ঢাকা     শনিবার   ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৪ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

পেটের ভেতরে মপ রেখে সেলাই, সংকটাপন্ন প্রসূতির জীবন

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:২৭, ১৮ অক্টোবর ২০২৩   আপডেট: ১২:০৯, ১৯ অক্টোবর ২০২৩
পেটের ভেতরে মপ রেখে সেলাই, সংকটাপন্ন প্রসূতির জীবন

প্রায় তিন মাস আগে ময়মনসিংহ নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারে নবজাতকের জন্ম দেয় হাসিনা আক্তার (৩৫) নামে এক নারী। সিজারের পর ছেলে ও মা দুজনই সুস্থ ছিল। এই ঘটনার তিন দিন পর ২০ জুন ক্লিনিক থেকে রোগীকে ছাড়পত্র দিলে হাসিনার পরিবার তাকে বাড়িতে নিয়ে যায়। কিন্তু হাসিনা শুধু বলতেন, তার পেটে ব্যথা করে।

পরে বিভিন্ন স্থানে ডাক্তার দেখিয়ে কোনও কাজ না হওয়ায় অবশেষে গত ১৪ আগস্ট ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় হাসিনাকে। সেখানে আল্টাসনোগ্রাফি রিপোর্টে জরায়ুতে মপ রেখেই সেলাই করা বিষয়টি জানতে পারে চিকিৎসকরা। পরে অপারেশন করে ৭৫ শতাংশ ইনফেকশন হওয়ায় প্রায় জরায়ু ও ফেলোপিয়ান টিউব (বাচ্চা থাকার থলে) কেটে ফেলে দিতে হয়। মাত্রাতিরিক্ত ইনফেকশন হওয়ায় পায়খানার রাস্তায় বাইপাস করে দেওয়া হয়েছে। পরপর অপারেশন করায় বর্তমানে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন ওই নারী।

ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া ব্রাহ্মপল্লী ১৩/বি হেলথ কেয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে এই ঘটনা ঘটে। ওই অস্ত্রোপচার (সিজার) করে গাইনি চিকিৎসক ডা. রুপা আক্তার।

ভুক্তভোগী নারী হাসিনা জেলার ত্রিশাল উপজেলার আউটিয়াল গ্রামের আনিসুরের রহমানের স্ত্রী। আনিসুর রহমান পেশায় রিকশা চালক। আনিসুর রহমান দুই মেয়ে ও সর্বশেষ ছেলে সন্তানসহ তিন জনের বাবা।

বুধবার (১৮ অক্টোবর) বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর হেলথ কেয়ার প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডা. রুপার সাথে যোগাযোগ করলে একে অপরের ওপর দোষ চাপাতে ব্যস্ত।

এ বিষয়ে হেলথ কেয়ার প্রাইভেট হাসপাতালের ম্যানেজার রুহুল আমিন বলেন, রোগী আমার হাসপাতালে আসছে। আমরা ভর্তি করে বাইরের ডাক্তার দিয়ে সিজার করে দিয়েছি। এখন চিকিৎসক জরায়ুর ভেতরে কী রেখে অপারেশন করেছে, সেটা তো আমাদের দেখার বিষয় না। তারপরও আমরা রোগীর স্বজনদের খবর দিয়ে এনেছিলাম। কিন্তু তারা পরে আর কোনও যোগাযোগ করেনি। তাছাড়া চিকিৎসকের নামে মামলা করে কেউ কিছু করতে পারে না।

তবে ডা. রুপা কোন হাসপাতালের চিকিৎসক বা তার পরিচয় কী, সে বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে পারেননি ম্যানেজার রুহুল আমীন। 

ভুক্তভোগী নারীর স্বামী আনিসুর রহমান বলেন, গত ১৭ জুন বিকেলে আমার স্ত্রী প্রসব ব্যথা অনুভব করতে পারেন। পরে তাড়াহুড়ো করে ওই দিন সন্ধ্যায় নগরীর চরপাড়া ব্রাহ্মপল্লী ১৩/বি হেলথ কেয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করি। ভর্তির পর ওই দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওই ক্লিনিকে ডা. রুপা আমার স্ত্রীর সিজার করেন। সিজারে আমার স্ত্রী ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর থেকে আমার স্ত্রীর পেটে ব্যথা শুরু হয়। বিভিন্ন ওষুধ খাইয়ে কোনও কাজ না হওয়ায় অবশেষে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখানের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে বলেন। ৪ সেপ্টেম্বর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানো হয়। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা জানায়, আমার স্ত্রীর জরায়ুতে গজের মত কিছু একটা রয়েছে। যে কারণে ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করাতে হবে। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে অপারেশন করা হয়। অপারেশন করার পর চিকিৎসকরা কেটে ফেলা জরায়ু, ফেলোপিয়ান টিউব ও পচা রক্তাক্ত কাপর তুলা মেশানো একটি বস্তু দেখায়। যে বস্তুটির কারণে ইনফেকশন হয়েছে এবং জরায়ু ও ফেলোপিয়ান টিউব কেটে ফেলতে হয়েছে। চিকিৎসকরা আরও বলেছে, আমার স্ত্রী আর কোন দিন বাচ্চা নিতে পারবে না। 

তিনি আরও বলেন, ওই অপারেশন করার পর আমার স্ত্রীকে আরও দুই বার ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। ৪ দিন থাকার পর ১৭ অক্টোবর আবারও হাসপাতাল থেকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। 

বাড়িতে নেওয়ার পর হঠাৎ করে পড়ে গিয়ে আর কোন কথাবার্তা বলতে পারছে না। আমি দরিদ্র রিকশা চালক। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে আমি নিঃস্ব। স্ত্রীকে আবার হাসপাতালে আনার মত আমার সামর্থ্য নাই।

সিজার করা চিকিৎসক রুপা আক্তার বলেন, এ বিষয়ে আমার স্বামী আপনার সাথে যোগাযোগ করবেন।

ডা. রুপা আক্তারের স্বামী আরাফাত বলেন, এমন ভুল অনেক হয়। তবে, আমরা রোগীর স্বজনদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ওই নারী ক্লিনিকে সিজার করার পর জরায়ুতে মপ (রক্ত পরিষ্কার জন্য তুলা ও কাপর দিয়ে তৈরি বস্তু) রেখেই সেলাই করেন। মপটি প্রায় তিন মাসের বেশি সময় জরায়ুতে থাকায় ইনফেকশন হয়ে যায়। এতে ওই নারী জরায়ু ৭৫ শতাংশ ও ফেলোপিয়ান টিউব কেটে ফেলতে হয়েছে। এ ছাড়াও, পায়খানার রাস্তায় বাইপাস করা হয়েছে। 

তবে, গর্ভবতী মায়েদের জন্য আমাদের পরামর্শ থাকবে সাধারণ ক্লিনিকে না গিয়ে সরকারি কোন হাসপাতালে অভিজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে সিজার করানো ভাল। তাছাড়া সিজার না করিয়ে নরমাল ডেলিভারি হলে আরও ভাল।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে কেউ কোনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিলন/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়