ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২১ ১৪২৭ ||  ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘কোটালীপাড়ার ধুলাবালি গায়ে মাখতে চাই, ধন্য হতে চাই’

বাদল সাহা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:০৫, ৮ জুলাই ২০২০  

সংঙ্গীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র এন্ড্রু কিশোর। রাজশাহীতে বসবাস করলেও তার পৈত্রিক বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কলাবাড়ি ইউনিয়নের চিথলীয়া গ্রামে। গ্রামটিতে তার আত্মীয় স্বজনদের বাস। জীবিত থাকতে এসব স্বজনদের ভোলেননি এন্ড্রু।

গ্রামের বাড়িতে তেমন একটা আসা যাওয়া ছিলো না। তারপরেও সবসময় আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ খবর নিতেন তিনি। সুখ-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করতেন।

গত সোমবার (৬ জুলাই) সন্ধ্যায় এই গুণী সংগীত শিল্পীর মৃত্যুতে দেশব‌্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। গোপালগঞ্জে থাকা তার স্বজনের কাছে এ সংবাদ পৌঁছালে সেখানেও এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।

এন্ড্রু কিশোরের কাকাতো ভাই পূর্ণদান বাড়ৈ (৭৩) এর সাথে কথা হয় রাইজিংবিডির এই প্রতিবেদকের। পূর্ণদান রাইজিংবিডিকে জানান, এন্ড্রু কিশোরের দাদারা ছিলেন পাঁচ ভাই। এর মধ্যে ছোট ছেলে সূর্য কুমার বাড়ৈ-এর দুই ছেলে ক্ষিতিশ বাড়ৈ ও রনজিত বাড়ৈ। ক্ষিতিশ বাড়ৈ-এর তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার ছোট এন্ড্রু কিশোর। তার বড় ভাইয়ের নাম স্বপন বাড়ৈ ও বোন শিখা বাড়ৈ।

বাবা ক্ষিতিশ বাড়ৈ-এর জন্ম কোটালীপাড়ায় হলেও আনুমানিক ১৯৫০ সালে কর্মক্ষেত্রের কারণে তিনি রাজশাহী চলে যান। সেখানে যাবার পর ১৯৫৫ সালে রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন গুণী শিল্পী এন্ড্রু কিশোর। বেড়ে ওঠেন রাজশাহীতেই।

রাজশাহীতে বড় হলেও এবং খ‌্যাতনামা শিল্পী হলেও ভুলে যাননি তার পৈত্রিক ভিটা ও আত্মীয় স্বজনকে। সুযোগ আর অবসর সময় পেলে কাউকে না জানিয়েই ছুটতেন কোটালীপাড়ার পৈত্রিক ভিটায়।

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে এন্ড্রু কিশোর তার স্ত্রী, বোন ও ভগ্নিপতিকে নিয়ে এসেছিলেন পৈত্রিক ভিটায়। এটাই ছিলো শেষবারের মতো। ঘুরে বেড়িয়েছিলেন এলাকাজুড়ে। পৈত্রিক ভিটায় একটি সংগীত একাডেমি করতেও চেয়েছিলেন তিনি। নাম ও ঠিক করে রেখেছিলেন। নাম রেখেছিলেন ‘প্রার্থনা কুঞ্জ’। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূর্ণ হলো না।

বেশ ক‌য়েক বছর আগে এন্ড্রু কি‌শোর মাদারীপুরের ঘটকচর স্কুল মাঠে শো করতে এসে‌ছিলেন। তখন তিনি তার নিজের মুখে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলে‌ছিলেন, ‘আমার পৈ‌ত্রিক‌ বা‌ড়ি এই‌ স্কুল মাঠ থেকে বে‌শি দূরে নয়। পাশের কোটালীপাড়ায় আমার পৈ‌ত্রিক বা‌ড়ি।’

পূর্ণদান বাড়ৈ বলেন, ‘‘সময় পেলে এন্ড্রু ছুটে আসতেন পৈত্রিক ভিটায়। ঘুরে ঘুরে দেখতেন। মানুষ হিসেবে খুব মিশুক ছিলেন। সাধারণ মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নিতেন। মনেই হতো না তিনি এত বড় গায়ক। কোনো অহংকার ছিলো না।

‘এন্ড্রু কিশোর যখন মেট্রিক পাশ করেন, তখন রাজশাহীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাড়ির কাছেই ছিল তাদের জমি। জমি দেখতে গিয়ে এন্ড্রু কিশোরের সাথে অনেক দুষ্টুমি করতাম।

‘আমি এক সময় ঢাকায় চাকরি করতাম। মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ একদিন রাস্তায় দেখা। মেয়েসহ আমাকে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে একটি চাইনিজ হোটেলে খাওয়াতে নিয়ে যায়। তিনি স্বজনদের কখনও ভুলে যাননি।”

এন্ড্রু কিশোরের ভাতিজা জেমস রায় বলেন, ‘‘১৯৮১ সালে যখন আমি ঢাকা যাই, কাকা তখন ধানমন্ডির ওয়ার্ল্ড ভিশন অব বাংলাদেশে গান রেকডিং করছিলেন। তিন দিন অপেক্ষার পর আমার কাকার দেখা পেয়েছিলাম। তার সে আন্তরিক সান্নিধ্যের কথা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এন্ড্রু কিশোর একজন উদার মনের মানুষ ছিলেন।

‘আমি একবার রাজশাহীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন আমার দাদী (এন্ডু কিশোরের মা) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, গ্রামে কে কী করছে? আমাদের জমি ও পুকুরের মাছ কে কীভাবে নিয়ে যায়? তখন কিশোর কাকা বলেছিলেন, ‘এখানে গ্রামের কোনো পলিটিক্স চলবে না। গ্রামের কোন কথা বলা যাবে না। যে যা নেয় নিক, তাতে আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। খাও দাও ফুর্তি করো।’ গ্রামের সম্পত্তির উপর তার কোনো লোভ ছিল না। গ্রামের আত্মীয়-স্বজন ও গরিব মানুষের প্রতি ভালবাসা ছিলো অসীম।” 

তিনি আরও বলেন, ‘‘২০১৮ সালে যখন পৈত্রিক ভিটা দেখার জন্য কোটালীপাড়া এসেছিলেন, তখন তাকে আনতে মোটরসাইকেল পাঠিয়েছিলাম। চিথলীয়া বাজারে কাছে এসে তিনি পায়ে হেঁটে পৌত্রিক ভিটায় আসেন। আমি বলেছিলাম, কাকা অনেক ধুলাবালি রয়েছে আপনি গাড়িতে আসেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমার পৈত্রিক বাড়ি কোটালীপাড়ায়। আমি কোটালীপাড়ার ধুলাবালি গায়ে মাখতে চাই, ধন্য হতে চাই।’’

এন্ডু কিশোরের অপর এক কাকাতো ভাই এলিও বাড়ৈ বলেন, ‘সময় পেলে তিনি আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। সব সময় আমাদের সহযোগীতা করতেন। কয়েক মাস আগে এন্ড্রু কিশোরের সাথে আমার শেষ কথা হয়।’

এলাকাবাসী উত্তম বাড়ৈ ও আনিল বিশ্বাস বলেন, ‘খ্যাতনামা গায়ক শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের বাড়ি কোটালীপাড়ায় এজন্য আমরা গর্ববোধ করি। তার ইচ্ছা ছিলো একটা সঙ্গীত একাডেমি করার। তিনি তার সে ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারলেন না। আমাদের দাবি, সরকার এই গুণী শিল্পীর ইচ্ছাটি পূরণ করতে একটি সঙ্গীত একাডেমি করবেন।’

জেলা উদীচীর সভাপতি নাজমুল বলেন, ‘সংগীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের চলে যাওয়ার মাধ্যমে আমরা সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারালাম। এ ক্ষতি আমাদের সঙ্গীত জগতের। আমার আর এমন শিল্পী আর পাবো না। তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করে একটি সঙ্গীত একাডেমি তৈরির বিষয়ে সরকার যত্নবান হবে এটাই আশা করি।’

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, ‘জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এখানে তার একটি পৈত্রিক ভিটা রয়েছে। ওই ভিটায় এন্ড্রু কিশোরের নামে একটি স্থাপনা নির্মাণ করা উচিত। সেটা একাডেমি বা একটি লাইব্রেরিও হতে পারে। আমাদের এই গুণি শিল্পীর স্মৃতি ধরে রাখা উচিত।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সংগীত শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের পৈত্রিক ভিটা কোটালীপাড়ায়। এটা আমাদের জন্য গর্বের। শুনেছি তিনি পৈত্রিক ভিটায় একটি সঙ্গীত একাডেমি করতে চেয়েছিলন। এই গুণী শিল্পীর স্মৃতি রক্ষার্থে কোটালীপাড়ায় একটি সঙ্গীত একাডেমি বা সঙ্গীত স্কুল স্থাপনের জন্য চেষ্টা করবো।’

 

গোপালগঞ্জ/সনি

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়