ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ কার্তিক ১৪২৬, ১৪ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কবিতা যার বাণী চিরন্তনী

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-১২ ১১:৩২:৪৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-১২ ১১:৩২:৪৭ এএম

‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে/ সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’

এমন সুন্দর কবিতার চরণ আজ সবার মুখেই বাণী চিরন্তনী’র মতো। যিনি লিখে রেখে গেছেন তার নাম কামিনী রায়। কবি কামিনী রায়ের জন্মদিন আজ। দেড় শতাব্দী আগে ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর বরিশালে জন্ম তার।

বলা যায়, এই কবির প্রায় সব কবিতার লাইনই মুখে মুখে ঘুরছে মানুষের।

যেমন-‘করিতে পারি না কাজ, সদা ভয়, সদা লাজ, / সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,/ পাছে লোকে কিছু বলে।/আড়ালে আড়ালে থাকি, নীরবে আপনা ঢাকি/ সম্মুখ চরণ নাহি চলে,/ পাছে লোকে কিছু বলে।’

আবার- ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলই দাও/ তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

আবার- ‘নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ? এ ধরা কি শুধু বিষাদময়। যাতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে, কেবলি কি নর জনম লয়।’

আবার- ‘যেই দিন ও চরণে ডালি দিনু এ জীবন/হাসি অশ্রু সেইদিন করিয়াছি বিসর্জ্জন।/হাসিবার কাঁদিবার অবসর নাহি আর, / দুঃখিনী জনমভূমি মা আমার, মা আমার।

আবার- ‘বর্তিকা লইয়া হাতে    চলেছিল একসাথে/পথে নিভে গেছে আলো পড়িয়াছে তাই, / তোমরা কি দয়া করে   তুলিবে না হাত ধরে/অর্ধদন্ড তার লাগি থামিবে না ভাই? /তোমাদের বাতি দিয়া    প্রদীপ জ্বালিয়া নিয়া/তোমাদের হাত ধরি হোক অগ্রসর/পঙ্কমাঝে অন্ধকারে    ফেলে যদি যাও তারে/আঁধার রজনী তার রবে নিরন্তর।’

আবার- ‘জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি/মা, তোমারে কত ভালোবাসি! / কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।/‘এ-ত’ বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।/তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?/মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।”

অবাক করা তথ্য হচ্ছে, তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম নারী স্নাতক ডিগ্রিধারী। তিনি একসময় যে ছদ্মনামে লিখতেন তা-ও মজার ‘জনৈক বঙ্গমহিলা’।

১৮৮০ সালে কলকাতা বেথুন স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) ও ১৮৮৩ সালে এফএ বা ফার্স্ট আর্টস (উচ্চমাধ্যমিক সমমানের) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ থেকেই ১৮৮৬ সালে ভারতের প্রথম নারী হিসেবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি বেথুন কলেজের স্কুল বিভাগে শিক্ষয়িত্রীর পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি ওই কলেজে অধ্যাপনাও করেছিলেন।

যে যুগে মেয়েদের শিক্ষাও বিরল ঘটনা ছিল, সেই সময়ে কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তার অনেক প্রবন্ধেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি নারী শ্রম তদন্ত কমিশন (১৯২২-২৩) এর সদস্য ছিলেন।

মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে তিনি কবিতা লিখতেন। ১৫ বছর বয়সে তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ সালে। এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু প্রথমে এতে গ্রন্থকর্ত্রী হিসেবে কামিনী রায়ের নাম প্রকাশিত হয়নি।

তার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- আলো ও ছায়া (১৮৮৯), নির্মাল্য (১৮৯১), পৌরাণিকী (১৮৯৭), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), অশোক সঙ্গীত (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪), অম্বা (নাট্যকাব্য, ১৯১৫), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), জীবন পথে (১৯৩০), অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত `মহাশ্বেতা` ও `পুণ্ডরীক` তার দুটি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ কবিতা। এ ছাড়া ১৯০৫ সালে তিনি শিশুদের জন্য ‘গুঞ্জন’ নামে কবিতা সংগ্রহ ও প্রবন্ধ গ্রন্থ রচনা করেন।

আসলে তার নাম ছিল কামিনী সেন। তার কবিতা পড়ে বিমোহিত হয়ে তাকে বিয়ে করেছিলেন কেদারনাথ রায়। সেই থেকে তিনি হয়ে যান কামিনী রায়।

শেষ জীবনে কবি ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে বাস করতেন। ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।



ঢাকা/ শাহ মতিন টিপু

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন