ঢাকা     বুধবার   ৩০ নভেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ১৬ ১৪২৯ ||  ০৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

প্রতিবেশীর সন্তানকে নিজের দাবি করে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে শিক্ষিকা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪৪, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২   আপডেট: ১০:৫৫, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
প্রতিবেশীর সন্তানকে নিজের দাবি করে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে শিক্ষিকা

মুনিয়ারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

প্রতিবেশীর শিশু সন্তানকে নিজের সন্তান দাবি করে শিক্ষা কর্মকতার কাছ থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। বিষয়টি জানাজানি হলে ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করছেন বিদ্যালয়টির অভিভাবকসহ এলাকাবাসী। 

জানা গেছে, জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের মুনিয়ারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আলেয়া সালমা। চলতি বছরের ১৪ মার্চ থেকে মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করছেন তিনি। নিজে গর্ভধারণ না করেও এ ছুটি নিতে তিনি প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। 

অভিযোগ উঠেছে, আলেয়া সালমার ছুটি নেওয়ার পুরো বিষয়টি প্রধান শিক্ষক খাদিজা সুলতানা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উচ্চমান সহকারী ও হিসাবরক্ষক আজিজার রহমান, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবু নোমান মো. নওশাদ আলীর যোগসাজসে হয়েছে।

আলেয়া সালমা বদলি সূত্রে ২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মুনিয়ারহাট বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। 

জানা গেছে, ২০১৯ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা কাগইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শফি আহমেদ স্বপনকে বিয়ে করেন আলেয়া সালমা। বিয়ের পর থেকেই বগুড়ায় থাকতেন তিনি। এরপর করোনার কারণে দীর্ঘ দিন বন্ধ ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরিস্তিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও তিনি স্কুলে আসেননি। চিকিৎসাসহ নানা অজুহাতে ছুটি নিয়েছেন তিনি। 

চলতি বছরের ১৪ মার্চ সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য দিন দেখিয়ে ১৩ মার্চ থেকে ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করেন আলেয়া সালমা। কিন্তু গর্ভকালীন সালমার শারীরিক কোনো পরিবর্তন বিদ্যালয়ের সহকর্মীদের নজরে আসেনি। এ কারণে তিনি ১৩ মার্চ কোলে প্রতিবেশির শিশু সন্তান নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে উপস্থিত হয়ে ছুটির আবেদন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন শারমীন নামের এক নারী। 

মুনিয়ারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক জানান, মাঝে মধ্যে আলেয়া সালমা স্কুলে আসতেন। আমাদের সঙ্গে দেখা হতো। তবে তাকে দেখে কথনোই সন্তান সম্ভাবা বলে মনে হয়নি। 

অভিভাবক আব্দুল মমিন ও ফরিদা বেগম জানান, অলেয়া সালমা অন্যের সন্তানকে নিজের দাবি করে ছুটি নিয়েছেন। আর এসব কিছু করে দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা। 
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, নাগেশ্বরী থাকা অবস্থায় তিনি বিদ্যালয়ে আসতেন। তবে বগুড়া যাওয়ার পর আর আসেননি। সন্তান হওয়ার বিষয়টি তারা শুনেছেন বলে জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলেয়া সালমার ঘরে প্রথম স্বামীর দুটি সন্তান এবং দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে একটি সন্তান রয়েছে। তৃতীয় এবং বর্তমান স্বামীর ঘরে কোন সন্তান না থাকলেও তিনি নিজেকে ৪ সন্তানের জননী হিসেবে দাবি করেন। তবে শিক্ষা অফিসে শুধুমাত্র প্রথম স্বামীর দুই সন্তানের নাম অন্তর্ভূক্ত করা আছে। যে শিশুটিকে নিজের সন্তান দেখিয়ে আলেয়া সালমা ছুটি ভোগ করছেন সেটি তার সন্তান নয়। শিশুটি আলেয়া সালমার বর্তমান স্বামীর প্রতিবেশী দম্পতি আনিছুর রহমান পাশা ও শারমীন দম্পতির। 

এ বিষয়ে শিশুটির সত্যিকারের মা শারমিন বলেন, ‘সালমা আমার আত্মীয়র মতো। আমি সন্তানসহ তার সঙ্গে কুড়িগ্রামে বেড়াতে যাই। সেখানে আমার সন্তানকে নিজের বাচ্চা হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে সেটা কিভাবে বুঝবো আমি।’ 

তিনি আরও  বলেন, ‘আমার বড় মেয়ের নাম আফিফা। বয়স পাঁচ বছর। আর ছোট মেয়ের নাম আশফিয়া। মার্চ মাসে আশফিয়ার জন্ম হয়েছে।’ 

এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষিকা আলেয়া সালমা বলেন, ‘সবাইকে ম্যানেজ করে আমি ছুটিতে আছি। শিক্ষা অফিসের বড়বাবু ছুটির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আপনারা নিউজ করে আমার কিছুই করতে পারবেন না। আমি ছুটি নিয়েই চলব। আমাদের সিস্টেম আছে। চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতা সরকারেরও নেই।’ 

প্রধান শিক্ষক খাদিজা সুলতানা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘শিক্ষক আলেয়া সালমা নিয়মমাফিক ছুটিতে আছেন।’ 

উপজেলা শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী ও হিসাবরক্ষক আজিজার রহমান বলেন, ‘আলেয়া সালমা আমার প্রতিবেশী বোন হয়।’ 

সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবু নোমান মো. নওশাদ আলী বলেন, ‘বিধি অনুযায়ী শিক্ষিকার মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয়েছে। এখন কেউ যদি অন্যের সন্তানকে নিজের বলে চালিয়ে দেয় তাহলে কিছু করার নেই।’ 

নাগেশ্বরী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলী বলেন,  ‘আলেয়া সালমার সন্তানের বিষয়টি যদি মিথ্যা হয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা জাহান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো।’ 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমি কয়েকদিন আগে শুনেছি। শিক্ষকদের প্রতিবেদন দিতে বলেছি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাদশাহ সৈকত/ মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়