স্বাগতম মাহে রমজান
মুফতি আতাউর রহমান || রাইজিংবিডি.কম
মুসলমানের কাছে রমজান সাধারণ কোনো মাস নয়, বরং তাঁর জীবনে এই মাসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কেননা রমজান মানুষকে পাপমুক্ত হওয়ার এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ এনে দেয়। এ কারণেই মুমিন মাহে রমজানের আগে খুশি হয় এবং পবিত্র এই মাসকে স্বাগত জানায়। সে এই মাসকে স্বাগত জানায় আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়, দোয়া, তাওবা ও নেক আমলের প্রস্তুতির মাধ্যমে।
মুমিনের অন্তরে রমজান লাভের আকাঙ্ক্ষা সব সময় বিদ্যমান থাকে। যেমন মুআল্লা ইবনে ফদল (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) ছয় মাস রমজান লাভের জন্য দোয়া করতেন। অতঃপর ছয় মাস রমজানের আমল কবুলের দোয়া করতেন। (ইতহাফু আহলিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ২৪৪)
ইয়াহইয়া ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) দোয়া করতেন: হে আল্লাহ! আমাকে রমজান পর্যন্ত নিরাপদ করুন, হে আল্লাহ! রমজানকে আমার জন্য সংরক্ষণ করুন এবং আমার পক্ষ থেকে রমজানকে কবুল করুন। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা ৪২)
মুমিন কখনোই রমজান মাসকে ভুলে যায় না, তাই এই মাস আগমন করলে সে মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে রমজান মাসের কল্যাণ কামনা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হাসান ইবনে আলী (রা.) চাঁদ দেখে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এ মাসকে প্রাচুর্য ও জ্যোতির্ময় করুন, পুণ্য ও ক্ষমার মাধ্যম করুন। হে আল্লাহ! আপনি (এ মাসে) আপনার বান্দাদের মাঝে কল্যাণ বিতরণ করবেন, সুতরাং আপনার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য যা বণ্টন করবেন, তা আমাদেরও দান করুন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা)
রমজান মাসের আগমনে মুমিন যেমন নিজে খুশি হয়, তেমন অন্যের মাঝেও এই খুশির বার্তা পৌঁছে দেয়। হাদিসে এসেছে, রমজান আগমন করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুসংবাদ দিয়ে বলতেন, ‘তোমাদের কাছে বরকতময় মাস রমজান আগমন করল। আল্লাহ তোমাদের ওপর এই মাসের রোজা ফরজ করেছেন, এই মাসে জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়। শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে যা হাজার রাতের চেয়ে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে সত্যিই বঞ্চিত হলো।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২১০৮)
পূর্বসূরী আলেমরা বলেন, মুসলমান শুধু বাহ্যিক আনন্দ প্রকাশ ও পার্থিব প্রস্তুতির মাধ্যমে রমজান মাসকে স্বাগত জানায় না, বরং সে নিজেকে ইবাদত-বন্দেগির জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যমেও এ মাসকে স্বাগত জানায়। নিজেকে প্রস্তুত করার প্রথম স্তর হলো নিয়ত পরিশুদ্ধ করে নেওয়া। রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্যে অতিবাহিত করার প্রতিজ্ঞা করা। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) তাঁর প্রতিপালক থেকে বর্ণনা করে বলেন যে, ‘আল্লাহ ভালো-মন্দ লিখে দিয়েছেন। এরপর সেগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো সৎ কাজের ইচ্ছা করল, কিন্তু তা বাস্তবে করল না, আল্লাহ তাঁর কাছে এর জন্য পূর্ণ সওয়াব লিখবেন। আর সে ভালো কাজের ইচ্ছা করল এবং তা বাস্তবেও করল তবে আল্লাহ তাঁর কাছে তার জন্য ১০ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত এমন কি এর চেয়েও অধিক সওয়াব লিখে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৯১)
মুমিন পবিত্র রমজান মাসকে তাওবার মাধ্যমেও স্বাগত জানাবে। কেননা রমজান নিজেকে পাপমুক্ত করার মাস। তাছাড়া পাপ মানুষকে আল্লাহমুখী হতে বাধা দেয়। তাই মুমিন রমজান মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে নেবে। ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বলেন, ‘যখন তুমি রাত্রী জাগরণ (তাহাজ্জুদ) ও রোজা রাখতে সক্ষম হবে না, নিশ্চয়ই তুমি বাধাপ্রাপ্ত। গুনাহ তোমাকে আটকে ফেলেছে।’ (ইহইয়াউ উলুমুদ্দিন, পৃষ্ঠা ২৫০)
রমজান মাসকে স্বাগত জানানোর আরেকটি মাধ্যম হলো এই মাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানগুলো জেনে নেওয়া। কেননা শরিয়তের বিধান না জানলে পূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকলেও মানুষ ভুল করতে পারে। ভুলের কারণে তার রোজাসহ অন্য ইবাদতগুলো নিস্ফল হয়ে যেতে পারে।
পূর্বসূরী আলেমরা রমজান মাসে অধিক পরিমাণ তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তাহাজ্জুদ বান্দার ইবাদতের ইচ্ছা ও শক্তি বৃদ্ধি করে। তাই রমজানকে স্বাগত জানানোর একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই রাতের ইবাদাত করবে। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের নিত্য আচরণ ও প্রথা। রাতের ইবাদত আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য অর্জনের উপায়, পাপকর্মের প্রতিবন্ধক, গুনাহগুলোর প্রতিবিধান ও দেহের রোগ দূরকারী।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৯)
মুমিন যদি আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত না করে, তবে রমজানের আগমনে তার খুশি হওয়ার দাবিও মিথ্যা প্রমাণিত হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা বের হতে চাইলে তারা নিশ্চয়ই এর জন্য প্রস্তুতির ব্যবস্থা করত।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৪৬)
আল্লাহ সবাইকে রমজানের পূর্ণ ফজিলত লাভের তাওফিক দিন। আমিন।
ঢাকা/শাহেদ