ঢাবির কলাভবন: ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী
ই এম সৌরভ, ঢাবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
সকালবেলার নরম রোদ যখন অপরাজেয় বাংলার ওপর দিয়ে ঠিকরে পড়ে কলাভবনের দেয়ালে, তখন চারপাশ যেন এক মায়াবী আবহে ভরে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এই ভবনটি কেবল শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত মহাফেজখানা। তবে এই ভবনের ইতিহাস একরৈখিক নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ ও অবস্থান বদলেছে। বর্তমান আধুনিক স্থাপনার আগে কলা অনুষদের প্রাণকেন্দ্র ছিল অন্য এক প্রাঙ্গণ, যা আজ ‘পুরাতন কলাভবন’ নামে ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
শুরুর সেই লাল দালান
১৯২১ সালের ১ জুলাই রমনা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলে এর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র ছিল বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন। ভিক্টোরীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত লাল ইটের সেই বিশাল ভবনটিই ছিল তৎকালীন কলাভবন। ব্রিটিশ আমলের গাম্ভীর্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভবনের বারান্দায় একসময় হেঁটে বেড়িয়েছেন সত্যেন বোস কিংবা জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা।
পুরাতন কলাভবন শুধু শিক্ষার কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল বাঙালির দ্রোহ ও প্রতিবাদের সূতিকাগারও। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় এই ভবনের পাশেই ছিল ঐতিহাসিক ‘আমতলা’। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে মিছিল বের হয়েছিল, তার পরিকল্পনা ও স্লোগান নির্ধারণ হয়েছিল এই পুরাতন কলাভবন প্রাঙ্গণেই। বর্তমান মেডিকেল কলেজ গেট সংলগ্ন সেই আমতলা আজও সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
দেশভাগের পর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনেও হাসপাতালের পরিধি বাড়ানোর দরকার পড়ে। তখনই নতুন কলাভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
আধুনিক স্থাপত্যে বর্তমান কলাভবন
ষাটের দশকের শুরুতে নীলক্ষেত এলাকায় বর্তমান কলাভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং এ এস এম ইসমাইলের নকশায় গড়ে ওঠে এই ভবন। পুরোনো ভবনের ব্রিটিশ ধাঁচের গাম্ভীর্য পেরিয়ে নতুন ভবনটি হয়ে ওঠে উন্মুক্ত, আলো-বাতাসপূর্ণ এবং আধুনিক মননের প্রতীক।
ল্যুভারযুক্ত বারান্দা ও প্রশস্ত করিডোর ভবনটিকে শুধু রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দেয় না, বরং শিক্ষার্থীদের জন্য এক মুক্ত ও উদার পরিবেশও তৈরি করে। ১৯৬৩–৬৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি এখানে স্থানান্তরিত হলে এটি দ্রুতই মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এই ভবনের বারান্দায় আজও যেন শোনা যায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক কিংবা আহমদ শরীফদের গম্ভীর আলোচনার প্রতিধ্বনি। বর্তমানে সতেরোটি বিভাগ এবং হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এই ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের প্রতীক।
আন্দোলন ও স্বাধীনতার স্মৃতি
পুরাতন কলাভবন যেমন ভাষা আন্দোলনের সাক্ষী, তেমনি বর্তমান কলাভবন স্বাধীনতার সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ পাকিস্তানি শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই কলাভবনের সামনের বটতলায় প্রথম উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা।
এর কিছুদিন পর ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই এলাকাতেও হামলা চালায়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে আজ কলাভবনের সামনে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্য, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বীরত্ব ও স্বাধীনতার ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
কলাভবনের বিভিন্ন বিভাগের পাঠ্যক্রম কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দর্শনও দেয়। বাংলা বিভাগের সেমিনারে যখন জীবনানন্দ নিয়ে আলোচনা হয় বা দর্শন বিভাগে প্লেটো-অ্যারিস্টটল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলে, তখন বাইরের কোলাহল যেন থেমে যায়।
এই ভবনের করিডোরজুড়ে থাকা ম্যুরাল ও শিল্পকর্ম বাঙালির সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বটতলা কিংবা ক্যাফেটেরিয়া শুধু আড্ডার জায়গা নয়, বরং বহু সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবেও পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আজগারুল ইসলাম বলেন, “পুরাতন কলাভবন বা বর্তমান ঢাকা মেডিকেল ভবনের সামনে দিয়ে হাঁটলে ভাষা আন্দোলনের মিছিলের শব্দ যেন কানে বাজে। আবার বর্তমান কলাভবনের অপরাজেয় বাংলার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় এই চত্বরই তো আমাদের স্বাধীনতার প্রথম পতাকা দেখেছিল। আমাদের কাছে কলাভবন শুধু একটি দালান নয়; এটি জীবন্ত ইতিহাস।”
আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইয়েদুজ্জামান নূর আলভী বলেন, “বর্তমান কলাভবনের স্থাপত্য আমাকে মুগ্ধ করে। মাজহারুল ইসলামের ল্যুভার দেওয়া বারান্দা দিয়ে বিকেলের আলো যখন ক্লাসরুমে পড়ে, তখন পড়াশোনার পরিবেশটাই বদলে যায়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায় বসার জায়গায় কিছুটা সংকট থাকলেও বটতলার আড্ডা আর ক্যাফেটেরিয়ার চা ছাড়া ছাত্রজীবন অসম্পূর্ণ।”
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী মামুন হাসান বলেন, “অনেকে মনে করেন কলাভবনে শুধু তাত্ত্বিক পড়াশোনা হয়। কিন্তু, এখনকার সিলেবাস অনেক বেশি সময়োপযোগী। আমাদের সেমিনার লাইব্রেরিগুলো গবেষণার জন্য দারুণ পরিবেশ তৈরি করে। আমরা চাই পুরাতন কলাভবনের ঐতিহ্যও নতুন প্রজন্মের কাছে আরো বেশি তুলে ধরা হোক।”
ইতিহাসের অমোঘ সেতু
পুরাতন কলাভবন আমাদের শিখিয়েছে প্রতিবাদের সাহস, আর বর্তমান কলাভবন দিচ্ছে মুক্তচিন্তা ও বিশ্বনাগরিক হওয়ার শক্তি। লাল ইটের সেই পুরোনো স্থাপত্য থেকে আধুনিক উন্মুক্ত ভবনে রূপান্তর, এই পুরো যাত্রাপথ আসলে বাঙালির চেতনারই বিবর্তন।
শত বছর পেরিয়েও কলাভবন আজও তার আপন মহিমায় দীপ্যমান, যেখানে অতীতের সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন একই সেতুবন্ধনে মিলেমিশে আছে।
ঢাকা/সৌরভ/জান্নাত