চরিত্র গঠনে মাহে রমজানের ভূমিকা
মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম
মুমিনের চরিত্র গঠনে রমজান হলো সর্বোত্তম সময়। কেননা এই মাস তাঁকে সংযম ও সাধনার অবারিত সুযোগ এনে দেয়। নেক আমলের অনুশীলনের মাধ্যমে মন্দ থেকে দূরে থাকার দীক্ষা দেয়। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়া।
আল্লহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, আল্লাহভীতি চরিত্র গঠনের প্রধান মাধ্যম। কেননা তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মূলকথা হলো সর্বদা আল্লাহ হাজির-নাজির জেনে পাপ থেকে দূরে থাকা। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে আল্লাহ আমাকে দেখছেন এবং আমার প্রতিটি কাজের হিসাব তিনি নেবেন, তার পক্ষে অন্যায় কাজে লপ্তি হওয়া সম্ভব নয়। রোজা রাখার মাধ্যমে বান্দার অন্তরে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়।
রমজান মাসে মুমিন তাঁর প্রধানত দুটি জৈবিক চাহিদা পরিহার করে। তা হলো খাদ্য ও পানীয়ের চাহিদা এবং যৌন চাহিদা। এই দুই চাহিদা পরিহারের মাধ্যমে সে মূলত আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করে। আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্য একজন মুমিন যখন হালাল খাবার ও বৈধ স্ত্রী পরিহার করে, তখন তার ভেতর এই ভাবনা জাগ্রত হয় যে, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হারাম উপার্জন, হারাম কাজ ও যাবতীয় হারাম সম্পর্ক পরিহার করব।
যদিও শাস্ত্রীয় অর্থে রোজা হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সঙ্গম থেকে বিরত থাকা। কিন্তু রোজার সংযম দুটি এই দুই কাজে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম এমন অপরিহার্য দুটি চাহিদা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে বান্দাকে যাবতীয় পাপাচারের ব্যাপারে সংযত হতে শেখায়।
কেউ যদি পাপ পরিহার না করে শুধু পানাহার ও স্ত্রীসঙ্গম পরিহার করে, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে তার রোজা যথার্থ বা ফলপ্রসূ নয়। এজন্য নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিত্যাগ করে না, সে ব্যক্তির পানাহার পরিত্যাগ করা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮০৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) পানাহার ত্যাগের মতো মন্দ চরিত্র, মন্দ স্বভাব ও মন্দ কাজ পরিহার করাকেও সিয়াম সাধনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেন একজন মুমিন রোজা রাখার মাধ্যমে নিজেকে চারিত্রিকগুণাবলিতে সুশোভিত করতে পারে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ রোজা রাখলে সে যেন পাপাচারে লপ্তি না হয় এবং মূর্খের মতো আচরণ না করে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৬৩)
উল্লিখিত হাদিসে পাপাচার ও মূর্খের মতো আচরণ বাক্যদ্বয়ের অর্থ ও তাৎপর্য অত্যন্ত ব্যাপক। কেননা পাপ শব্দটি আল্লাহর সব ধরনের অবাধ্যতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। চাই তা আল্লাহর অধিকার নষ্ট করার মাধ্যমে হোক, চাই তা বান্দার অধিকার নষ্ট করার মাধ্যমে হোক। আর মূর্খের মতো আচরণ বাক্যটি সব ধরনের অসামাজিকতা, অশালীনতা ও অভদ্রতাকে অন্তর্ভুক্ত করে। অর্থাৎ একজন মুমিন সিয়াম সাধনার মাধ্যমে একজন আদর্শ ও সচ্চরিত্রবান মানুষ হওয়ার সাধনা ও অনুশীলন করবে।
এখন কেউ রোজা রেখেও যদি মন্দ স্বভাব ও কাজ পরিহার না করে তবে আল্লাহর দরবারে তার রোজা নিস্ফল বলেই প্রমাণিত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যেমনটি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা-প্রতারণা ও গুনাহের কাজ ত্যাগ করে না, আল্লাহ তাআলার কাছে তার পানাহার থেকে বিরত থাকার কোনো মূল্য নেই।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৩৬২)
অন্য হাদিসে তিনি আরো স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘অনেক রোজাদার এমন আছে, যাদের রোজা পালনের সার হলো তৃষ্ঞার্ত আর ক্ষুধার্ত থাকা।’ (সুনানে তাবারানি, হাদিস : ৫৬৩৬)
বিপরীতে কোনো মুমিন যদি সিয়াম সাধনার মাধ্যমে সচ্চরিত্র গঠনে প্রয়াসী হয়, তবে আল্লাহ তাঁকে গুনাহমুক্ত হতে সাহায্য করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা পালন করবে, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০১)
অভিজ্ঞ আলেমরা বলেন, রোজা এমন ইবাদত যা বান্দাকে পাপ-পংকিলতা মুক্ত জীবন গঠনে সাহায্য করে। তাই রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দা আদর্শ মানুষ হওয়ার চষ্টো করতে পারে। হাদিসে এসেছে, ‘রোজা ঢালস্বরূপ, যতক্ষণ না তা ত্রুটিযুক্ত করা হয়।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২২৩৩)
হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেন, ‘রোজাকে ঢালস্বরূপ বলার কারণ হলো তা মানুষকে পৃথিবীতে পাপাচার থেকে রক্ষা করে এবং পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে।’ (আরবাউনান-নাবাবিয়্যা বি-তালিকি ইবনে উসাইমিন, পৃষ্ঠা ৫৫)
রোজা পাপমুক্ত হওয়ার সাধনা, চরিত্র গঠনের অনুশীলন এবং অতীত পাপের কলঙ্ক মুক্ত হওয়ার সুযোগ। তাই রমজানে কেউ যদি গুনাহ ত্যাগ করতে না পারে এবং অতীতের গুনাহ থেকে ক্ষমা না পায়, তবে তার জন্য এটা চরম দুর্ভাগ্যের। কেননা মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলোধূসরিত হোক, যে রমজান পেল এবং তার গুনাহ মাফ করার আগেই তা বিদায় নিল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৫)
আল্লাহ রমজান মাসে পাপ পরিহারের মাধ্যমে সবাই সচ্চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
ঢাকা/শাহেদ/লিপি