অনলাইনে হয়রানি বন্ধে ‘স্ক্রিনশট’ কীভাবে হাতিয়ার হতে পারে
লাইফস্টাইল ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
ছবি: প্রতীকী
কিছুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। নিজের প্রোফাইলে এসে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হয়রানি করা ১০ জন ব্যক্তির কর্মস্থল খুঁজে বের করে তাদের প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে স্ক্রিনশটসহ ই-মেইল পাঠান রিমানা আক্তার। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি জবাব পান—বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলে জানানো হয়।
রিমানা আক্তারের ভাষায়,“আমাকে যখন কেউ ফেসবুকে খারাপ কথা বলে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় বাজে মন্তব্য করে, আমি সঙ্গে সঙ্গে সেটার স্ক্রিনশট নিয়ে রাখি—যদি কখনো এটা ব্যবহার করতে পারি। এটা আমি সব সময়ই করি। যারা এসব মন্তব্য করে, তারা জানেই না যে তাদের এই সাইবার ফুটপ্রিন্ট পরে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। আমার আগেও অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ার বক্তব্য নিয়ে অভিযোগ করেছে, কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।”
তার পোস্টে ইতিবাচক সাড়াও এসেছে অনেক। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ঘেঁটে লক করা প্রোফাইলের পরিচয়ও বের করেন তিনি। তবে তার ভাষ্য, উদ্দেশ্য কারও ক্ষতি করা নয়; বরং অনলাইনে হয়রানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাকে স্বাভাবিক করে তোলা।
রিমানা আক্তার বলেন, “সাইবার ক্রাইমে যদি আমি পুরো প্রোটোকল মেনে অভিযোগ করি, তাহলে বট আইডি বা ফেইক আইডিও ট্র্যাক করা সম্ভব। আমরা জানি, অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে অনেকে বের হয়ে যায় বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যথেষ্ট সক্রিয় থাকে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি নিজে আইনগত সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা সক্রিয়?”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে নারীরা বেশি হেনস্তার শিকার হলেও পুরুষরা যে একেবারেই হয় না, তা নয়। আবার নারীরাও যে কখনো হয়রানি করেন না, সেটাও বলা যাবে না। ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন ভাষায় মন্তব্য, বিদ্বেষ ছড়ানো, হুমকি বা ভয় দেখানো—এসবই অনলাইন বুলিং বা হয়রানির মধ্যে পড়ে। আর এসবের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
জাতিসংঘের একটি সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় ও পরবর্তী সময়ে অনলাইনে হয়রানি বেড়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ৬৬ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে হয়রানি বা হুমকির শিকার হয়েছেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন,“কেবল মতের অমিল হলেই অনেকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তাই বলে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা আইনের চোখে অপরাধ। অনেকেই এটা বুঝতে চান না। তারা মনে করেন, অন্যের স্বাধীনতা হরণ করাও যেন তাদের অধিকার। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা যেতে পারে। এরপর পুলিশ সেই অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিকার পেতে হলে প্রমাণ সংরক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে—
- স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করতে হবে
- পোস্ট বা কমেন্টের লিংক রেখে দিতে হবে
- প্রমাণ মুছে ফেলা যাবে না
- প্রয়োজনে দ্রুত থানায় জিডি করতে হবে
তবে বাস্তবতা হলো, যৌন হয়রানির মতো গুরুতর ঘটনার শিকার হলেও ভয়, সামাজিক চাপ বা ঝামেলার আশঙ্কায় অনেকেই কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না।
সাইবার নিরাপত্তা সংগঠন ‘সাইবার টিনস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সাদাত রহমান বলেন, “এখনো মানুষকে থানায় যেতে হয়, হাতে লিখতে হয়, প্রিন্ট করতে হয়। অথচ সাইবার বুলিং নিয়ে কেন্দ্রীয় অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা থাকা উচিত। সেখানে পুলিশ, বিটিআরসি, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং—সবকিছু একসঙ্গে যুক্ত থাকবে। সরকার শুধু সচেতনতার কথা বললেই হবে না, ভুক্তভোগীরা যেন সহজে সহায়তা পান, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনলাইনে হয়রানিকে ‘স্বাভাবিক’ ভেবে চুপ না থেকে প্রমাণ সংরক্ষণ, রিপোর্ট করা এবং প্রয়োজন হলে আইনগত সহায়তা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
সূত্র: বিবিসি
ঢাকা/জান্নাত/লিপি