ঢাকা     রোববার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||  ফাল্গুন ১২ ১৪৩০

একজন তানজিন তিশা আর ভিউ বাণিজ্য

স্বরলিপি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫৬, ২৫ নভেম্বর ২০২৩   আপডেট: ১৮:৫৯, ২৫ নভেম্বর ২০২৩
একজন তানজিন তিশা আর ভিউ বাণিজ্য

বিনোদন! শব্দটি শোনামাত্র ঝলমলে এক পেইজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে এও মনে হয় যে, এই পেইজ শুধু আনন্দ আর আনন্দের খবরে ভরপুর থাকবে। কিন্তু এখানে স্থান পায় তারকাদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিয়ে, সংসার আর সবশেষে মৃত্যুর খবরটিও। আমরা ঝলমলে বিনোদন পাতায় একজন অভিনেতার মৃত্যুর খবরও অনায়াসে পড়ে ফেলি। তারকার মৃত্যুর খবর বিনোদনের অর্থ পাল্টে দেয় কি না জানি না? বিনোদন একটি জগৎ। তারকারা সেই জগতে প্রবেশ করেন শিল্প বিনির্মাণের অংশ হিসেবে। তারপর তারাও অন্যান্য মানুষের মতো অনিশ্চয়তার নিশ্চয়তার মধ্যেই দিন যাপন করেন। স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়েন অপরাধে। অপরাধের খবরাখবর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। 

হলিউড, বলিউডে পাপ্পারাজি ধারার সাংবাদিকতা খুব জনপ্রিয়। তরকারা কী খেলেন, কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে আড্ডা দিলেন সেই সব দৃশ্য লেন্সবন্দি করেন, ছবি ঘিরে রসাত্মক খবর তৈরি হয়। হলিউডে এই ধারার প্রচলন হয় ১৯৬০ সালে। বলিউডে পাপ্পারাজি শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। বলিউডের সূচনালগ্নের একজন পাপ্পারাজি যোগেন। তার ভাষ্য এ রকম যে, তারকাদের গোপন প্রেম আর রোমান্টিক ছবিগুলো মিডিয়া সব থেকে বেশি দামে কিনে নেয়। কারণ এর কদর বেশি। সুতরাং এই ধরনের নিউজ প্রকাশ করতে পারলে তার কদর বেশি হবে সে কথা নতুন করে বলার দরকার পড়ে না।

বাংলাদেশে পাপ্পারাজি ঘরানার সাংবাদিকতা নেই বললেই চলে। কিন্তু পাপ্পারাজি ঘরানার নিউজ প্রকাশ করা থেকে মোটেও পিছিয়ে নেই দেশের বিনোদন সাংবাদিকরা। অনেক সময় ভেঙে যাওয়া প্রেম, গোপন পরিণয়ের ছবি, ভিডিওগুলো তারা নিজেরাই প্রকাশ করেন। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করা নিয়মেই সেসব নিউজ, ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমের ভিউ বাণিজ্য চরিতার্থ হয়। আবার এই ধারায় অভিনেতা বা অভিনেত্রী অখ্যাত কেউ হলে রাতারাতি তিনি পরিণত হন টক অব দ্য টাউনে। এই সুযোগটি অনেক সময় তারকারা নিজেরাই তৈরি করেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তৈরি করেন অনেক হট টপিক। কখনোবা তাদের ঘিরে তৈরি হয় শুধুই ধোঁয়াশা। 

সম্প্রতি টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছেন টিভি অভিনেত্রী তানজিন তিশা। ছোটপর্দার অভিনেতা মুশফিক আর ফারহানের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ও সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনা বা সমালোচনায় এই নাম উচ্চারিত হচ্ছে। এই অভিনেত্রীর ফেসবুক লাইভে দেওয়া ভাষ্য, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে ওয়াশ করা হয়। এই ঘটনা ঘিরেই মূলত তৈরি হয় নানা জল্পনা। প্রথমত এই ঘটনাকে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা হিসেবে সামনে আনা হয়, তারপর আরও একটি প্রশ্ন আসে। ‘গুজব’ শব্দটি এখানে যত দোষ নন্দঘোষের মতো ব্যাপার। কারণ এই শব্দের ওপর ভর করেই সাংবাদিকরা অভিনেত্রীকে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করেন। 

সম্প্রতি অভিনেত্রী তানজিন তিশাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছে, প্রশ্নটি অপরাধ বিষয়ক। আর বিষয়টি যে কোনো নারীর জন্য স্পর্শকাতর।  প্রথম সারির একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বিনোদন সাংবাদিক তিশাকে এই প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্নের উত্তর চেয়ে পাঠানো ক্ষুদেবার্তাটি প্রকাশ করেছে ওই চ্যানেল। ইউটিউবে যার শিরোনাম ‘সেদিন তানজিন তিশাকে চ্যানেল 24'র সাংবাদিক কী এসএমএস পাঠিয়েছিল? 

ভিডিওটি থেকে জানা গেল, তামিম প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি নাকি সম্প্রতি এবরশন করাইছেন। এমন খবর ছড়িয়েছে। কিছু বলবেন এ ব্যাপারে?’ মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে নিউজটি ভিউ হয়েছে চার লাখের বেশি! নিউজে যত কমেন্ট পড়েছে তার প্রায় সবই তানজিন তিশার বিরুদ্ধে। তবে একজন লিখেছেন ’গঠনমূলক প্রশ্নের গঠনমূলক ‍উত্তর দিতে পারতেন’। আপত দৃষ্টিতে তাই। আর এখানেই বিষয়টি শেষ হতে পারতো। 

কিন্তু আরেকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসের বিয়ে, সন্তান বিষয়ক খবরটি যতক্ষণ না তিনি লাইভে এসে বলেছেন ততক্ষণ নিউজ হয়নি। সাংবাদিকরা আরও আগেই যে এ খবর পাননি, এমনটা আমরা ভাবতে পারি না। কিন্তু প্রশ্ন করতে পারি, সেই খবর গণমাধ্যমে আসেনি কেন? তাহলে কি বিনোদন সাংবাদিক মহল এক অদৃশ্য চেইন অব কমান্ড ফলো করেন? তানজিন তিশার নামের ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম! তিনি টেলিভিশন অভিনেত্রী, শাকিব খানের মতো বড় মাপের তারকার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে নেই। সুতরাং তার খবর আসতে বাধা নেই? 

ঘটনার পরে ইউটিউবে তানজিন তিশাকে নিয়ে প্রকাশিত ভিডিও কন্টেন্টগুলোর শিরোনামে চোখ বুলানো যাক। ‘কতজনের সঙ্গে প্রেম করেছেন তানজিন তিশা’, ‘তানজিন তিশার যত প্রেম ও নষ্টামির গল্প’, ‘একাধিক সম্পর্কে তানজিন তিশা, কাজ নয় সম্পর্ক নিয়েই বারবার আলোচনায়’, ‘বহু পুরুষে আসক্ত তানজিন তিশার আমলনামা’, ‘একাধিক সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের মুখে তিশা’ এমন আরও খবর। ইউটিউব ঘেটে দেখা যায়, তানজিন তিশা অভিনীত কোনো কোনো নাটকের ভিউ কোটি ছাড়িয়েছে। তাহলে ধরে নিতে হবে জনপ্রিয়তার সিলমোহর তিনি আগেই পেয়েছেন। তিনিও চাইবেন এই জনপ্রিয়তা থাকুক আর মিডিয়া চাইবে জনপ্রিয় তারকার দিনযাপনের গোপন তথ্য প্রকাশ্যে আসুক। তবেই তো মিলবে কাঙিক্ষত পাঠক, দর্শক। 

বিনোদন পাতাজুড়ে অভিনেত্রীদের শুধুই শরীরি উপস্থাপন। আমরা জানি না মেধাবি অভিনেত্রী তাজিন আহমেদ কেন মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন, অভিনেত্রী হুমাইরা হিমু কতদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। অবশেষে আমরা তাদের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। বিনোদন পাতায় সে সংবাদ পড়েছিও। কিন্তু সেখানে কম জনপ্রিয় অভিনেতা, অভিনেত্রীদের জায়গা নেই বললেই চলে। আরো যে সংবাদের অভাব, তা হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা।  

জনপ্রিয়তা মাপা হচ্ছে তারকার শোস্যাল মিডিয়ার অনুসারী গুনে। এমন অনুসারী টাকায় মেলে। বলিউড অভিনেতা, গায়ক, অভিনেত্রীদের বিরুদ্ধেও আছে এমন অভিযোগ। বাদ যাননি দীপিকা পাড়ুকন থেকে গায়ক বাদশাও। এভাবে অনুসারী বাড়ানোকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে সেদেশের প্রশাসন। ১০ আগস্ট ২০২০ আনন্দবাজারে প্রকাশিত সংবাদকে উপজীব্য করে দ্য বিজনেস ইনসাইডারের খবর , ‘সম্প্রতি মুম্বাই পুলিশের এক তদন্তে জানা গেছে, বলিউডের বেশ কিছু তারকা নকল ভক্তসংখ্যা দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছেন। কেউ ভিডিওর লাইক বাড়াচ্ছেন, কারও আবার লাভের অঙ্ক বাড়ছে এনডর্সমেন্টে। এ প্রসঙ্গে গায়ক বাদশাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে পুলিশ।’

আমাদের দেশে এই উদাহরণও বিরল। নিজেরা কোথায় খেতে গেলেন, কোন সমুদ্র সৈকতে উষ্ণতা ছড়াচ্ছেন এসব কিছু জানতে আর সাংবাদিকদের কষ্ট করতে হয় না। নায়িকারা এখন নিজেরাই নিজেদের ছবি প্রকাশ করেন। শুধু যেকুটু প্রকাশ করেন না, সেটুকুতে স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর ঐ মৌচাকেই ঢিল মারতে চান সাংবাদিক। অফিসিয়ালি বিনোদন বিটের সাংবাদিকরা এই দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। বিশেষ করে বিনোদন বিটের সাংবাদিকদের কাছে সম্পাদকের চাওয়া থাকে সব থেকে বেশি ভিউ। কে কোন নাটকে অভিনয় করছে এই বিষয়ে পাঠক ও দর্শকের চাহিদা থাকলেও বেশি আগ্রহ থাকে তারকার ব্যক্তিগত বিষয়ে। অফিসের বেঁধে দেওয়া টার্গেট পূরণে তারকাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে বেশি নজর রাখতে হয়। তানজিন তিশাকে প্রশ্ন করেছিলেন যে সাংবাদিক সেই তামিমের কথাতেও সে বিষয়টি স্পষ্ট। এটিএন বাংলায় প্রকাশিত খবর, যেটি ইউটিউবে রয়েছে ‘তানজিন তিশাকে নিয়ে মুখ খুললেন সেই তামিম’ এই শিরোনামে। তামিমের স্বীকারোক্তি তিনি আগে নিউজটি ব্রেক করতে চেয়েছিলেন।

গুজবের দোহাই দিয়ে প্রশ্নটি করা হয়েছিল। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র উল্লেখ করে নয়। তানজিন তিশা যদি এমনটা করেও থাকেন তিনি স্বীকার করবেন না এটাই স্বাভাবিক। একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে এই প্রশ্ন অসম্মানজনক, অবমাননাকর। এর জেরে প্রতিক্রিয়াটা বড় ধরনের অপরাধের পর্যায়ে চলে গেছে। সাংবাদিককে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও তিনি দিতে পারেন না। অবশ্য তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতেন।

প্রসঙ্গত, জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠতে থাকাকালে আমেরিকান গায়ক ও সঙ্গীত রচয়িতা ক্রিস ব্রাউন আরেক জনপ্রিয় পপ গায়িকা রিহানার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। দুই তারকার প্রেম যখন তুঙ্গে, ২০০৯ সালে দুজনই গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনয়ন পান ক্রিস। অ্যাওয়ার্ড শো-এর আগের রাতে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ব্রাউন রিহানাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন। আহত রিহানাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। পরে ক্রিস ব্রাউনকে পাঁচ বছরের প্রোবেশন এবং চৌদ্দশ ঘণ্টার শ্রমভিত্তিক সেবা প্রদানের নির্দেশ দেয় সে দেশের আদালত। 

অপরাধ সংঘটিত হলে তা গোপন করার মধ্যে কোনো সমাধান নেই। অপরাধ প্রকাশ্যে আসুক। অপরাধী সাজার আওতায় আসুক। সাংবাদিক আর তারকা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধশীল থাকুন। ভিউ বাণিজ্যের সময়ে স্রোতে গা ভাসিয়ে অসহনশীল হয়ে উঠবেন না। আরেকটু মানবিক, সহমর্মী হওয়া সময়ের দাবি।
আমরা জানি যে, কৃষ্ণনগর রাজার ভাঁড় ‘গোপাল’ শুধু বিনোদিত করতেন না। আপনারা তারকারা একটু অপ্রকাশিত হতে শিখুন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা অহরহ প্রকাশ করতে থাকলে বড় কুৎসিত আর সস্তা দেখায়।

তারা//

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়