ঢাকা     শনিবার   ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||  আশ্বিন ৪ ১৪২৭ ||  ৩০ মহরম ১৪৪২

বেদনাবিধুর কালরাত ও আমার নির্বাসনের দিনগুলি

শেখ ফজলে শামস পরশ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৫৭, ১৪ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
বেদনাবিধুর কালরাত ও আমার নির্বাসনের দিনগুলি

শেখ ফজলুল হক মনি ও আরজু মনি

খুব ভোরে প্রচণ্ড ভাঙচুরের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। উঠে দেখি মা পাশে নেই! বিছানায় শুধু আমরা দুই ভাই (ছোট ভাই ফজলে নূর তাপস)। জানালা দিয়ে ঝড়ের গতিতে গোলাগুলি হচ্ছে। গুলি দেয়াল ফুটো করে মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। সিঁড়িঘরে অনেক কান্নাকাটির শব্দ, হইচই!

আমরা দুই ভাই ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে সিঁড়িঘরের দিকে গিয়ে দেখি বাবা-মা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন। মা’র পা দুটো বাবার বুকের ওপর আড়াআড়ি রাখা। দাদির শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে; তিনি পাগলের মতো প্রলাপ বকছেন, দেয়ালে কপাল ঠুকছেন। এ অবস্থায় তিনি আমার বড় চাচিকে বললেন, ‘ফাতু, আরজুর পা দুটি মনির বুকের ওপর থেকে সরাও।’

সেলিম কাকা আর চাচি বাবা-মা’র পাশে মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসে মাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করছেন। আর বাবা (শেখ ফজলুল হক মনি) পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন। মুখে কোনো কষ্টের চিহ্ন নেই। মনে হচ্ছে, যেন শান্তির নিদ্রায় বিভোর। শুধু গলায় কণ্ঠমণির নিচে চামড়া উঠে যাওয়ার একটা চিহ্ন। বাবার শরীরের অন্য কোথাও কোনো ক্ষত আমার মনে নেই। আমরা দুই ভাই কান্নাকাটি করছিলাম। মনে হয় আমরা ভয়েই কাঁদছিলাম। কারণ মৃত্যু কাকে বলে তখনো আমরা জানি না। মৃত্যুর পর মানুষকে যে আর পাওয়া যায় না, সেটাও আমার জানা ছিল না। মৃত্যুর সঙ্গে ওই আমার প্রথম পরিচয়। একসঙ্গে অনেকগুলো মৃত্যু!

মা’র মনে হয় অনেক কষ্ট হচ্ছিল আমাদের রেখে যেতে। মা পানি খেতে চাচ্ছিলেন এবং বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন। বাইরে তখনো গুলির আওয়াজ কমেনি। ভয়ানক গোলাগুলির আওয়াজ, তার সঙ্গে জানালা ভাঙচুরের শব্দ। মা চাচিকে অনেক কষ্টে বললেন, ‘ফাতু আমাকে বাঁচাও। আমার পরশ-তাপস! ওদেরকে তুমি দেইখো।’

ওটাই বোধহয় মা’র শেষ কথা। এরপর কী হলো আমি জানি না। গুলির আওয়াজ অনেক বেড়ে যাচ্ছিল এবং কারা যেন এদিকে আবার আসছিল। চাচি তখন আমাদের নিয়ে ড্রেসিংরুমে পালালেন। আমাদের মেঝেতে শুইয়ে রেখেছিলেন যাতে গুলি না লাগে। গুলি মনে হয় বাথরুমের জানালা দিয়ে ড্রেসিংরুমেও ঢুকেছিল। এরপর আর বাবা-মা’র সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি। শুনেছি সেলিম কাকা একটা গাড়িতে মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর মারুফ কাকা অন্য একটা গাড়িতে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।

এরপর সবকিছু ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার পর আমরা দুই ভাই, চাচি, দাদি, আর রেখা ফুফু এক কাপড়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। তখনো বুঝিনি যে, ওটাই নিজেদের বাসা থেকে আমাদের শেষ প্রস্থান। আর কখনো সে বাসায় ফিরতে পারব না। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর, আর আমার ভাই- তাপসের বয়স চার বছর। আমাদের বাসাটা ছিল ধানমন্ডি ১৩নং রোডে একটা কানাগলির রাস্তায়। পাশেই ছিল একটা বিদেশি রাষ্ট্রদূত ভবন। আমরা সেখানেই আশ্রয় নেই। ওখান থেকে আমরা দেখতে পাই আমাদের বাসায় আর্মিদের আনাগোনা, লুটতরাজ। এরপর শুরু হয় আমাদের ভবঘুরে জীবনযাপন; একেক দিন একেক বাসায়।

কোনো বাসায় দুই দিন, কোনো বাসায় চার দিন, আশ্রয়ার্থী হিসেবে এভাবেই চলতে থাকে বেশ কয়েক মাস। আমার কোনো ধারণা ছিল না, কেন আমরা নিজের বাসায় ফিরে যেতে পারছি না। পরে দাদি-চাচিদের মাধ্যমে বুঝলাম, আর্মিরা আমাদের খুঁজছে। কয়েকটা বাসায় আর্মিরা আমাদের খুঁজতেও এসেছিল। ভাগ্যিস আমরা সময়মতো সেই বাসা থেকে পালিয়ে অন্য বাসায় আশ্রয় নিয়েছি।

মাহুতটুলিতে মঞ্জু খালার বাসায় আমরা মনে হয় বেশ কিছুদিন ছিলাম। মঞ্জু খালা আমাদের পেয়ে অস্থির! আদর-যত্নেই ছিলাম, কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে সে বাসায়ও শান্তিতে থাকতে পারিনি। চলে আসার সময় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মঞ্জু খালা ভীষণ কেঁদেছিলেন। তখনো জানতাম না ওই কান্নার অন্তর্নিহিত কারণ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মঞ্জু খালাও ১৫ আগস্টে তার বাবা (আবদুর রব সেরনিয়াবাত), দুই বোন (আমার মা ও বেবি খালা), ভাই (আরিফ মামা) এবং চার বছরের ভাতিজাকে (সুকান্ত বাবু) হারিয়েছেন। তারপর আবার আমাদের চোখের সামনে দেখতে পাওয়াই তো তাদের জন্য প্রচণ্ড মানসিক চাপ ছিল।

আমার চাচির আব্বা, মরহুম সুলতান আহমেদ চৌধুরীর বাসায়ও আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম। এবং সেই বাসায় আর্মিরা রেইড করেছিল। চাচির বড়বোন, আনু খালার পাঁচ বছর বয়েসি সন্তান লিমাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেছিল। পরে অনেক কসরত করে এবং ধস্তাধস্তি করে লিমাকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয় ওর বাবা আজাদ আঙ্কেল। চাচির মেজভাই বাচ্চু মামাকেও আর্মিরা তুলে নিয়ে যায়। বাচ্চু মামা, সেলিম কাকা, মারুফ কাকাদের সীমানা পার করে দিয়ে আসার পরেই তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় কর্নেল শাহরিয়ার। আর তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার লাশটাও ওরা ফিরিয়ে দেয়নি।

সবাই তখন সারাক্ষণ শুধু কাঁদত। কারও সন্তান হারানোর ব্যথা, কারও ভাই-বোন হারানোর কষ্ট, আর আমাদের বাবা-মা হারানোর অন্তহীন কান্না। তবে কেউ কারও সামনে কাঁদতে পারত না। আড়ালে গিয়ে বোবাকান্না কাঁদত। আমাদের সামনে সবাই কান্না আড়াল করতো। কারণ তখনো আমদের বলা হয়নি যে, বাবা-মা আর নেই। এভাবেই জীবননাশের হুমকি আর ভয়ভীতি সঙ্গী করে আমাদের শোকাহত পরিবারের জীবনের গাড়ি চলতে থাকে।

সেলিম কাকা আর মারুফ কাকার জীবনে তখন চরম ঝুঁকি। মারুফ কাকা তখন খুনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীতে যোগ দিতে মেঘালয় চলে যান। সেলিম কাকাকে তো গুলিই করা হয়েছিল। অল্পের জন্য অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। শুনেছি খুনিরা যখন বাবাকে মারতে আসে, চাচি সেলিম কাকাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে খবর দেন। সেলিম কাকা হুড়মুড় করে গিয়ে দেখেন ওরা বন্দুক তাক করে আছে বাবার দিকে। সেলিম কাকা ওদের ধাক্কা দিলে ওরাও তাকে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়িঘরের কোণায় ফেলে দেয়।

ঠিক তখনই ওরা গুলি করা শুরু করে। রুমের কোণায় এবং নিচে পড়েছিলেন বলে হয়তো গুলি তাঁর গায়ে লাগেনি। ওই মুহূর্তে মা তখন রুম থেকে বের হয়ে এসে বাবার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। মা মনে হয় বাবাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। যে কারণে সেই মুহূর্তে তিনি আমাদের কথা ভাবেননি। মা স্বামীর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উদাহরণ রেখে গেছেন। হয়তোবা গুলি লাগার পরে মা’র আমাদের দুই ভাইয়ের কথা মনে হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফিরে আসার আর উপায় ছিল না।

১৫ আগস্টের পরে অনেকে আমাদের আশ্রয় দিতে ভয় পেতেন। আবার অনেকে জীবনের অনেক ঝুঁকি নিয়েও, আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সবার কথা এখানে উল্লেখ করা সম্ভব হলো না বলে আমি দুঃখিত। তবে তখন আমদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাইত না। কয়েক মাস পরে অনেক কষ্টে রেবা ফুফু আরামবাগে আমাদের জন্য একটা বাসা ভাড়া নেন। সেখানে আমরা কয়েক মাস থাকি। ততদিনে সেলিম কাকা আর মারুফ কাকাসহ আমার মামারাও (আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও আবুল খায়ের আবদুল্লাহ) জীবন বাঁচাতে ভারতে পাড়ি দিয়েছেন। কারণ বাংলাদেশে তাদের জীবন বাঁচানো অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আরামবাগের বাসায় মঞ্জু ফুপার সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় আমার মাথা ফেটে যায়। বাসায় ডাক্তার এনে মাথায় সেলাই দিতে হয়েছিল। মনে হয় হাসপাতালে নেওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না, অথবা সাহস পাননি নিয়ে যেতে আমার দাদি-ফুফুরা।

যেহেতু চাচা-মামারা ততদিনে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, আমরাও প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলাম। প্রস্তুতিটা বেশ কঠিন ছিল। প্রথমত, বর্ডার দিয়ে যেতে হবে, কারণ স্বাভাবিক উপায়ে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মোশতাক সরকার যদি ধরতে পারে, তাহলে মেরে ফেলবে। নিজের রাষ্ট্র থেকে যখন পালিয়ে বেড়াতে হয়, সে অভিজ্ঞতা যে কতটা আতঙ্কের হতে পারে তখন অনুধাবন না করলেও এখন বুঝতে পারি। চিন্তা করলে পরিবারের সবার জন্য বুক ফেটে যায়। সারাজীবন এই দেশটা সৃষ্টি করতে গিয়ে এবং এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, জেল-জুলুম আর নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন আমাদের দাদু- বঙ্গবন্ধু। শুধু তাই নয়, তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের অনেক রকম হয়রানিও করেছে পাকিস্তানি সরকার। আর সেই দেশ সৃষ্টির মাত্র তিন বছর পরেই এই কী পরিণতি! এ কী রকম বিচার!

দ্বিতীয়ত, বর্ডার পার হয়ে যেতে পারব কিনা তারও নিশ্চয়তা ছিল না। পথে পথে ভয়। প্রথম প্রচেষ্টায় আমরা যাওয়ার চেষ্টা করেও যেতে পারিনি। আগরতলা বর্ডারের একদম পাশে যে বাসায় আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম, তারা আমাদের গবাদি পশুর সঙ্গে গোয়ালঘরে থাকতে দিয়েছিল। তারা আমাদের ধরিয়ে দেওয়া, আর লুট করার পরিকল্পনা করেছিল; দাদি আড়ি পেতে সেই পরিকল্পনার কথা শুনতে পেয়ে পরদিন সকালে জিনিসপত্র রেখেই, মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে আমাদের নিয়ে পালিয়ে ফিরে আসেন।

বি.দ্র.: পারবর্তী অংশ আগামীকাল

লেখক পরিচিতি:
অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতি ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির জ্যেষ্ঠ সন্তান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কালরাতে শেখ ফজলে শামস পরশের বাবা-মা শহীদ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পর দেশে ফিরে শেখ ফজলে শামস পরশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়