ঢাকা     রোববার   ১৪ জুলাই ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩০ ১৪৩১

এভাবেও মানুষকে আপন করে নেয়া যায়!

হৃদয় তালুকদার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:৩১, ১৩ জুন ২০২৪   আপডেট: ১২:৩১, ১৫ জুন ২০২৪
এভাবেও মানুষকে আপন করে নেয়া যায়!

গৃহকর্মীর বিদায় সংবর্ধনা

খবরের কাগজে ‘গৃহকর্মী’ সম্পর্কিত সংবাদ আমরা যতটা পাই, তার প্রায় সবই আমাদের মানবিকতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বিশেষ করে, গৃহস্বামী কর্তৃক গৃহকর্মীকে নির্যাতনের সংবাদ যে কোনো মানুষকেই বিচলিত করে। তবে এর ব্যতিক্রম যে ঘটে না তা নয়। কালে-ভদ্রে ঘটা ইতিবাচক সেই সংবাদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— এখনও মানুষ আছে, এ শহরে এখনও প্রাণ আছে। তেমনই একটি ঘটনা প্রশংসিত হচ্ছে সংবাদপত্রসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

‘গৃহকর্মীর বিদায় সংবর্ধনা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রশংসিত হয়েছেন কামরুন নাহার। তিনি রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যাপক। অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে গত ১২ মে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিনি। 

রাজধানীর গ্রিনরোডে কামরুন নাহারের শ্বশুরবাড়িতে ৩৬ বছর আগে কাজ করতে আসেন আনোয়ারা বেগম (হোকন)। কামরুন নাহারের শাশুড়ী অসুস্থ থাকায় সে সময় ঘরের কাজে সহযোগিতার জন্য তাকে আনা হয়। স্নাতক পড়ুয়া কামরুন নাহার তখন সদ্য ২য় সন্তানের মা। এরপর নদীর জল অনেক গড়িয়েছে। আনোয়ারা বেগম ধীরে ধীরে পরিবারের একজন হয়ে উঠেছেন। জড়িয়েছেন মায়ার বন্ধনে। তিনি আর কখনও বাড়ি ফিরে যেতে চাননি। 

কামরুন নাহারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আনোয়ারার জন্ম সম্ভবত ভারতে। তিনি বাংলাদেশে আসেন এক পরিবারের মাধ্যমে। তিনি স্বামী পরিত্যাক্তা এবং কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ায় সমাজে ছিলেন অবজ্ঞার পাত্র।  

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংসারে আনোয়ারা বেগমের প্রয়োজনিয়তা, অবদান স্মরণ করে প্রশংসাসূচক একটি পোস্ট দেন তাহসিনা আফরিন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা এবং  কামরুন নাহারের মেয়ে। তাহসিনা আফরিন লিখেছেন : ‘ছোটবেলায় বুঝ হবার পর থেকে জেনেছি আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৭ জন। বাবা মা ভাই বোন দাদু আর বুয়া।  আমাদের বুয়া।... বুয়া ছিলেন কিছুটা বুদ্ধিতে খাটো এবং খেয়ালি। নানা কারণে স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেছিল, একটা মেয়ে ছিল তাকেও পালক দিয়ে দিয়েছিল। ফলে তিনি ছিলেন একা। ... বড় হতে হতে বুঝেছি, আমাদের বাসায় আসলে বুয়া ছিলেন একটা গুরুত্বপূর্ণ পিলারের মতন। তাই আম্মু শত সমস্যার পরেও বুয়াকে আগলে রেখেছেন। এবং এখন একজন কর্মজীবী নারী হিসেবে বুঝি, বাসায় একটা বিশ্বস্ত সহচর পাওয়া কত বড় নেয়ামত।’

আনোয়ার বেগমের যেদিন বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় সেদিন ছিল মা দিবস। কামরুন নাহার অত্যন্ত হৃদ্যতার সঙ্গে পুরো অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা করেন। আনোয়ারার ছবি দিয়ে তৈরি করা হয় ব্যানার। টেবিলে রাখা হয় কেক এবং ফুলের তোড়া। পরিবারের সব সদস্য এ সময় উপস্থিত ছিলেন।  এমনকি এ দিন আনোয়ারা বেগমের জন্য নিজ হাতে রান্না করেন কামরুন নাহার। 

খাগড়াছড়ির রামগড়ে আনোয়ারা বেগমের পরিবার বাস করেন। তারা আর্থিকভাবেও অতীতের তুলনায় এখন সচ্ছল। তারা আনোয়ারা বেগমের খোঁজখবর রাখতেন এবং চাইতেন তাদের কাছে নিয়ে রাখতে। কিন্তু আনোয়ারা বেগম যেতে চাইতেন না। এভাবে শেষ দশ বছর আনোয়ারা বেগম নিজের আগ্রহেই থেকেছেন কামরুন নাহারের বাড়িতে। কিন্তু সব কিছুরই শেষ আছে। কামরুন নাহার জানতেন, শেষ বয়সে পরিবারই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়। আনোয়ারা বেগমকে এ সময় তার মতো করে বাকি জীবন কাটানোর উদ্যোগ নেন তিনি। তাকে পাঠিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেন। আর তার আগে করেন এই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের আয়েজন। যে আয়োজন মানুষ হিসেবে আমাদের আরো মহীয়ান করে তুলেছে। 

এখানেই শেষ নয়, আনোয়ারা বেগমের জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা পাঠাবেন বলেও জানান তারা। এ ছাড়াও যে কোন সমস্যায় তার পাশে থাকবেন কামরুন নাহারের পরিবার।

এ প্রসঙ্গে কামরুন নাহার বলেন, ‘তিনি আমাকে সব কাজেই সাহায্য করতেন। আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবেই ছিলেন তিনি। শেষ বয়সে তাকে কোনো কাজ করতে দেইনি। আমাদের আরো বুয়া আছে। তিনি সবসময় যেন ভালো থাকেন আমরা এই দোয়া করি।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আমার মেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে এটি ভাইরাল হয়ে যায়। আমরা আসলে ভাইরাল হতে এটি করিনি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে যাওয়ায় বিব্রত হচ্ছেন বলেও জানান মহীয়সী এই নারী।

/লিপি

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়