Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     মঙ্গলবার   ১৮ মে ২০২১ ||  জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪২৮ ||  ০৪ শাওয়াল ১৪৪২

সোনালি আঁশের সোনালি অতীত

মাছুম বিল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:২৮, ৫ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১০:৩৯, ২৫ আগস্ট ২০২০
সোনালি আঁশের সোনালি অতীত

পাট উৎপাদনের ইতিহাস আমাদেরই ইতিহাস। গত তিনশ বছর বাঙালি চাষির গর্বের ইতিহাস। অথচ কথাটি আজ কেন যেন ‘হাস্যকর’ শোনায়! এর কোনো গুরুত্বই নেই কারো কাছে! পাটের জায়গা দখল করেছে পলিথিন। অথচ কে না জানে, পলিথিন পরিবেশের জন্য কতোটা ক্ষতিকর, এমনকি মানব শরীরের জন্যও। তারপরও পলিথিন ব্যবহারে আমরা পিছিয়ে নেই। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের একটি আইন আছে বটে কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ নেই। সবাই জানেন, কিন্তু কেউ মানেন না। ফলে পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছেই। অথচ সোনালি আঁশ অবহেলিতই থেকে গেল এই সোনালি আঁশের দেশে!

পাট এক সময় ছিলো এ দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। সেটিকে আমরা অদক্ষতা, দুর্নীতি আর চরম অব্যবস্থাপনার কারণে পায়ে ঠেলেছি। এই পাট উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কত শিল্প, কত কারখানা, কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে; দাঁড়িয়েছে পাট শিল্প। আজ সবই অতীত। পায়ে ঠেলতে ঠেলতে সোনালি আঁশ তার সব ঐতিহ্য হারিয়েছে। হয়েছে এক জাতিগত বেদনার প্রতীক। কৃষক পাট উৎপাদন করে বিক্রয়মূল্য না পেয়ে পাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমরা পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পায়তারা করে সফল হই। এই সীমাহীন অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র যে কোনো সচেতন মানুষকে কষ্ট দেবে।

বাংলার পাট সুনাম কুড়িয়েছিল বিশ^জুড়ে। কারণ বিশে^র আর কোথাও পাট ফলানোর মতো এতো ঊর্বর এবং উপযুক্ত মাটি প্রকৃতি দেয়নি। এটি ছিল আমাদের গর্বের, আমাদের একক সম্পদ। বিশে^র সর্ববৃহৎ জুটমিল গড়ে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জে। সেখানে লাখ লাখ মানুষ শ্রম দিতো। কিন্তু হায়! আমরা ধরে রাখতে পারলাম না। শুধুমাত্র অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং অপরাজনীতির কারণে। এ আমাদের জাতীয় দুর্ভাগ্য। কেউই আমরা পাটের সুনাম ফিরিয়ে আনতে সঠিক উদ্যোগ নেইনি। সরকার এসেছে, চলেও গেছে। কিন্তু পাট চাষির ভাগ্য বদল হয়নি। উল্টো বন্ধ করা হয়েছে পাটকল। এভাবে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা হরিয়েছি। কিন্তু দেশের পাটকল যখন বন্ধ হয়েছে, তখন প্রতিবেশী দেশ ভারতে গড়ে উঠেছে শত শত পাটকল। দেশের কৃষক ঠকিয়ে, দেশের মানুষকে বেকার বানিয়ে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হাতিয়ারকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে এ কেমন রাজনীতি?

খবরে প্রকাশ ধারাবাহিক লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে গেল সরকারি ২৫টি পাটকল। তবে বন্ধের পর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনমুখী করা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। দুর্নীতির পাহাড় সরিয়ে এই দেশে সেটি কি সম্ভব? সেটি হয়তো হবে রাষ্ট্রীয় অর্থ নয়-ছয় করার আরো একটি উপায়। শোনা যাচ্ছে বন্ধ ঘোষিত পাটকলগুলোর প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় করা হবে। যদিও অর্থ সংকটের কারণে ইতোমধ্যে যারা অবসরে গেছেন তাদের বেতন ভাতা পরিশোধ হয়নি। তাদের পাওনা বাবদ এক হাজার ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

গত ৪৮ বছরে সরকারকে এ খাতে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। ষোল কোটি মানুষের দেশে পাটজাত দ্রব্য বিভিন্ন কাজের জন্য উৎপাদিত হলে, ব্যবহৃত হলে পাটকলগুলো লোকসানের মুখে পড়ার কথা নয়। এই কাজ করার জন্য কি আমাদের কোনো কর্তৃপক্ষ নেই? আমাদের ৩১৪টি পাটকলের মধ্যে ৬৩টি বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পাটকল সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন পাটকল আছে ২৭টি। এর মধ্যে তিনটি নন জুট মিলস রয়েছে। এই সংখ্যা এখন ৩৩টি। এর মধ্যে আবার বন্ধ রয়েছে ৭টি। বাকিগুলোতে চলছে লুটপাট আর লোকসানের মহামারি যা করোনাভাইরাসের চেয়েও মারাত্মক। এর কোনো প্রতিষেধক কোনো সরকারই আবিষ্কার করতে পারেনি। অথচ বেসরকারি খাতে রয়েছে ২৮১টি পাটকল। যার মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৫৬টি। তবে জানা গেছে, সেগুলোতে এতো লোকসান হচ্ছে না। কয়েকটিতে লাভও হচ্ছে।

যে রাষ্ট্রায়াত্ব পাটকলগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়ে আসছে বছরের পর বছর, এ জন্য যারা দায়ী তাদের কি কিছুই হবে না? সেইসব শ্রমিক নেতা যারা কাজ না করে, শিল্প কারখানায় উৎপাদন না করে রাজনীতিতে বেশি উৎসাহী এদের সংখ্যা বেশি নয়। এরা পরিচিত মুখ। তারা আখের ঠিকই গুছিয়ে নিয়েছে। অথচ এর ফল ভুগতে হবে শ্রমিকদের, কৃষকদের। আমাদের পাট মন্ত্রণালয় আছে। তাহলে এসব মন্ত্রণালয়ের কাজ কী?

আমরা গার্মেন্টস শিল্পকেও এভাবে বিপদে ফেলেছি। এখানে আমাদের লাখ লাখ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ। একসময় পাটে যেমন ছিলো পাটকল শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। পাটের ভবিষ্যৎ হারিয়েছি, গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ হারাতে চাই না। এখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধের জন্য হলেও পাটশিল্প চাঙ্গা করতে হবে। পাটকল বন্ধ করা সমাধান নয়। ভারত কেন পাটকল চালু করছে ভাবতে হবে। এখনও সময় আছে। এ দেশের মাটির ঊর্বরা শক্তির পাশাপাশি যারা রাষ্ট্র চালনা করেন তাদের মেধা শক্তিও ঊর্বর হতে হবে। কারণ আপনাদের সুষ্ঠু পরিকল্পনার উপরই নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যৎ। 

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়