ঢাকা     সোমবার   ০৪ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২০ ১৪২৯ ||  ০৪ জিলহজ ১৪৪৩

কৃষকের কাজে আসছে না রৌমারী রাবারড্যাম প্রকল্প

বাদশাহ্ সৈকত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:৪২, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২  
কৃষকের কাজে আসছে না রৌমারী রাবারড্যাম প্রকল্প

এক যুগ কেটে গেলেও কৃষকদের কোনো কাজেই আসছে না কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার খেওয়ারচর এলাকায় জিঞ্জিরাম নদীর রাবারড্যাম প্রকল্প। এতে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় ও দেখভালের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে ৮৫ মিটার দৈর্ঘ‌্যের রাবার ব্যাগসহ ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি। 

এরই মধ্যে প্রকল্পটিতে সেচ ব্যবস্থা চালু না হলেও পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির পকেট কমিটি গঠনসহ দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি প্রকল্পটির নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এলজিইডির বিরুদ্ধে অপরিকল্পিতভাবে ও নিম্নমানের নির্মাণ কাজের অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। 

স্থানীয় ও রৌমারী উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত ঘেঁষা খেওয়ারচর এলাকায় জিঞ্জিরাম নদীতে ২০১০ সালে খেওয়ারচর রাবারড্যাম প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পে সরকারের প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়। প্রথম দফায় ১২ কোটি ও দ্বিতীয় দফায় অতিরিক্ত আরও ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ব্যয় হলেও সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এলাকার ৪০০ কৃষক। 

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খেওয়ারচর রাবারড্যাম প্রকল্প এলাকায় কৃষকরা শ্যালো মেশিন দিয়ে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। উপজেলার লালকুড়া খেয়াঘাট হতে তিন কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। 

সড়কটির বেশিরভাগ এলাকা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের সুরক্ষা ও নদী শাসনের জন্য দুই কিলোমিটার সিসি ব্লক ও রাস্তা নির্মাণের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। সেতুর দুই পাশের সিসি ব্লক নদীতে ধসে গেছে। সেতুর নিচে নদীতে ড্যামের রাবার ফুলানোর অভাবে রাবারড্যামের ব্যাগটি নষ্ট হতে বসেছে। প্রকল্পটি দেখভালের জন্য ওই এলাকায় কাউকে পাওয়া যায়নি।

প্রকল্প এলাকার কৃষক হাফিজুর রহমান ও নুরুল ইসলামসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, ‘সরকার কৃষকদের ভাগ্যে উন্নয়নের কথা ভেবে এ প্রকল্পে ১৪ কোটি টাকা খরচ করলেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকল্পটি আজও চালু হয়নি। এটাতে শুধু এলজিইডি অফিস, ঠিকাদার ও স্থানীয় একটি মহলের লাভ হয়েছে। এরই মধ্যে সমিতির বেশিরভাগ সদস্যকে না জানিয়ে গোপনে কমিটি গঠন করার পাঁয়তারা ও অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে মানববন্ধর করেছে এলাকাবাসী।’

খেওয়ারচর রাবারড্যাম এলাকার কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে রাবারড্যামটি বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। নির্মাণ কাজে অনিয়ম হওয়ায় রাবারড্যাম ব্রিজটির দুই পাশে বন্যার সময় ভাঙন দেখা দেয় এবং বসতবাড়িসহ ওই এলাকার আরও তিনটি বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। 

ওই এলাকার কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, রাবারড্যাম পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। তারা সমিতির সদস্যদের কোনো মতামতও নেন না। তাদের অবহেলায় প্রকল্পটি আজও চালু হচ্ছে না।

তাদের অভিযোগ, সিসি ব্লকের পরিবর্তে ১৫ বস্তা বালুর সঙ্গে এক বস্তা সিমেন্ট মিশিয়ে নদীর দুই পাড়ের ৩০ মিটার এলাকায় বসানো হয়েছিল। দুই বছরের মধ্যে বস্তাগুলো নদীতে ধসে গিয়ে পাড় ভেঙে যায়।

খেওয়ারচর রাবারড্যামের পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) কার্যকরী সদস্য রশিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই রাবারড্যাম প্রকল্পের আওতায় ৪০০ কৃষক সদস্য রয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় এলাকার প্রায় ১২০০ কৃষক ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপ বসিয়ে চাষাবাদ করছেন। এতে ফসল উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।’ 

তিনি খেওয়ারচর রাবারড্যাম পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির (পাবসস) কমিটি গঠনের বিষয়ে অভিযোগ করে বলেন, ‘সমিতির কার্যালয়ের সোলার প্যানেলের সাতটি ব্যাটারি বিক্রি করেছেন সভাপতি হেলাল উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম। এছাড়াও সমিতির সদস্যদের জমানো টাকা আত্মসাৎ করেন তারা। তাদের এ অপকর্ম ঢাকতে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে গোপনে পকেট কমিটি গঠন করেন।’ 

অভিযোগের বিষয়ে খেওয়ারচর রাবারড্যাম পাবসস কমিটির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সোলার প্যানেলের ব্যাটারি বিক্রি করা হয়নি, তা মেরামত করতে দেওয়া হয়েছে।’ 

পকেট কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন না হলেও সমিতির নিয়ম অনুযায়ি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রকল্পের নানা সমস্যার কথা এলজিইডি অফিসে জানানোর পরও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে রৌমারী উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মেজবাহ আলম জানান, রাবারড্যাম এলাকার নদীর দুপাশে যে পরিামাণ বাঁধ নির্মাণ করা দরকার, তা না করায় প্রকল্পটি চালু করা যাচ্ছে না। বাঁধ নির্মাণ না করে রাবার ফুলিয়ে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কমপক্ষে সাত কিলোমিটার পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ করলে এ প্রকল্পের সুফল পাবে কৃষকরা। 

নির্মাণ কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই সময় যে টাকা বরাদ্দ হয়েছিল তা সঠিকভাবে ব্যয় করা হয়েছে।’

খেওয়ারচর রাবারড্যাম (পাবসস) কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটিকে ঘিরে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দেখার দায়িত্ব ওই সমিতির লোকদের। কিন্তু সমিতির বিগত কমিটির লোকজনের অবহেলার কারণে ওই প্রকল্পে নানা জটিলতা দেখা দিতো।’ 

সেতুর দুপাশের সিসি ব্লক ধসে যাওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এটা দেখার দায়িত্বও সমিতির লোকজনের।’

কুড়িগ্রাম/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়