ভাতা দিয়ে দেশকে বেকারের ফ্যাক্টরি বানাতে চাই না: জামায়াতের আমির
বগুড়া প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
শনিবার দুপুরে বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খাছের মাঠে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “আমরা যুবকদের বেকার ভাতা দিতে পারব না।। আমরা বেকার ভাতা দিয়ে অপমানিত করতে চাই না। বেকার ভাতা দিয়ে বাংলাদেশকে বেকারের ফ্যাক্টরি বানাতে চাই না। আমরা প্রত্যেক যুবক-যুবতীকে দেশ গড়ার কারিগরে পরিণত করতে চাই। পড়াশোনা শেষে প্রত্যেক যুবক-যুবতীর হাতে মর্যাদাপূর্ণ কাজ তুলে দিতে চাই। তারা দেশে ও বিদেশে কাজ করবে। আমরা যুবকদের বেকারের মিছিলে দেখতে চাই না।”
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খাছের মাঠে নির্বাচনি জনসভায় এসব কথা বলেন তিনি।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করতে না পারলে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
ডা শফিকুর রহমান বলেছেন, “নির্বাচনে আসতে আমরা ১০টি দল একত্র হয়েছি। এর অর্থ আমরা দশে মিলে দেশটা গড়তে চাই। জোটে আমাদের এখানে মাত্র তিনটি শর্ত। এই তিনটি শর্ত যারা মানবেন, আরো আছেন যারা, সবাইকে আমরা ওয়েলকাম করব। এক নাম্বার শর্ত— নিজে দুর্নীতি করবেন না, দুর্নীতিবাজদের বগলের নিচে আশ্রয় দেবেন না। দুই নাম্বার শর্ত— ন্যায়বিচার সকলের জন্য নিশ্চিত করা হবে। কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা যত প্রভাবশালী ব্যক্তি হোক, বিচারের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবেন না। বিচারকে তার আপন গতিতে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, গরিব, দুখী মেহনতি মানুষসহ সম্পদশালী যারা যেখানে আছেন, ন্যায়বিচার সকলের পাওয়ার অধিকার আছে। বিচার আর অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হবে না। প্রভাবিত হবে না। রাজনৈতিক কারণে প্রভাবিত হবে না। সেই বিচারটা আমরা বাংলাদেশে কায়েম করতে চাই। তিন নাম্বার শর্ত হচ্ছে—গণভোটে যখন হ্যাঁ বিজয়ী হবে, তখন প্রতিজ্ঞা করতে হবে, ওয়াদা করতে হবে—সংস্কারের সবগুলো প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে সহযোগিতা করবেন।”
তিনি বলেন, “এই তিন শর্ত যারা মানবেন, আমরা তাদেরকে খোলা মনে বলতে চাই, আল্লাহর ইচ্ছায়, তার সাহায্যে, জনগণের ভালোবাসায়, জনগণের ভোটে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়েই দেশ চালাতে চাই। আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না, ঐক্যের বাংলাদেশ চাই।”
জামায়াতের আমির বলেন, “চাঁদার জ্বালায় অতিষ্ঠ জনগণ। এই চাঁদার কারণেই কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। চাঁদাবাজরা মাঝখানে ভাগ বসিয়ে দেয়। এর ভার গিয়ে পড়ছে জনগণের ঘাড়ে। আমরা শহীদদের আকাঙক্ষা বাস্তবায়নে, আমরা তাদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব পালনে আমরা দেশবাসীকে কথা দিচ্ছি, আমরা চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব, ইনশাআল্লাহ। এর প্রমাণ— আমরা মজলুম একটা দল, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটা দল। আপনারা বলতে পারবেন, জামায়াতে ইসলামীর কেউ কারো কাছে গিয়ে চাঁদা চেয়েছে? যারা এত নির্যাতিত হওয়ার পরেও নিজেদের হাত পরিচ্ছন্ন রাখতে পেরেছে, তাদের হাতেই আগামীর পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি বগুড়াবাসীর উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম হিংসার কবলে পড়ে গেছে। তাই, এখানে আর খেলা হয় না। আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, জামায়াতে ইসলামী দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলে মর্যাদার সাথে চান্দু স্টেডিয়ামকে আবার জীবন দেওয়া হবে। আবার আন্তর্জাতিক খেলা এখানে হবে, ইনশাআল্লাহ।”
বগুড়া উত্তরবঙ্গের রাজধানী, এ কথা উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, “আমরা যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ পাই, এই বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করব। বহু জায়গায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। আজও বগুড়ায় একটা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠল না। আল্লাহ যদি আমাদের সেই সুযোগ দেন, এটাও আমরা বাস্তবায়ন করব। মোটাদাগে এই বিষয়গুলোর পাশাপাশি যমুনার দ্বিতীয় সেতু, এটা বগুড়াবাসীর দাবি। এটা পাশের গাইবান্ধারও দাবি। আমরা এটা বাস্তবায়ন করব। এটা কোনো দয়ার দান নয়। জামায়াতে ইসলামী দলীয় তহবিল দিবে না। এটা আপনাদের যে টাকা, সেই টাকা দিয়ে বাস্তবায়ন হবে। আপনারা বলবেন, আমাদের টাকা? হ্যাঁ, আপনাদেরই তো টাকা। আপনাদের টাকা আপনারা ঝুলিতে রাখতেছেন, ঝুলির তলা না থাকায় সেই টাকা বের হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা সাড়ে ১৫ বছরে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করব, পেটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে সেই টাকা কিভাবে বের করে আনা যায়। এটা জনগণের টাকা। জনগণের জন্য উন্নয়ন খাতে এটা এসে যুক্ত হবে, ইনশাআল্লাহ।”
তিনি বলেন, “মায়েদের ইজ্জতের মূল্য আমাদের জীবনের চেয়ে বেশি। মায়েদের অপমান আমরা বরদাশত করব না। কোনো লম্পটের জায়গা বাংলাদেশে হবে না। এই ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স। এই মায়েরা ঘরে থাকবে সম্মানে, নিরাপদে। রাস্তায় বের হলে সম্মানে নিরাপদে চলাচলের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা করা সরকারের অঙ্গীকার এবং দায়িত্ব। দেশ গড়ার কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অবদান রাখবে, ইনশাআল্লাহ। নবী করিম (সা.) নারীদের যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধা হিসেবে নিয়ে গেছেন। সেবার জন্য নিয়ে গেছেন। নবী করিম (সা.) যদি এমন কঠিন কাজে মহিলাদের সম্পৃক্ত করে সম্মানিত করে থাকেন, তাহলে আমি কে তাদেরকে কর্মক্ষেত্র থেকে বিরত রাখার? সুতরাং, যাদের মেধা ও যোগ্যতা আছে, তাদের জন্য সম্মানজনক জায়গা তৈরি করে দেওয়া হবে।”
বক্তব্য শেষে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বগুড়ার সব আসনে দলের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।
বগুড়া জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হকের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, বগুড়ার ৭টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।
ঢাকা/এনাম/রফিক