলে শিশু দূরে সরে যায় বা উপেক্ষা করে।
**সাহায্য চাইতে অসুবিধা।
**সমস্যা হলেও তারা কাউকে বলতে চায় না। নিজের কষ্ট নিজেই সহ্য করতে চেষ্টা করে।
**নিজের চেয়ে অন্যদের চাহিদা বেশি গুরুত্ব দেওয়া।
**এ ধরনের শিশুরা প্রায়ই বড়দের আবেগ বুঝতে চেষ্টা করে এবং তাদের খুশি রাখার জন্য নিজের চাহিদা চাপা দেয়।
সূত্র: প্যারেন্টস ডটকম অবলম্বনে
ঢাকা/লিপি/শান্ত