Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     সোমবার   ১৯ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ৬ ১৪২৮ ||  ০৬ রমজান ১৪৪২

কতটুকু চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে কানাইঘাটের সোয়া ২ লাখ মানুষ

আব্দুল্লাহ আল নোমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:১২, ১৬ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৫:০৪, ১৬ অক্টোবর ২০২০
কতটুকু চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে কানাইঘাটের সোয়া ২ লাখ মানুষ

চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে কাঙ্খিত সেবা দিতে পারছে না সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৩১ শয্যা বিশিষ্ট এ হাসপাতালে ৪ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত রয়ছেন মাত্র একজন। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারের (আরএমও) পদটিও রয়েছে শূন্য।

শুধু তাই নয়, একজন ডেন্টাল সার্জন থাকলেও নেই কোনো ডেন্টাল ইউনিট। ফলে দাঁতের চিকিৎসা করাতে পারেন না রোগীরা। আর মেডিসিন, সার্জারি এবং গাইনির কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় জটিল রোগে আক্রান্তদের এখানে ভর্তি না করেই পাঠানো হয় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

দীর্ঘদিন ধরে বিকল হাসপাতালের এক্সরে মেশিন। শুধুমাত্র যক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা ছাড়া হাসপাতালে আর কোনো প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষাও হয়না। বিশেষজ্ঞ না থাকায় হয় না অপারেশন, ফলে বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারও। এছাড়া হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব এবং ড্রেনেজ সিস্টেমের সমস্যাও বিদ্যমান রয়েছে।

সম্প্রতি হাসপাতাল সরেজমিন ঘুরে এমন সংকটের চিত্র উঠে আসে। অবশ্য এ সীমাবন্ধতার মধ্যেও প্রতিদিন হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রায় ৩ শতাধিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আর প্রতিদিনই ১০ থেকে ১৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তিও হচ্ছেন। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে ৫০৭জন রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় কাঙ্খিত সেবা ও চিকিৎসা না পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কথায়ও। তারা বলছিলেন, চিকিৎসক দিনে দুই-একবার দেখে যান। এরপর কোনো সমস্যা হলে তাদের ফোন দিয়ে আনতে হয়। আর হাসপাতালে এক্সরেসহ পরীক্ষা নিরীক্ষা হয় না, ফলে তা বাইরে থেকে করে আনতে হয়। এতে দরিদ্র রোগীরা বেশ অসুবিধায় পড়েন। আর জটিল রোগী এলে তাকে সিলেটে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলেও জানান তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৩১ শয্যার এ হাসপাতালটিতে ৫১ শয্যায় উন্নীত করতে ভবন নির্মাণ করা হয়। গত এপ্রিলে নতুন এ ভবন হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এখনও হাসপাতালটি কাগজে কলমে ৩১ শয্যারই রয়েছে। আর জনবল কাঠামোও তাই সেভাবেই আছে। তবে অধিকাংশ পদই শূন্য।

তথ্য অনুসারে, হাসপাতালে সবমিলিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ১৬টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি এবং আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারের পদ ফাঁকা। আর  একজন মেডিক্যাল অফিসার সিলেট সদরের খাদিমপাড়া ৩১ শয্যা হাসপাতালে সাময়িকভাবে কর্মরত এবং দুইজন সহকারী সার্জন দীর্ঘদিন ধরে কোনো অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।

একই ভাবে সিনিয়র স্টাফ নার্স পদে ১৫ জনের স্থলে কর্মরত আছেন ৭ জন। আর মিডওয়াইফ ৪ জন থাকলেও বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন ৩ জন; অন্য একজন  সিলেট সদরের খাদিমপাড়া ৩১ শয্যা হাসপাতালে সাময়িকভাবে কর্মরত।

সংকট রয়েছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরও। প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক, ক্যাশিয়ার ও স্টোর কিপারের পদ ফাঁকা রয়েছে। এ সবকটি পদের অতিরিক্ত দায়িত্বে তিনজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাদের একসাথেই দু’টি পদের দায়িত্ব সামাল দিতে হচ্ছে। ফলে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

শুধু তাই নয়; শূন্য রয়েছে ফার্মাসিস্ট পদটিও। দু’টি ফার্মাসিস্ট পদ থাকলেও একটি পদ ফাঁকা ছিল দীর্ঘদিন ধরে। আর দায়িত্বে থাকা অন্যজন চলতি মাসের ১ তারিখে অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) চলে গেছেন। রেডিওগ্রাফারের ১ টি, ল্যাব টেকনলজিস্ট ১ টি, অফিস সহায়ক ৪টি পদের মধ্যে ৩টি, নিরাপত্তা প্রহরী দুটি পদের মধ্যে ১টি পদ শূন্য রয়েছে।

এছাড়া সম্প্রতি একজন আয়া, একজন বাবুর্চি, একজন সহকারী বার্বুচি এবং ৪ জন পরিচ্ছন্নকর্মী আউটসোর্সিয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। এসবক’টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য ছিল, তবে আউটসোর্সিয়ে নিয়োগের মাধ্যমে তা পূর্ণ করা হয়েছে। তাছাড়া কানাইঘাটে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারের ৭ টি পদের মধ্যে ৪টি এবং ৪০ জন স্বাস্থ্য সহকারীর মধ্যে ১৩টি পদ শূন্য।

হাসপাতালের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নূর মোহাম্মদ স্টোর কিপারের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি জানালেন, প্রায় বছর দিন ধরে একই সঙ্গে দুটি পদের কাজ সামাল দিচ্ছেন তিনি। এ কারণে কাজ করতে তাকে অনেকটা হিমশিম খেতে হয়। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়েও বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বলেও জানালেন।

হাসপাতালের একজন সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, ‘১৫ জনের বদলে মাত্র ৮ জন দায়িত্ব পালন করছেন। সাতটি পদই শূন্য রয়েছে। এ কারণে দুইজনের দায়িত্ব একজনকে পালন করতে হচ্ছে।

কানাইঘাট উপজেলার আয়তন প্রায় ৪১৩ বর্গ কিলোমিটার। বৃহৎ এ উপজেলার সর্বমোট জনসংখ্যা প্রায় সোয়া দুই লাখ; যারা চিকিৎসা সেবার জন্য এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ওপর নির্ভরশীল। তবে চিকিৎসক সংকট আর পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকায় তারা প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো চিকিৎসাই পাচ্ছেন না এ হাসপাতালে। এ কারণে দ্রুত এসব বিষয়ে নজর দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপজেলার ৭ নং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ আহমদ। তিনি বলছিলেন, হাসপাতালের জনবল সংকটসহ নানা সমস্যার কথা কমিটির সর্বশেষ সভায় উঠে এসেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে শূন্যপদ পূরণের জন্য প্রতিবেদনও পাঠানো হচ্ছে। তবুও এসব পদ পূর্ণ হচ্ছে না। এতে উপজেলার সাধারণ জনগণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি দ্রুত এসব পদ পূরণসহ সব। সমস্যা সমাধানে এ আসনের সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদারের হস্তক্ষেপ কামনাও করেন।

উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল্লাহ শাকির বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। এরই ফলশ্রুতিতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে সরকারের এ উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি দ্রুত জনবল সংকট নিরসন এবং উপজেলা হাসপাতালে জটিল রোগীদের চিকিৎসা সেবার জন্য সব ধরনের সুযোগ সুবিধা চালুর আহ্বানও জানান।

এদিকে, ২০১৬ সালের পর থেকে হাসপাতালের এক্সরে মেশিনটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে জানিয়ে হাসপাতালের পরিসংখ্যানবিদ সুবুদ চন্দ্র দাস বলেন, ‘বর্তমানে টিবি প্রোগ্রামের আওতায় হাসপাতালে একটি জিন ল্যাব এবং এক্সরে বসানোর কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে দু’টি কক্ষ সম্প্রসারণও করা হয়েছে। হাসপাতালে টেকনিশিয়ান পদ শূন্য। এ কারণে ওই সংস্থাই তাদের লোকবল দিয়ে এক্সরে চালু করবে। ফলে শিগগিরই হাসপাতালে রোগীরা এক্সরে সুবিধা পাবেন।’

করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় ৫ বেডের একটি আইসোলেশন কেন্দ্র খোলা রয়েছে; প্রথম দিকে রোগী ভর্তি থাকলেও গত মাস থেকে এ ওয়ার্ডে কোনো রোগী ভর্তি হননি। আর স্টকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে; প্রয়োজন সাপেক্ষে তা রোগীদের সরবরাহ করা হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধেরও পর্যাপ্ত স্টক রহয়েছিছে, চাহিদা অনুসারে রোগীদের মাঝে তা সরবরাহ করা হয়। এছাড়া হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার জন্য ফায়ারিং এক্সটিংগুইসার রয়েছে, তবে এগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত থাকলেও পানি নিষ্কাশনের কোন পথ না থাকায় বৃষ্টি হলেই হাসপাতালের আঙ্গিনায় পানি জমে থাকে। এতে করে আগত রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ কারণে পানি নিষ্কাশনের রাস্তা বের করা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য হাসপাতালে আনসার বাহিনী মোতায়েনের পরামর্শ দিয়েছেন কানাইঘাট প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আলা উদ্দিন।

চলতি মাসের ৮ তারিখে কানাইঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) পদে যোগদান করেন ডা. অভিজিৎ শর্ম্মা। হাসপাতালের একাধিক পদ শূন্য থাকায় কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা প্রদান ব্যহত হচ্ছে এমনটি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। চিকিৎসক ও নার্সসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগ এবং সমস্যার কথা শিগগিরই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো। শূন্য পদ পূরণ হলে হাসপাতালের রোগীদের সবধরণের চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’

সিলেট/এসএম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়