সয়াবিন তেলের তেলেসমাতি আবার শুরু
রায়হান হোসেন || রাইজিংবিডি.কম
সয়াবিন তেল
ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতার পুরনো সেই তেলেসমাতি নতুন করে আবার ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।
সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করেই হঠাৎ করে আবারো বাড়তে শুরু করেছে সয়াবিন তেলের দাম। বাজারে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি ও খুচরা বাজারে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ৫-৭ টাকা বেড়ছে। পাশাপাশি বোতলজাত তেলের সরবরাহ সংকটও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাজারে এখন ১ ও ২ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট রয়েছে।
বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর নিউমার্কেট ও কারওয়ান বাজার ঘুরে ক্রেতা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১৯৮-২০০ টাকা হয়েছে। যা আগে ছিল ১৯৩ থেকে ১৯৫ টাকা।
রাজধানীর নিউমার্কেটে ঈদের জন্য মুদি বাজার করতে আসা গৃহিণী ফারিয়া আক্তার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমাদের দেশে একবার কিছুর দাম বাড়লে আর কমে না। রমজান মাসে সয়াবিন তেলের চাহিদা একটু বেশি থাকে, কারণ মানুষ ইফতারে বিভিন্ন ধরনের খাবার খায়। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেয়।”
তিনি বলেন, “টিভিতে দেখি, সরকার তেলের দাম কমিয়েছে বা স্থিতিশীল রেখেছে, কিন্তু বাজারে এলে অন্য দুনিয়া। ১ লিটার সয়াবিন তেলের বোতলে যে দাম লেখা থাকে, দোকানিরা তার চেয়ে আজকে ১০ টাকা বেশি নিয়েছে। আর ২ লিটার বোতল তেল পেলাম না। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পকেট কেটে এই সিন্ডিকেট আর কতদিন ব্যবসা করবে? সরকারের উচিত জোরালোভাবে এই ধরনের অতি মুনাফালোভীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।”
রাজধানীর কারওয়ান বাজার সয়াবিন তেল নিতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী খাইরুল ইসলাম বলেন, “বলতে গেলে সয়াবিন তেলের এই দাম বাড়া-কমার খেলা এখন সয়ে গেছে। রমজান আসলে প্রতিবারই এই তেলের তেলেসমাতি শুরু হয়, এটা নতুন কথা নয়। আগে সবখানে তেল পাওয়া যেত এখন পকেটে টাকা থাকলেও দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আমাদের জিম্মি করা হচ্ছে।”
একই বাজারের জসিম জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “সাধারণ মানুষ মনে করে আমরা দাম বাড়িয়ে লাভ করছি, কিন্তু আসল চিত্র উল্টো। আমরা কোম্পানিকে ১০০ কার্টন তেলের অর্ডার দিলে তারা দিচ্ছে মাত্র ১০ কার্টন। ডিলাররা বলছে সাপ্লাই নেই। অথচ কোম্পানিগুলো বলছে, তারা ঠিকমতো তেল ছাড়ছে। মাঝপথে তেল কোথায় যাচ্ছে তা আমরা জানি না। আমরা তেল না পেলে বিক্রি করব কী?”
বোতলজাত তেলের গায়ে লেখা দামের চেয়ে বেশি দাম রাখা হচ্ছে ক্রেতাদের কেমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন,“ এটা সত্য না, আমরা বোতলের গায়ে যে দাম আছে সে দামেই তেল বিক্রি করছি। তবে, কোনো কোনো ব্যবসায়ী করতে পারে, আমরা ঠিক দামেই তেল বিক্রি করছি।”
রাজধানী নিউমার্কেটের বনলতা কাচাবাজারের হাসান স্টরের স্বত্বাধিকারী হাসান শিকদার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমরা এখন আছি বড় বিপদে। কাস্টমার এসে আমাদের সঙ্গে ঝগড়া করছে। কোম্পানি ও ডিলাররা সিন্ডিকেট করে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে যাতে পরে চড়া দামে বিক্রি করা যায়। আমরা বাড়তি দামে কিনে আনি বলে বাধ্য হয়ে দু-এক টাকা বেশিতে বিক্রি করতে হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই অস্থিরতা থামবে না।”
সর্বশেষ গত বছরের ৭ ডিসেম্বরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়ান হয়েছিল। তখন প্রতি লিটারে ৬ টাকা বাড়ানো হলে ১ লিটারের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য করা হয় ১৯৫ টাকা এবং ৫ লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য করা হয় ৯৫৫ টাকা।
ফ্রেশ ব্র্যান্ডের তেলের বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য সম্পর্কে মেঘনা গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজর জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. হাসান জানান, সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। বাজারে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমাদের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে, ঢাকার বাইরে পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহনের সমস্যা হয়েছে মূলত ডিজেল সংকটের কারণে।
ভোজ্যতেলের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে গত সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, “ভোজ্যতেলের দাম এক ফোঁটাও বৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। কারণ, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সাময়িকভাবে কিছু জায়গায় ভোজ্যতেল সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে। কারণ, আতঙ্কিত হয়ে অনেকে অতিরিক্ত কেনাকাটা করেছেন।”
তিনি বলেন, “বিভিন্ন গণমাধ্যম কয়েক দিন ধরে কোথাও কোথাও ভোজ্যতেলের সংকট বা লিটারে দুই টাকা বেশি দামে বিক্রির খবর প্রকাশ করেছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার জন্য বসেছিলাম। জানতে পেরেছি, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। কোথাও কোথাও ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার প্রবণতা রয়েছে। এ কারণে সাময়িকভাবে কিছু দোকানে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।”
ঢাকা/মাসুদ