ঢাকা     রোববার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ||  অগ্রহায়ণ ২০ ১৪২৯ ||  ০৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪১৪

ফ্ল্যাটের মালিকানা দ্বন্দ্বে ‘চুরির মামলা’

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫৪, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২  
ফ্ল্যাটের মালিকানা দ্বন্দ্বে ‘চুরির মামলা’

যে ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব

ঢাকার সাভারে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সাবেক এক সেনাসদস্যকে মিথ্যা চুরির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এঘটনায় ভুক্তভোগীর স্ত্রী, ফ্ল্যাটের অন্যান্য মালিক ও এলাকাবাসী সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, মামলার বাদীর সাথে পুলিশ কর্মকর্তার সখ্যতা থাকায় মিথ্যা চুরির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। 

শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এসব অভিযোগ করেন গ্রেপ্তার রাজু আহম্মেদের স্ত্রী আসমা আহম্মেদ। তাকেসহ অজ্ঞাত ৭-৮ জনকেও এই মামলার আসামি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

গত মঙ্গলবার রাতে আশুলিয়ার দক্ষিণ গাজীরচট এলাকা থেকে আটক করা হয় রাজু আহম্মেদকে। পরদিন বুধবার আশুলিয়া থানায় মামলা দায়েরের পর তাকে আদালতে পাঠানো হয়।

রাজুর স্ত্রী আসমা আহম্মেদ বলেন, গাজীরচট এলাকার চতুর্থ তলায় আমার একটি ফ্ল্যাট আছে। তখন আমাদের এক শেয়ারমেট (দুলাল ও তার স্ত্রী আছমা) এটি কিনবে বলেছিল। সম্পর্ক ভালো থাকায় ১০ হাজার টাকায় তার সাথে ফ্ল্যাটটি মৌখিক বায়না করি। তখন আমার স্বামীর চাকরির সুবাদে আমরা রামু ক্যান্টনমেন্টে ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে ফ্ল্যাটের সাত লাখ টাকা না দিয়ে দুলাল-আছমা দম্পতি ফ্ল্যাটের ভেতরে গোপনে নির্মাণকাজ করে যাচ্ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আমি প্রতিবাদ করতে গেলেই আমাদের মারধর করতে আসেন ওনারা। অনেকবার থানায় গেলেও পুলিশ কোনও মামলা নেয়নি। স্থানীয়ভাবে মীমাংসার জন্য ওনাদের ডাকা হলেও তারা বসেনি। পরবর্তীতে আমরা ফ্ল্যাটটি অন্যজনের কাছে রেজিস্ট্রির মাধ্যমে বিক্রি করি। 

আসমা অভিযোগ করেন, এ ঘটনার জের ধরে বুধবার তারা জোরপূর্বক ফ্ল্যাট দখল করতে আসলে আমাদের সাথে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে দুলালের স্ত্রী থানায় ফোন করে পুলিশ ডেকে আনেন। তখন আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় এসআই মিলন ফকির। পরে মিথ্যা চুরি, জখম, ভাঙচুরের মামলা দায়ের করেন দুলালের স্ত্রী আছমা। মূলত থানার ওসি জিয়া ও আছমার বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। সখ্যতার কারণে ওসি সাহেব ওই মহিলার পক্ষ নিয়ে মিথ্যা মামলায় আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে। 

ফ্ল্যাটের আরেক মালিক সাবেক সেনাসদস্য গোলজার হোসেন বলেন, আমরা আট জন সেনাসদস্য নিজেদের জমানো অর্থ দিয়ে চারতলা এই বাড়িটি নির্মাণ করেছি। পুরো বাড়ি আমার তত্ত্বাবধানেই হয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সব অংশীদারদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চারতলার দুলাল-আছমা দম্পতি জোর করে নিচের একটি দোকান ও নিচতলার আরেকটি ফ্ল্যাট দখল করে ভাড়া আদায় করছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে নানা ধরনের হুমকি দিয়ে আসছেন। এমনকি এলাকাভিত্তিক মীমাংসার জন্য বসা হলে সেখানে দুলাল ও তার ছেলে লোকজন ভাড়া করে এনে আমাদের মারধর করে। থানায় গিয়েও এর কোনও প্রতিকার পাইনি।

তিনি আরও বলেন, তখন ওসি জিয়া মামলা না নিয়ে আমাদের বলেন, সব মিটমাট করে ফেলেন। পরে আমরা জানতে পারলাম, ওসি জিয়ার গ্রামে নাকি আছমা-দুলাল দম্পতির বাড়ি। পক্ষ নিয়ে তখনও আমাদের সাথে উনি খারাপ আচরণ করেছেন। ওসি জিয়ার ক্ষমতার বলে তারা ফ্ল্যাটের অন্য কোনও মালিককে পরোয়া করেন না। একই কারণে রাজু আহমেদকেও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে তারা। এখানে মামলা দেওয়ার কোনও কারণ দেখি না আমরা। কারণ এখানে কোনও মারামারি, চুরির ঘটনা ঘটেনি।

ফ্ল্যাটের আরেক মালিক সাবেক সেনাসদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, পুলিশ দিয়ে রাজুকে হয়রানি করছে দুলাল ও আছমা দম্পতি। পুলিশ দিয়ে ফ্ল্যাটটি জবরদখল করে রাখছে।

আশুলিয়া থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক জামাল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার জন্য ডাকা হলেও দুলাল-আছমা দম্পতি আসেননি। এখন তারা পুলিশের প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে ফ্ল্যাট দখল করেছেন। পুলিশ একতরফাভাবে দুলাল-আছমা দম্পতির পক্ষে কাজ করেছে। পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এটাই সবার কাম্য।

মিথ্যা মামলা দায়েরের বিষয়ে আছমা সুলতানা বলেন, উনারা ফ্ল্যাটে ঢুকে আমার স্বামী, ছেলে-মেয়েসহ আমাকে রড, লাঠি দিয়ে মারধর করেছে। স্বর্ণ, টাকা নিয়ে গেছে। তাই মামলা করেছি। করোনাকালে ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছি। বিশ্বাসের জায়গা থেকে কোনও স্ট্যাম্প কিংবা ডিডে লিখিত ডকুমেন্ট রাখিনি। এটাই আমাদের ভুল হইছে।

আপনাদের রড, লাঠি দিয়ে মারধরের একদিন পার হলেও কেন হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি- এর কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।  

পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলামের সাথে কোন সখ্যতা আছে কিনা এমন প্রশ্নে আছমা বেগমের স্বামী দুলাল হোসেন বলেন, আমার বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা। আর তার বাসা ময়মনসিংহে, এতটুকুই। 

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘এটা ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব। চেয়ারম্যান বলেছিলেন মীমাংসা করে দেবে। কিন্তু ওরা (রাজু আহম্মেদ) শোনেনি। দিনেদুপুরে লোকজন নিয়ে মহিলার (বাদীর) ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে দিছে।’

ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বে মিথ্যা মামলা দিয়ে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ দিলেই তো হলো না। ওইটা তো আমরা তদন্ত করে যেটা প্রমাণ হবে ওইটাই তো হবে। মামলার তো আর চার্জশিট হয় নাই। অভিযোগ তো অনেকে অনেক কিছু দেয়। কিন্তু তদন্ত সাপেক্ষে আমরা তো অনেক কিছু পাই, অনেক কিছু দেই। প্রাথমিক তদন্তে তো দুই গ্রুপের মারামারির খবর পেয়েছি। ঘরে গিয়া তালা মাইরা দিছে। তখন গিয়া ওনাকে (রাজু আহম্মেদ) আনা হইছে।’

বাদীর সাথে সখ্যতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘না না। বাড়তি সুবিধা পেলে তো অনেক আগেই পেতো। এতদিন কেন সে বাড়তি সুবিধা পায় নাই?’

আরিফুল/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়