ঢাকা     মঙ্গলবার   ২৮ মে ২০২৪ ||  জ্যৈষ্ঠ ১৪ ১৪৩১

অডিটরদের খুশি করতে ৫৭ কর্মকর্তা থেকে চাঁদা আদায়

রাজশাহী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:১৩, ২৪ এপ্রিল ২০২৪   আপডেট: ১৯:২০, ২৪ এপ্রিল ২০২৪
অডিটরদের খুশি করতে ৫৭ কর্মকর্তা থেকে চাঁদা আদায়

স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের তিন কর্মকর্তাকে খুশি করতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৫৭ জন নার্সিং কর্মকর্তাকে চাঁদা দিতে হয়েছে। এই নার্সিং কর্মকর্তারা হাসপাতালের ৫৭টি ওয়ার্ডের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অডিটে আসা কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে তাদের কাছ থেকে চাঁদা তুলেছেন হাসপাতালেরই তিন কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বেশ কয়েকজন ওয়ার্ড ইনচার্জ জানান, মাথাপিছু তারা ১ হাজার ২০০ টাকা করে চাঁদা দিয়েছেন। গত রোববার (২১ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের তিন কর্মকর্তা হাসপাতালে নিরীক্ষায় আসেন। মঙ্গলবার (২৩ এপ্রিল) তারা ফিরে গেছেন। আর তাদের কথা বলে গত শনি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত চাঁদার টাকা তোলা হয়। 

ইনচার্জরা জানান, হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুন ও নার্সিং সুপারভাইজার ময়েজ উদ্দিন নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কামরুন্নাহার পান্নার মাধ্যমে এই চাঁদা তুলেছেন। এই টাকা অডিটরদের দেওয়া হয়েছে, নাকি ওই তিন কর্মকর্তা আত্মসাৎ করেছেন তা তারা জানেন না। নার্সিং সুপারভাইজার ময়েজ উদ্দিন হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ ও নার্সদের ফোন করে চাঁদা দিতে বলছেন, এমন একাধিক অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে। এতে শোনা গেছে, তিনি দ্রুত টাকা নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনে পৌঁছে দিতে বলছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত রোববার তিনজন নিরীক্ষক হাসপাতালে আসার পরই সেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুন ও নার্সিং সুপারভাইজার ময়েজ উদ্দিন চাঁদা তোলার ছক কষেন। তাঁরা প্রতিটি ওয়ার্ডের ইনচার্জের কাছ থেকে টাকা তোলার জন্য নার্সিং অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কামরুন্নাহার পান্নাকে নির্দেশ দেন। এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার কামরুন্নাহার পান্না ওয়ার্ড ইনচার্জদের ডেকে সভা করেন। সেখানে তিনি মাথাপিছু ১ হাজার ২০০ টাকা করে জমা দেওয়ার কথা বলেন। অ্যাসোসিয়েশনে মো. তারেক নামের এক ব্রাদারকে টাকা আদায়কারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তারেক গত শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে বসে টাকা আদায় করেন।

কত টাকা আদায় হয়েছে, এমন প্রশ্নে বুধবার (২৪ এপ্রিল) তারেক বলেন, ‘টাকার হিসাব আমার কাছে নেই। এটা পান্না ম্যাডাম বলতে পারবেন।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কামরুন্নাহার পান্না বলেন, ‘এটা নিয়ে আমি কথা বলতে চাচ্ছি না।’

প্রতি বছরই হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা ওষুধ, স্যালাইনসহ অন্যান্য দ্রব্যদির হিসাব নিয়ে অডিট হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হিসাবের স্টক লেজার খাতা অডিট হয়নি। এই লেজার খাতা অডিট করানোর কথা বলেই চাঁদা তোলা হয়। এ জন্য সেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুন তাঁর সহকারী জান্নাতুল ফেরদৌসের কাছে স্টক লেজার খাতা জমা দিতে বলেন। ইনজার্চরা তার কাছে খাতা জমাও দেন। কিন্তু বুধবার খাতা হাতে নিয়ে দেখেন তা নিরীক্ষিত হয়নি। ইনচার্জরা জানতে চান, তাহলে কীসের অডিট হলো আর কেনইবা তাদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হলো। তখন নার্স জান্নাতুল ফেরদৌস তাদের হিসাব শাখার নিরীক্ষিত একটি কাগজ দেন। এতে স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা ও হিসাব কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে।

ইনচার্জরা জানান, অডিটররা মূলত হাসপাতালের হিসাব শাখার ধোলাই বিল, যাতায়াত বিল ও যন্ত্রপাতি মেরামত খরচের অডিট করেছেন। এই ব্যয়ের সঙ্গে ওয়ার্ড ইনচার্জদের ওষুধপত্রের হিসাবের সম্পর্ক নেই। তারপরও নিরীক্ষা দলকে দেখিয়ে ইনচার্জদের কাছ থেকেও চাঁদা তোলা হয়েছে।  

জানতে চাইলে নার্সিং সুপারভাইজার ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিবছর অডিটের সময় এভাবে টাকা তোলা হয়।’ এর বেশি তিনি কথা বলতে চাননি। কথা বলার জন্য সেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুনের মুঠোফোনে কয়েকদফা চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফোন ধরেননি সুফিয়া খাতুনের সহকারী জান্নাতুল ফেরদৌসও। 

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা ও হিসাব কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অডিটে গিয়ে আমরা কোনো টাকা-পয়সা নিইনি। এ বিষয়ে কিছু জানি না। এটা হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেবে।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএফএম শামীম আহম্মদ বলেছেন, দাপ্তরিক কাজে তিনি সচিবালয়ে গেছেন। তিনি চাঁদা তোলার ব্যাপারে কিছু জানেন না। কারা এই কাজ করেছেন তিনি তদন্ত করে দেখবেন। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। 

কেয়া/বকুল 

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়