তেলআবিব পরিচালনা করবে তেহরান!
জব্বার আল নাঈম || রাইজিংবিডি.কম
দুনিয়া জানে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান রাজনৈতিকভাবে, সামরিকভাবে এবং আদর্শিক দৃঢ়তায় শক্তিশালী একটি ভূখণ্ড। জটিল ভূ-রাজনীতিতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এমন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে বাহ্যিক শক্তির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও ইরানের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েল ও পশ্চিমা জোটের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে ইরান সবসময়ই নিজেকে প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বারবার এমন অভিযোগ উঠেছে যে, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা আগেভাগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে বন্দর, প্রতিরক্ষা স্থাপনা, এমনকি আধা-সামরিক সংগঠন আইআরজিসি পর্যন্ত—বিভিন্ন স্তরে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সিআই সদস্যদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা আগে থেকেই মুখে মুখে। তবু যেন দেশটির নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ছে না। প্রশ্ন উঠছে—যদি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এতটাই অটুট হয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সামরিক পরিকল্পনার খবর কীভাবে দ্রুত তেলআবিব ও ওয়াশিংটনে পৌঁছে যায়?
সাম্প্রতিক এক যৌথ সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায় ইরানে। এতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন! পাশাপাশি দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের অর্ধশতাধিক নেতা ছাড়াও সামরিক ও বেসামরিক অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। এত ধ্বংস আর মৃত্যুতে প্রাথমিক অবস্থায় ইরান ধাক্কা খেলেও শোক কাটিয়ে ধীরে ধীরে যুদ্ধের মাঠে শক্ত অবস্থানে ফিরছে তারা! তারপরও ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
খামেনি দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিরোধ-নীতির প্রশ্নে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। তাঁর অনুপস্থিতি যদি সত্য হয় তাহলে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে তাঁর কাছে তিনটি ‘ভালো পছন্দের’ নাম রয়েছে। তিনি নাম প্রকাশ না করলেও এই বক্তব্য স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে, হামলার উদ্দেশ্য কেবল সামরিক চাপ সৃষ্টি নয়, বরং শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। সরকার পরিবর্তনের এই ধারণা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন নয়, আমরা এর আগেও ইরাক, লিবিয়া কিংবা আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখেছি, বাইরের শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতাও তৈরি হয়েছে।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবনার বাস্তবায়ন যে সহজ হবে না তা সহজেই অনুমেয়। ইরানকে সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। কারণ দেশটি কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বহুস্তরীয় সামরিক কাঠামো ও কৌশলগত প্রস্তুতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে খামেনির ইরান।
০২.
দীর্ঘ চাপের মুখে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দিয়েছে। দেশজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে সুড়ঙ্গপথ, গোপন ঘাঁটি ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। এসব স্থাপনাকে ইরানের বাসিন্দারা ‘মিসাইল সিটি’ বলে ডাকে। উদ্দেশ্য একটাই—শত্রুপক্ষের প্রথম দফার আঘাতের পরও যেন ধারাবাহিক পাল্টা হামলার সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকে।
যুদ্ধে কেবল অস্ত্রের সংখ্যা নয়, স্থায়িত্বই আসল শক্তি। যদি একটি দেশ দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারে, তবে আক্রমণকারীর জন্য তা ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইরানের এই ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো দ্রুত ধ্বংস করা কঠিন—এমনটাই মনে করেন বৈশ্বিক সামরিক বিশ্লেষকেরা। তবে ইরানের এমনটা মনে করার পেছনে রয়েছে ট্রাম্পকার্ড হরমুজ প্রণালি। বলা চলে এটি তাদের হাতে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বিশ্ববাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস পরিবহন, এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। ফলে ইরান সরাসরি অবরোধ ঘোষণা না করেও পরিস্থিতি অস্থির করে তুলতে পারে। হঠাৎ জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, সমুদ্র মাইন, ড্রোন ও দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করে ইরান নৌপথে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এমনকি সতর্কবার্তাই অনেক সময় যথেষ্ট, কারণ ঝুঁকিবিমার খরচ বেড়ে গেলে এবং ট্যাংকারগুলো অপেক্ষায় থাকলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হবে। এর প্রভাব পড়বে তেল ও গ্যাসের দামে, চাপ বাড়বে শেয়ারবাজারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
ইরানের হাতে ‘হাইপারসনিক’ প্রযুক্তি রয়েছে এই দাবি তাদের দীর্ঘদিনের। বিশেষত ফাত্তাহ সিরিজের মতো ক্ষেপণাস্ত্র। যদিও এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই সীমিত, তবু মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের দিক থেকে তা গুরুত্বপূর্ণ।
০৩.
যুদ্ধের গুঞ্জন উঠলেই প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বেড়ে যায়, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে শেয়ার বিক্রি করে। ওয়ালস্ট্রিটে পতনের আশঙ্কা তৈরি হয়। যদি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিতে পারে। আর ক্ষুধার্ত পৃথিবী ভালোমন্দ বোঝে না, চোখ বুজে যুদ্ধে নামবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পাল্টা প্রতিশোধের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য—এই যুদ্ধ সীমিত থাকবে না; বরং বিস্তৃত আকার ধারণ করবে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। ফলে সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি দ্রুত প্রসারিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়াটা অমূলক।
ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, তাদের ভূখণ্ডে আক্রমণ মানেই বিস্তৃত যুদ্ধ। কারণ নেতৃত্বের ওপর আঘাত মানে রাষ্ট্রের প্রতীকী ও কাঠামোগত ভিত্তিকে আঘাত। এর প্রতিক্রিয়া সাধারণত আবেগপ্রবণ ও তীব্র হয়। তবে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ কখনোই একমুখী হয় না। আক্রমণকারী পক্ষ যেমন কৌশল সাজায়, প্রতিরোধকারী পক্ষও পাল্টা পরিকল্পনা করে, একথাও সত্য অ্যাকশনের চেয়ে রিঅ্যাকশনের গতি কখনই কম নয়। ইরানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান, আঞ্চলিক জোট এবং সামরিক প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েলের হাতে ইরান পরিচালিত হবে—এমন ধারণা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় শিরোনাম হলেও বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন। একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনলেই তার কৌশলগত সংস্কৃতি বদলে যায় না, ধরণ ও ধারণ বদলে যায় না। বরং বাহ্যিক চাপ অনেক সময় জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জোরদার করে। যেভাবে জীবিত আয়াতুল্লা আলী খামেনির চেয়ে মৃত আয়াতুল্লা আলী খামেনি আরও বেশি শক্তিশালী। আর এ কারণে সমগ্র ইরান আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ। ঐক্যবদ্ধ ইরান সবসময়ই ভয়ংকর!
ইরান যদি অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে, তবে বাইরের চাপ সামাল দেওয়া সহজ। আর যদি ভেতরের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে, তবে সেই সুযোগ শতভাগ কাজে লাগাতে চাইবে প্রতিপক্ষরা। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলে, এ অঞ্চলে ক্ষমতার খেলা কখনো সরলরেখায় এগোয় না। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে থাকে বহুস্তরীয় কৌশল, আবেগ ও স্বার্থ। তাই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে কেবল সামরিক শক্তির ওপর নয়, বরং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ সংহতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইচ্ছাশক্তি এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর।
লেখক: কবি ও কথাসাহিত্যিক
ঢাকা/তারা//