ঢাকা     শনিবার   ১৮ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ৪ ১৪৩১

রানা প্লাজা ট্রাজেডি স্মরণ: ছবিগুলো স্মৃতি, গল্পগুলো ভেজায় চোখ

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৩৮, ২৩ এপ্রিল ২০২৪  
রানা প্লাজা ট্রাজেডি স্মরণ: ছবিগুলো স্মৃতি, গল্পগুলো ভেজায় চোখ

আঁখির হয়তো স্বপ্ন ছিল সমুদ্র দেখার। সরাসরি না পারলেও স্টুডিওতে ছবি তুলে পেছনে বসিয়ে নেন সমুদ্রের দৃশ্য। অন্যদিকে শাহেদুলের হয়তো স্বপ্ন ছিল উড়োজাহাজে চড়ার। তাইতো স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে স্টুডিওতে এমন ব্যাকগ্রাউন্ড রেখে ছবি তুলেছিলেন।

প্রায় এক যুগ আগে তোলা এসব ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। ২০১৩ সালে হাজারো হতভাগ্য শ্রমিকের সঙ্গে ভবন ধসে নিহত হন এই দুজনও। এখন সেই স্বপ্নের আদলে তোলা ছবিগুলোতেই স্বজনরা খুঁজে বেড়ান তাদের স্মৃতি। গল্পগুলো বলতে গিয়ে ভিজে আসে চোখ।

মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) সকাল ৯টার দিকে সাভার রানা প্লাজার সামনে ‘রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর: হাজারো প্রাণ ও স্বপ্নের গল্প’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়।

দোষীদের শাস্তি ও সম্মানজনক ক্ষতিপূরণের দাবিতে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এ কর্মসূচির প্রথম দিনে আয়োজিত সভায় স্বজনরা স্মরণ করেন নিহত শ্রমিকদের।

আয়োজনের উদ্বোধন করেন রানা প্লাজা ভবনে দুই দিন আটকে থেকে উদ্ধার হওয়া আহত শ্রমিক জেসমিন।

সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে আলোচনা করেন আহত জেসমিন, নিহত শ্রমিক আঁখি আক্তারের মা নাসিমা আক্তার, নিহত ফজলে রাব্বীর মা রাহেলা আক্তার, নিহত শাহীদার মা এবং গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেনসহ আরও অনেকে।

প্রদর্শনীতে চার আলোকচিত্রীর তোলা ছবি ও পোশাক শ্রমিকদের সন্তানদের সাতজনের আঁকা ছবি, জীবিত থাকা অবস্থায় স্টুডিওতে তোলা ২০ শ্রমিকের ছবি প্রদর্শন করা হয়।

এরমধ্যে একটি ছবি নিহত শাহেদুলের। স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে স্টুডিওতে ছবি তুলে, ব্যাকড্রপে উড়োজাহাজের ছবি দেওয়া। হয়তো উড়োজাহাজে চড়ার স্বপ্ন ছিল তার।

আরেকটি ছবি ছিল নিহত আঁখির। হয়তো সমুদ্র ভালোবসতেন তিনি। কিন্তু যাওয়া হয়নি কখনো। তাই স্টুডিও থেকে স্বপ্নের ছবি তৈরি করিয়ে নেন সেই সমুদ্রর পারে। আখি আক্তার (১৮) ও তার বন্ধুরা রানা প্লাজার সপ্তম তলার নিউ ওয়েব স্টাইল লিমিটেড কারখানায় কাজ করতেন। বন্ধুদের সঙ্গে পহেলা বৈশাখ, ১৪২০ (১৪ এপ্রিল, ২০১৩) এই ছবিটি তোলা। তার ঠিক ১০ দিন পর ২৪ এপ্রিল, ২০১৩ থেকে রানা প্লাজা ধসের পর থেকে আঁখি নিখোঁজ। এই ছবির কেবল একজন বেঁচে আছে, আঁখিসহ এই ছবির সকলেই নিহত বা নিখোঁজ।

আয়োজকরা জানান, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে এসব শ্রমিকের প্রাণ ও স্বপ্ন নিঃশেষ হয়ে যায়। রানা প্লাজার সামনে প্রদর্শনী করে আবারও সেই অতীতের স্মৃতিকে সামনে আনা হয়েছে। এই ঘটনাকে ইতিহাসে বাঁচিয়ে রাখতে এবং তরুণদের লড়াইয়ে প্রেরণা দিতেই এই প্রদর্শনী। রানা প্লাজার শ্রমিকদের মতো যাতে আর কাউকে অকালে মরতে না হয়; এই প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন তারা।

প্রদর্শনীর উদ্বোধন শেষে আলোচনায় আহত শ্রমিক জেসমিন বলেন, এমনভাবে দুই দিন আটকে ছিলাম যে, বাঁচার কোনো আশা ছিল না। একজন অচেনা মানুষ আমাকে আগলে রেখে বাঁচিয়েছিলো। তখন কে পুরুষ, কে নারী, কে হিন্দু, কে মুসলমান ভাবার সুযোগ ছিলো না। বাঁচার চরম ইচ্ছা ও সন্তানকে দেখার ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছু মাথায় আসেনি।

তিনি আরও বলেন, ১১ বছর ধরে সেই দুঃসহ স্মৃতির ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি মনে ও শরীরে। অথচ এখনো দোষীদের শাস্তি হয়নি। দোষীদের শাস্তি হলে আমরা প্রাণে একটু শান্তি পেতাম।

সভায় বক্তারা বলেন, ১১ বছরেও ১,১৭৫ জন প্রাণ হত্যার বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়নি। কারখানার ভবন মালিক সোহেল রানা ছাড়া অন্যান্য মালিক, সরকারি কর্মকর্তারা জামিনে জেলের বাইরে আছেন। সোহেল রানাও গত বছর জামিন পায়। পরবর্তীতে তার জামিন উচ্চ আদালত স্থগিত করে।

তাদের মতে, বিচারের এই ধীরগতি সরকার ও রাষ্ট্রের মালিকপক্ষ ও দোষীদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার এবং তাদের বাঁচিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টারই সামিল।

তারা বলেন, যে রাষ্ট্রে কোনো গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ নাই, জনগণের মত প্রকাশের সুযোগ নাই, সেখানে রানা প্লাজার ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা আরও বিপর্যস্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নাই।

তারা আরও বলেন, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নাই।

ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়ে তারা বলেন, নিহত ও আহত পরিবারকে ১১ বছর আগে যে আইনি ক্ষতিপূরণ বা অনুদান দেওয়া হয়েছে তা কখনোই সম্মানজনক বা মর্যাদাপূর্ণ নয়। শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের আইন যা বদল হয়েছে তা অতি নগণ্য। ১ লাখ এবং দেড় লাখ থেকে ২ লাখ ও আড়াই লাখ পর্যন্ত বাড়ানো কোনো শ্রমিককে মানুষ হিসেবে গণ্য না করারই উদাহরণ।

বক্তারা বলেন, একদিকে এক জীবনের সমপরিমাণ সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা না করা। অন্যদিকে ব্রান্ড, এনজিও এমনকি সরকারের দফায় দফায় কিস্তিতে শ্রমিকদের অর্থ সহযোগিতা ও নানা প্রশিক্ষণের নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। যাতে শ্রমিকরা বিচারের দাবিতে সংগঠিত না হয়ে, ভিক্ষুকের মতো কেবল সহায়তা খোঁজে, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তারা আরও বলেন, ক্ষতিপূরণ কোনো ভিক্ষা নয়, এটি শ্রমিক ও নাগরিকের আইনি অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় এক হওয়ার আহ্বান জানাই।

আয়োজকরা জানান, দুই দিনব্যাপী কর্মসূচিতে আগামীকাল ২৪ এপ্রিল, ২০২৪ রানা প্লাজার সামনে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও প্রতিবাদী র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে।

সাব্বির/ফয়সাল

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়