ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৬ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২১ ১৪২৭ ||  ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

করোনায় দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটুকু

খালেদ সাইফুল্লাহ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০০:২৫, ১৬ জুলাই ২০২০  

করোনা মহামারির প্রকোপে স্থবির বিশ্ব। তথ্যের অবাধ প্রবাহের ফলে অসত্য তথ্য এই ক্রান্তিকালে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে মানসিক অস্থিরতা। ভুল তথ্যে বিশ্বাস করে মানুষ অদ্ভুত এবং অবৈজ্ঞানিক আচরণ করছে। জনমনে জন্ম নিচ্ছে বিভিন্ন প্রশ্ন। সব প্রশ্নের উত্তরও সহজে মিলছে না। যেমন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে কিনা? চলুন জেনে নেওয়া যাক- গবেষণা কী বলে?

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার পর পরিত্রাণের উপায় হলো দেহের ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরোধী ব্যবস্থার সক্রিয়তার মাধ্যমে শরীরের আক্রান্ত সেল বা কোষগুলোকে নষ্ট করে ফেলা। ইমিউন সিস্টেম একটি শারীরিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বাইরে থেকে অনাকাঙ্খিত কিছু দেহাভ্যন্তরে প্রবেশ করামাত্র ইমিউন সিস্টেম সাড়া দেয় এবং দ্রুত জীবাণু শরীর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রায় সময়ই এই প্রাথমিক ধাপে ইমিউন সিস্টেম করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে না। ফলে আরো জটিল উপায়ে তাকে করোনার বিরুদ্ধে লড়তে হয়।

ভাইরাসকে প্রতিরোধের জন্য শরীরে অ্যান্টিবডি নামক প্রোটিন তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি এবং টি সেল ভাইরাসে আক্রান্ত কোষগুলো নষ্ট করে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় সেলুলার রেসপন্স সিস্টেম। তবে মানবদেহে করোনার অ্যান্টিবডি কতদিনে তৈরি হবে এ বিষয়ে গবেষকরা এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলেননি।  একটি গবেষণায় দেখা গেছে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে কারো শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, আবার কারো শরীরে সময় লেগেছে তিন সপ্তাহ।

অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার পর শরীরে শক্ত ইমিউন সিস্টেম তৈরি হয়। এটি এমন একটি মেমোরি যা পরবর্তী সময়ে একই ভাইরাসের উপস্থিতি বুঝতে পারলেই তার বিরুদ্ধে সাড়া দেয়। লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষকরা অ্যান্টিবডির উপস্থিতি আছে এমন ৯৬ জন ব্যক্তির উপর গবেষণা চালিয়েছেন। তারা দেখেছেন, যেসব আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে লক্ষণগুলো প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা তত বেশি সক্রিয় এবং এই প্রতিরোধী কোষগুলোর মেমোরিও শক্তিশালী। তবে যেসব আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে উপসর্গগুলো প্রকট হয়নি তাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল এবং তার মেমোরির সংবেদনশীলতাও কম। তবে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়া এবং না-পাওয়া করোনায় আক্রান্ত উভয় ব্যক্তির শরীরেই টি-সেল এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

ইমিউন সিস্টেমের মেমোরিও মানুষের মতো। কিছু ঘটনা জীবনব্যাপী মনে থাকে, আবার কিছু দ্রুত ভুলে যায়। তেমনি প্রকারভেদে করোনাভাইরাসের সংক্রমণও এই মেমোরি সব সময় মনে রাখতে পারে না। সার্স এবং মার্স ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার কয়েক বছর পরও শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে অ্যন্টিবডির স্থায়িত্ব কতদিন হবে তা পরীক্ষা করার মতো এখনও যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়নি। ১৭৭ জন ব্যক্তির উপর করা ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের একটি গবেষণায় করোনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরির ২ মাস পরও দেহে অ্যান্টিবডির অবস্থান শনাক্ত হয়েছে। যাদের শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে গবেষণা চলাকালীন তাদের অ্যান্টিবডির মাত্রা অপরিবর্তনীয় ছিলো। তবে এটির স্থায়িত্ব কতকাল হবে তা এখনো গবেষকদের অজানা।

ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার মেডিসিন-এর অধ্যাপক পল হান্টার বলেন, ‘এটি সারাজীবন মানুষকে সুরক্ষা দেবে না। তবে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও একই গোত্রীয় করোনাভাইরাস সার্সের অ্যান্টিবডি গবেষণা থেকে বলা যায়, এটি ১ বা ২ বছর মানবদেহে অবস্থান করতে পারে। এরপর আর কাজ নাও করতে পারে।’

এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, একবার আক্রান্ত হলে দ্বিতীয়বার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে একবার আক্রান্ত হওয়ার পর কমপক্ষে কতদিন সুরক্ষিত থাকা যাবে তার নির্দিষ্ট কোনো সময় গবেষকরা বের করতে পারেননি। মহামারিরূপে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রথমদিকে বেশ কিছু দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও বিজ্ঞানীদের দাবি- প্রথমবার আক্রান্ত রোগীরা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় পুনরায় ভাইরাস তাদের শরীরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে বানরের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে, শরীরে ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হওয়ার তিন সপ্তাহ পর পুনরায় তারা আক্রান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি।

তবে শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি থাকা মানেই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে একেবারে নিরাপদ থাকা নয়। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বিভিন্নজনের শরীরে অ্যান্টিবডি উৎপাদনের মাত্রা ভিন্ন। ১৭৫ জন ব্যক্তির উপর করা চীনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রা খুব সামান্য। ফলে তাদের দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই গবেষকরা মনে করেন, যতদিন না ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে, ততদিন এই প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার উপর ভরসা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। যদিও এই প্রাকৃতিক প্রতিরোধী ব্যবস্থাও অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

 

তথ্যসূত্র: বিবিসি, গার্ডিয়ান, ফোর্বস, ওয়াল স্ট্রিট, সায়েন্স ফোকাস

 

ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়