Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ২১ জুন ২০২১ ||  আষাঢ় ৯ ১৪২৮ ||  ০৯ জিলক্বদ ১৪৪২

৭ মার্চ: বাঙালির লাকি সেভেন

অজয় দাশগুপ্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:২২, ৭ মার্চ ২০২১   আপডেট: ২০:১২, ৮ মার্চ ২০২১
৭ মার্চ: বাঙালির লাকি সেভেন

৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে লেখা বা বলার মানুষের অভাব নাই এখন। বরং বলতে বলতে শুনতে শুনতে ক্লান্ত করার সময় চলছে। অথচ এই ভাষণ আমাদের জাতির এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষত আমরা যারা তখন বালক আমাদের মনে আছে সে ভাষণের এক টুকরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম উড়ে আসার পর কেমন লেগেছিল। কি উৎসাহ আর উদ্দিপনায় জেগে উঠেছিল মানুষ। চট্টগ্রামের বলে আমরা তখনকার মেজর জিয়ার ঘোষণাও শুনেছিলাম সবার আগে। পরে যখন স্বাধীনতার ঘোষক নামের কূটতর্ক আর বিতর্ক শুরু হলো মনে হতো এতো বেঈমান আর এতো মীরজাফর আছে আর কোথাও? সে তর্ক এখন চাপা পড়ে থাকলেও সময় সুযোগ মতো এরা আবার তা মাঠে নিয়ে আসবে। আর সে কারণেই ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে কথা বলা দরকার। আবারো বলছি, এখন চলছে অন্ধ আর স্তাবকদের যুগ। তারা যা না তা সত্য আর যা হাঁ তা মিথ্যা বলার খেলায় মেতে আছে। তাই সাবধানতার বিকল্প নাই।

এই ভাষণ যদিও আর কোনো ব্যাখ্যা বা যুক্তির ধার ধারে না, তবু বলতে হয় এর চেয়ে সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা কোনো জাতি পায়নি। এটিতে বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার করে বলেছিলেন, যার যা আছে তা নিয়ে রুখে দাঁড়াতে। একটা সময় তিনি আপনি থেকে তুমি সম্বোধনে চলে এলেন। শুধু কি তাই হুঁশিয়ার করে পাক বাহিনীকে গুলি বন্ধ করার এক ধরণের আদেশও দিয়েছিলেন। কতবড় বুকের পাটা আর কত সাহস থাকলে তা বলা সম্ভব! বঙ্গবন্ধুর এক তর্জনী বলে দিয়েছিল পাকিস্তানের দিন শেষ। তিনি ছত্রে ছত্রে ধারাবাহিকভাবে ঘোষণা দেয়ার পরও অন্ধ জাতি বলে কি না আর একজন ঘোষকের কারণেই যুদ্ধ হয়েছিল? এতো বড় অবার্চীনতা আর কোনো দেশে আছে বা হয় বলে মনে হয় না।

‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে অনেকগুলি দিক পরিলক্ষিত হলেও বস্তুত সেই ভাষণের মধ্যে দুটি দিক খুবই গুরুত্ব বহণ করে। একটি হলো ধৈর্য, আরেকটি দিক হলো সাহস। বঙ্গবন্ধু সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তেও তাঁর ভাষণে বলেছিল- শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারলে ভাই ভাই হিসেবে এদেশে বাস করার সম্ভাবনা আছে। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেবার অনেক কিছুই আছে। যেকোনো ঝগড়া বিবাদ, সহিংসতা মোকাবেলা করতে গেলে প্রথমে মানুষকে ধৈর্যশীল হতে হয়। ধৈর্য হারিয়ে ফেললে সবকিছু এলেমেলো হয়ে পড়ে। তাছাড়া যেকোনো পরিস্থিতির সমাধান করতে গেলে প্রথমে দেখতে হয় শান্তিপূর্ণ দিকটাকে। যদি শান্তিপূর্ণভাবে কোনোকিছুর সমাধান সম্ভব হয় তাহলে সেখানে যুদ্ধের কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা যুদ্ধ মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। তাই তো বঙ্গবন্ধু সেই উত্তাল অবস্থার ভিতর দাঁড়িয়েও তিনি শান্তির বার্তা ছড়িয়েছিলেন। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। বর্বর পাকিস্তান শান্তিকামী বাঙালির এই সংস্কৃতিকে আমাদের দুর্বলতা ভেবেছিল। তাই তো বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকদের এই মনোভাব বুঝতে পেরে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।’

যখন মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়। যখন যুদ্ধই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, তখন মানুষকে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। তাই তো সাত কোটি বাঙালি সেদিন এক প্রকার খালি হাতেই পাক বাহিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটাই সাহস। কতটুকু সাহস প্রাণে সঞ্চারিত হলে মানুষ মরতেও ভয় পায় না। সেই সাহসের প্রবাহ বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে ঢেলে দিয়েছিলেন। যার প্রতিফলন আমরা ২৬ মার্চের পরে দেখেছি। যখন ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ যেন বিশাল মহাসমুদ্রে এক খণ্ড ভাসমান কাঠের টুকরায় পরিণত হয়েছিল।

এদেশে তখন নেতা বলতে মানুষ একজনকেই চেনে, একজনকেই জানে; যার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই নেতাই তখন এদেশের মাটিতে ছিলেন না; তিনি বাঁচবেন কি মরবেন বা আর কোনোদিন ফিরবেন কিনা তা-ও কেউ জানত না। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা শহরসহ প্রতিটি গ্রামেগঞ্জে ঢুকে নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে মারছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কী হবে এখন? কী করে মুক্তি মিলবে ওই পাকিস্তানি হায়েনাদের থেকে? কে এখন সাহস যোগাবে? সবাই কি তাহলে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলির নিচে নিজেকে সঁপে দেবে? নাকি সবাই তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে?

তখন কিন্তু তাঁর এই ভাষণ-ই মুক্তির পথ বাতলে দিতো বারবার।  স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এর প্রচার মুক্তিবাহিনীকে দিতো অসীম মনোবল। আমার মনে পড়ে দীর্ঘ একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ যখন দেশ শাসনে ফিরলো যে রাতে টিভিতে এটির সম্প্রচার হয়েছিল কার্যত বড় বড় শহরগুলো সেদিন রাতে ছিলো জনশূন্য। মানুষ তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরে টিভির সামনে জায়গা নিয়েছিলেন এটি দেখবেন বলে।  আজ যেন তার উল্টো চিত্র। কারণে অকারণে বারবার বাজিয়ে এই ভাষণের গুরুত্ব খর্ব করার পাশাপাশি সস্তা করে ফেলার প্রবণতা চারদিকে। অথচ কোটি কোটি টাকা খরচের পর ও এর জায়গা হয়নি দুনিয়ার সেরা ভাষণের কোন  সংকলন বা কোন গ্রন্থে। আমি বেশ কয়েকটি কিনে হতাশ হয়েছি বহু সাদামাটা ভাষণ থাকলেও এটি নাই। কারণ এটি তুলে ধরার সব প্রয়াস মুখে আর টাকার তাগিদে। এতোদিনে এই কাজটি হয়ে যাওয়া উচিত ছিলো।

বহুকাল আগে অবিভক্ত বাংলার নেতা সুভাষ বোস বলেছিলেন, তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব। তিনি পারেননি। আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে বললেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ।’ তিনি পেরেছিলেন। ভাগ্য বাঙালির একটি ৭ মার্চ সাথে ছিলো। ছিলো সেই তর্জনী। লাকি সাতের সাত মার্চ চির অমর ইতিহাসে।

 

লেখক: প্রাবন্ধিক, সিডনি থেকে

ঢাকা/শান্ত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়