ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ইনসুলিন সম্পর্কে ডায়াবেটিস রোগীদের যা জানা প্রয়োজন

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৭ ৮:১৩:৩৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২৭ ৪:৪৯:২৭ পিএম

ডায়াবেটিসের পেছনে মূল ফ্যাক্ট হচ্ছে, শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না। সাধারণত ইনসুলিন আপনার মাংসপেশি, চর্বি ও যকৃতের কোষকে আনলক করার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে এবং রক্তপ্রবাহ থেকে গ্লুকোজ টেনে নেয়, যা শরীরে শক্তির যোগান দেয়। ইনসুলিন ছাড়া রক্তপ্রবাহে শর্করা বৃদ্ধি পেয়ে বিষাক্ত মাত্রায় উঠে যেতে পারে।

টাইপ-১ ডায়াবেটিস থাকলে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন ইনসুলিন গ্রহণের প্রয়োজন হবে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগী ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন এবং ডায়েট, এক্সারসাইজ ও খাওয়ার ওষুধের সমন্বয়ে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কিন্তু তাদেরও ইনসুলিনের প্রয়োজন হতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের ইনসুলিন রয়েছে। আপনার জীবনযাপন ও ইনসুলিন ঘাটতির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক পাঁচ রকম ইনসুলিনের যেকোনো একটা নিতে পরামর্শ দিতে পারেন। ইনসুলিনগুলো রক্তপ্রবাহে পৌঁছে কার্যকর হতে ভিন্ন ভিন্ন সময় নেয়। যেমন র‍্যাপিড অ্যাকটিং ইনসুলিন ১৫ মিনিটের মধ্যে কাজ করে, এক ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ হয় ও চার ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। রেগুলার/শর্ট অ্যাকটিং ইনসুলিন ৩০ মিনিটের মধ্যে রক্তপ্রবাহে পৌঁছে, দুই-তিন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ হয় ও ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। ইন্টারমিডিয়েট অ্যাকটিং ইনসুলিন দুই থেকে চার ঘণ্টায় রক্তপ্রবাহে মিশে, ৪-১২ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ হয় ও ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। লং অ্যাকটিং ইনসুলিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কাজ করে ও ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কার্যকর থাকে। এবং আল্ট্রা লং অ্যাকটিং ইনসুলিন ছয় ঘণ্টার মধ্যে রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যায় এবং ৩৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে।

ইনসুলিন হচ্ছে একটি বড় প্রোটিন মলিকিউল। ইনসুলিন প্রয়োজন হওয়ার অর্থ এই নয়, আপনি অবশ্যই অকালে মারা যাবেন। শরীরকে নিয়মিত ইনসুলিন সরবরাহ করতে পারলে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। এমন অনেক রোগী আছেন যারা ইনসুলিন নেয়ার পরও অন্ধত্বের মতো মারাত্মক জটিলতায় ভুগেছেন। কিন্তু এতে ইনসুলিনের দোষ নেই। এ উপসর্গের অর্থ এটা হতে পারে যে, তারা রোগটিকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছেন।

শরীরে চর্বির স্তর রয়েছে এমন স্থানে ইনসুলিন ইনজেকশন দিতে হয়। আপনি পাকস্থলি, বাহুর পেছনে, উপরিস্থ নিতম্ব, কোমরের চর্বিবহুল পাশ ও পায়ের উপরের অংশ বা উরুতে ইনজেকশন দিতে পারেন। এটাও মনে রাখতে হবে যে, সবসময় একই স্পটে ইনজেকশন দিলে নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগতে হবে। তবে নিজে নিজে ইনজেকশন দেয়ার ধারণাটি খারাপ নয়, বরং একাজে অন্যের সাহায্য নেয়ার চেয়ে ভালো। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়ানো যেতে পারে অথবা কাউকে পাশে না পেলেও ইনজেকশন দিতে সমস্যা হয় না। পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। চিকিৎসকেরা শরীরে জীবাণুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্টেরাইল মেথড বা জীবাণুমুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পরামর্শ দিচ্ছেন। জীবাণু থেকে নিরাপদ থাকতে প্রথমে ইনজেকশন সাইটটিকে অ্যালকোহল দিয়ে পরিষ্কার করুন ও ইনজেকশন প্রয়োগের পূর্বে স্থানটি ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে অন্য স্টেরাইল মেথডও অনুসরণ করতে পারেন।

ইনসুলিন সমস্যা থাকলে ঘরে বসে থাকবেন এমন কোনো কথা নেই, আপনার মন চাইলে যেখানে ইচ্ছে সেখান থেকে ঘুরে আসতে পারেন। কিন্তু কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পূর্বে কয়েকটি বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। যেখানে ভ্রমণ করতে যাবেন সেখানে প্রয়োজনের সময় ডায়াবেটিসের ওষুধ পাওয়া যাবে কিনা সে বিষয়েও খোঁজখবর নিতে হবে। বিমানে ভ্রমণ করলে আপনার ডায়াবেটিস উপকরণকে এক্সট্রিম টেম্পারেচার থেকে রক্ষা করতে ক্যারি-অনে রাখুন, ওষুধের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি প্রযোজ্য। কোথাও বেশিদিন অবস্থানের সম্ভাবনা থাকলে অতিরিক্ত ওষুধ নিয়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করুন।

তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণে রাখুন, কারণ ইনসুলিন ও অন্যান্য ইকুইপমেন্ট (যেমন- পাম্প বা মনিটর) উভয়েই উচ্চ তাপমাত্রায় মান কমে যেতে পারে। একারণে সিডিসি ডায়াবেটিস উপকরণকে উষ্ণ গাড়ি ও সরাসরি সূর্যের আলোতে না রাখতে পরামর্শ দিচ্ছে। বাইরে বের হলে অথবা সমুদ্র সৈকতে গেলে কুলারে করে ওষুধ নিয়ে যেতে পারেন।

ইনসুলিন থেরাপির ওপর থাকলে কীভাবে হাইপোগ্লাইসেমিয়া শনাক্ত করতে হবে জেনে নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। হাইপোগ্লাইসেমিয়া হচ্ছে এমন একটি কন্ডিশন যেখানে রক্ত শর্করার মাত্রা খুব কমে যায়, বলেন ডা. সেটসের লিগ। এ কন্ডিশনের উল্লেখযোগ্য উপসর্গ হচ্ছে: মাথাঘোরা, দুর্বলতা, ঘেমে যাওয়া ও ঝাপসা দৃষ্টি। কিন্তু ব্যক্তিভেদে উপসর্গের বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা যেতে পারে। আপনার হাইপোগ্লাইসেমিয়া হলে নিজেই জানতে পারবেন। রক্ত শর্করা চেক করুন। আপনার রক্ত শর্করা প্রতি ডেসিলিটারে ৭০ মিলিগ্রাম বা এর কম হলে ১৫ গ্রাম দ্রুত কার্যকর কার্বস খেতে হবে। কার্বসের কিছু ভালো উৎস হচ্ছে অর্ধকাপ জুস অথবা গ্লুকোজ ট্যাবলেট। নিজের সঙ্গে সবসময় দ্রুত কার্যকর কার্বস রাখা ভালো।

ইনসুলিনের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেক রোগী ইনসুলিন গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত থাকেন। এটা সত্য যে ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে ওজন বেড়ে যাবে, কিন্তু স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন (যেমন- ডায়াবেটিস বান্ধব খাবার খাওয়া ও নিয়মিত শরীরচর্চা করা) ও সঠিক ইনসুলিন ডোজিংয়ের মাধ্যমে এ ঝুঁকি কমানো যেতে পারে। আপনাকে ইনসুলিন নিতে হচ্ছে বলে এটা ভাববেন না যে, আপনি সীমিত হয়ে যাচ্ছেন। আপনি এখনো আগের মতো পুরোদমে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। এমনও ডায়াবেটিস রোগী আছে যারা দক্ষ অ্যাথলেটস, পর্বতারোহী ও সাঁতারু। কীভাবে ইনসুলিন কাজ করে জানা থাকলে, কীভাবে নিম্ন রক্ত শর্করার চিকিৎসা করতে হয় জানলে ও সঠিকভাবে ইনসুলিন নিতে পারলে আপনি যা করতে চান তা করতে না পারার কারণ নেই।

 

ঢাকা/ফিরোজ/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন