ঢাকা     বুধবার   ১৭ আগস্ট ২০২২ ||  ভাদ্র ২ ১৪২৯ ||  ১৮ মহরম ১৪৪৪

অতিবৃষ্টি‌তে নগরবাসীর ‘বিপদ’ 

মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৯, ৩ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১৭:৩৬, ৩ জুলাই ২০২২
অতিবৃষ্টি‌তে নগরবাসীর ‘বিপদ’ 

ছবি: সংগৃহীত

ঘণ্টাখানেকের ভারী বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ডুবে যায়। রাস্তার কাজ, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা, বিভিন্ন কোম্পানির কমার্শিয়াল ভবন ও ব্যক্তিগত বাড়ি-ঘরের নির্মাণসামগ্রী রাস্তার ওপরে রাখা; ওয়াসা-তিতাস-ডেসাসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের খোঁড়াখুঁড়ি, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার জলজটের অন্যতম কারণ। তাছাড়া বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে ঢাকা ওয়াসার পাম্প মেশিনের অর্ধেকই বর্তমানে চলছে না বলেও জানা গেছে। 

ঢাকা ওয়াসা থেকে হস্তান্তরকৃত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এসব পাম্প নিজেদের দায়িত্বে নিয়ে এখন বিপাকেই পড়েছে দুই সিটি করপোরেশন। অপরদিকে, মূল পাম্প স্টেশনে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে ভারী বৃষ্টি হলে রাজধানীর মধ্যাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা ডুবে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মনে করছেন তারা। 

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, কমলাপুর পাম্প স্টেশনের পানি তোলার তিনটি মধ্যে দুটি, রামপুরায় পাঁচটির মধ্যে একটি এবং ধোলাইখালে তিনটি পাম্পের মধ্যে সবগুলোই অচল। অপরদিকে, কল্যাণপুরে পাঁচটি পাম্প চালানোর মতো পানি পাওয়া যায় না। কারণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ১৭১ একর জলাশয়ের ১৬৮ একরই দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। পানির লেভেল এবার জুনেই বিপৎসীমার ৪.৮ এর কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে ঘণ্টাখানেকের ভারী বৃষ্টি হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ডুবে যেতে পারে।

ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা রাজধানীর জলাবদ্ধতার জন্য ঢাকা ওয়াসাকে দায়ী করছেন। তারা বলেছেন, রামপুরা ও কমলাপুরে দুটি স্টর্ম ওয়াটার পাম্প স্টেশন স্থাপনের কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছে ঢাকা ওয়াসা। ২০১৬ সালে পাম্প স্টেশন দুটি স্থাপনের সময় ২২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ ধরনের কোনও যন্ত্র স্থাপনের মাত্র ছয় বছরে তা নষ্ট হওয়ার কথা নয়। এখন বিকল পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশন নিয়ে বিপাকে পড়েছে দুটি সংস্থা।

ঢাকার চারদিকে নদীবেষ্টিত হওয়ায় পশ্চিমাঞ্চলে বুড়িগঙ্গার পাড়ে বেড়িবাঁধ ও পূর্বাঞ্চলে বালু নদীর তলদেশ উঁচু হওয়া এবং খাল দখলের কারণে রাজধানীর মধ্যাঞ্চল বৃষ্টির পানির ‘বালতি’তে পরিণত হয়েছে। এখান থেকে পানি অপসারণের জন্য রামপুরায় পাঁচটি, কল্যাণপুরে পাঁচটি, কমলাপুরে বড় তিনটি ও ছোট পাঁচটি, ধোলাইখালে তিনটি পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প ঢাকা ওয়াসার অধীনে ছিল। পাম্পগুলোর মধ্যে ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) ধোলাইখাল ও কমলাপুর পাম্প স্টেশন এবং উত্তর সিটি করপোরেশনকে (ডিএনসিসি) রামপুরা ও কল্যাণপুর পাম্প স্টেশন হস্তান্তর করে ঢাকা ওয়াসা।

ঢাকা উত্তর সিটির ড্রেনেজ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাসনাত মো. আশরাফুল আলম বলেন, রামপুরার পাঁচটি পাম্পের মধ্যে দুই নম্বর স্লটের পাম্পটির শ্যাফট আগেই ভাঙা ছিল। এটা মেরামত অযোগ্য। আমরা পাম্প স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ছয় নম্বর স্লটে নতুন একটি পাম্প স্থাপন করবো। এতে খরচ হবে ২৪ কোটি টাকার মতো। অন্য সব পাম্পের অবস্থাও ভালো না। পর্যায়ক্রমে সব পাম্পই পরিবর্তন করতে হবে। গত বছর জার্মানিভিত্তিক এবিবি কোম্পানির বিশেষজ্ঞ এনে পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে ডিএনসিসির অধীনে থাকা পাঁচটি পাম্পের মধ্যে মাত্র দুটি পাম্প চালু করেছিলাম।

এই প্রকৌশলী বলেন, ওয়াসা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি পাম্প স্টেশনে ব্যবহার করেছে। এবার কম আরপিএম ও অধিক কার্যক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প কেনার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে পাম্পের রিটেনশেন পন্ডে পানির লেভেল ৪.৬ থেকে ৪.৮। যা বিপৎসীমার কাছাকাছি।

অপরদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রকৌশলী বলেন, বর্তমানে রামপুরা স্টেশনের তিনটি পাম্পের দুটি বিকল। পাম্প দুটির মেরামত দরকার। এ কাজের জন্য টেন্ডারও হয়েছে। কিন্তু এখনও ঠিকাদারের দেখা নেই। এর মধ্যে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হলে ঢাকার অবস্থা খুব খারাপ আকার ধারণ করবে।

জানা গেছে, ধোলাইখালেরও তিনটি পাম্প অচল। তিনটিতেই জরুরি বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক মেরামত দরকার। এদিকে জুনেই পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। জুলাইয়ে সাধারণত পানি আরও বাড়ে। তাই ঢাকা ডুবে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে বলেও আশঙ্কা করছেন এই প্রকৌশলী। 

এদিকে, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ. খান বলেন, ঢাকা ওয়াসা থেকে যখন পাম্পগুলো হস্তান্তর করেছি, তখন সবগুলোই ঠিক ছিল। পাম্পগুলো ঠিক না থাকার অভিযোগ মিথ্যা। পাম্প চালাতে হবে প্রতিবছর। আবার মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণও করতে হবে। নিয়মিত মেরামত না করলে যন্ত্র ঠিক থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। 

পাম্প প্রকল্পের প্রশংসা করে তাকসিম এ. খান বলেন, এটা খুবই সুন্দর প্রকল্প ছিল। ঢাকা শহরের বৃষ্টির জমা পানি নামানোর জন্য এটা চালু রাখতে হয়েছে ওয়াসাকে। এখনও সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ ঢাকাকে তো ‘বালতি’ বানানো হয়েছে। সিটি করপোরেশন সে ‘বালতি’ খোলার চেষ্টাই করছে না। অন্যের ওপর দোষ দিয়ে তো সমস্যার সমাধান হবে না।

অপরদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটির পাম্প স্টেশনের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী সফিউল্লাহ সিদ্দিক বলেন, কমলাপুরের বিকল পাম্প চালু করতে নতুন মোটর, পাইপ ও ভিএফডি প্যানেল লাগাতে হবে। আমরা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক কাজের চাহিদা দিয়েছি ৬-৭ মাস আগে। তারাই এ কাজের কথা ভালো বলতে পারবেন। 

এ বিষয়ে কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জাফর আহমেদ ও নির্বাহী প্রকৌশলী মাহতাব আহমেদ অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, পানির পাম্প বিষয়ে গণমাধ্যমের কারও সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে তাদের বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই এবিষয়ে তারা কোনও তথ্য দিতে পারবেন না।

ঢাকা/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়