ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১৮ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ৪ ১৪৩৩ || ৩ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা, পরে মিলল উপহার 

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৫৩, ১৮ জুন ২০২৬  
পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা, পরে মিলল উপহার 

আবিরকে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের পক্ষ থেকে একটি আসল পতাকা, ফুটবল ও জার্সি উপহার দেওয়া হয়েছে

ফুটবল জ্বরে কাপছে গোটা বিশ্ব। বিশ্বকাপ শুরুর পর বাংলাদেশের শহর-গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে উন্মাদনা। প্রিয় দলের পতাকা শোভা পাচ্ছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ভবনের ছাদে৷ তবে, ব্যতিক্রমী এক ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহে। টাকার অভাবে পতাকা কিনতে না পেরে পলিথিন দিয়ে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়েছে শিশু আবির হোসেন (১১)।

‎আবির হোসেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামের আলিউল ইসলামের ছেলে ও উজির আলী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

‎ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পরে আবিরের প্রতিবেশী, বন্ধু ও সহপাঠীরা তাদের প্রিয় দলের পতাকা কিনে বাড়িতে টাঙায়। তবে, আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় আবির পতাকা ও জার্সি কিনতে পারেনি। পরে সে বাড়ির পাশে পড়ে থাকা পলিথিন কুড়িয়ে সুতা দিয়ে সেলাই করে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে নিজ হাতে পতাকা বানায়। সেই পতাকা তার বাড়ির সামনে টাঙিয়ে রাখে আবির।

‎স্থানীয় এক আর্জেন্টিনা সমর্থক বিষয়টি দেখে ঝিনাইদহের আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানায়৷ বুধবার বিকেলে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন, জিকু হাসান, শাহজাহান নবীন ও সামিউল হক সামিসহ ক্লাবের কয়েকজন সদস্য আবিরের বাড়িতে উপস্থিত হন।

‎তারা আবিরকে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের পক্ষ থেকে একটি আসল পতাকা, ফুটবল ও জার্সি উপহার দেন। আসল জার্সি, পতাকা ও ফুটবল পেয়ে খুশিতে কান্নায় ভেঙে পড়ে আবির। এ সময় উপস্থিত সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

‎আবিরের প্রতিবেশীরা জানান, গ্রামে বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা নিজ নিজ দলের পতাকা উড়িয়েছে। আবির আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির সমর্থক। পড়াশোনায় মনোযোগী আবির খেলাধুলাতেও পারদর্শী। তবে, টাকার অভাবে সে আসল পতাকা কিনতে না পেরে পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়েছে। সেই পতাকা বাঁশের কঞ্চিতে বেঁধে বাড়ির উঠোনে টাঙিয়ে রাখে আবির।

‎আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম ঝিনাইদহ শহরে একটি গ্রিল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে আলিউল ইসলামের অভাব-অনটনের সংসার৷ তাই, ছেলের আবদার তিনি মেটাতে পারেননি।

‎আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম বলেন, “বিশ্বকাপ শুরুর পর আমার ছেলে একটা জার্সি আর পতাকার জন্য বায়না ধরে। কিন্তু, আমরা গরিব মানুষ, সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাই, পতাকা ও জার্সি কেনা সম্ভব হয়নি। আমার ছেলে পড়াশোনায় ও খেলাধুলায় খুব আগ্রহী।”

‎তিনি আরো বলেন, “আজ শহরের কয়েকজন ভাই এসে আমার ছেলেকে আর্জেন্টিনার জার্সি, ফুটবল ও পতাকা দিয়ে গেছে। আমার ছেলেটা খুব খুশি। সারা রাত জার্সি পরে ফুটবল বিছানায় নিয়ে ঘুমিয়েছে। আমার ছেলের খুশিতে আমার পরিবারের সবাই খুশি। যারা আমার সন্তানের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, তাদের জন্য অনেক দোয়া করি।”

‎স্থানীয় বাসিন্দা খালিদ হাসান জীবন বলেন, “আবির একটি পতাকা কিনতে না পেরে নিজেই পলিথিন দিয়ে পতাকা বানিয়েছে। এ কথা শুনে বিষয়টি আমি মঙ্গলবার রাতে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের সদস্যদের জানাই। পরদিন বুধবার বিকেলে তারা আবিরের বাড়িতে এসে উপহারগুলো পৌঁছে দেন।”

‎নতুন জার্সি ও পতাকা পেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবির বলে, “আমি মেসির ভক্ত৷ মেসির খেলা আমার খুব ভালো লাগে। মেসির খেলা দেখেই আমি আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। আব্বুকে বলেছিলাম, মেসির ১০ নম্বর জার্সি কিনে দিতে, একটা আর্জেন্টিনার পতাকা কিনে দিতে। কিন্তু, টাকা নেই বলে আব্বু কিনে দিতে পারেনি। তাই, বাড়ির পাশে ময়লার ভাগাড়ে পড়ে থাকা পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়ে উঠোনে টাঙিয়ে দিই।”

‎আবির আরো বলে, “আমি নতুন জার্সি, ফুটবল ও পতাকা পেয়েছি৷ কয়েকজন আঙ্কেল ও ভাই আমাকে উপহারগুলো দিয়েছেন। আমি খুব খুশি। আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বকাপ জিতবে, ইনশাআল্লাহ। মেসিই কাপ পাবে।” এসব কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে আবির।

‎আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন শাহজাহান নবীন বলেন, “শিশুটির ফুটবলের প্রতি যে আবেগ, তা আমাদের অবাক করেছে। খবর পাওয়ামাত্রই আমরা আমাদের সাধ্যমতো আবিরের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছি। কেবল ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সূদুর আর্জেন্টিনা ও মেসির প্রতি তার যে সমর্থন ও ভালোবাসা দেখিয়েছে, তা আমাদের মুগ্ধ করেছে। মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল গেমসের আগ্রাসনের এই যুগে আবিরের মতো শিশুরাই সুন্দর আগামীর দৃষ্টান্ত।”

‎ক্লাবের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন বলেন, “ছোট্ট শিশুটির ভালোবাসা ও আবেগ আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সেই ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতেই আমরা ওর জন্য সামান্য কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম। ওর হাসিমুখ দেখে আমরাও আবেগ ধরে রাখতে পারিনি।”

ঢাকা/সোহাগ/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়