এক হতভাগা ভাইয়ের করুণ কাহিনি
রাশিদা খাতুন || রাইজিংবিডি.কম
একজন মানুষ যখন সভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে পারে না, সভ্যতার নিয়মকানুন রপ্ত করতে পারে না, তখন সভ্যতা তাকে নিয়ে মশকরা করে। এতে তৈরি হয় এক করুণ চিত্র—যা অনেকের কাছে সহানুভূতির, আবার কারও কারও কাছে শুধু অজ্ঞতা আবিষ্কারের নোনতা স্বাদ। ‘হা হা হা’ শব্দে হেসে ওঠার মতো বিকৃত বয়ান তারা তৈরি করে। তাতে কি সত্য বদলায়?
এক গরিব দিদি ব্যাংকে একে একে ১৯ হাজার ৩০০ রুপি ( বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৫ হাজার ২৪ টাকা) জমিয়েছিলেন। নিজের জমানো টাকা দিয়ে হয়তো কিছু করার ইচ্ছে ছিল তার। তা আর হয়নি—তার আগেই মৃত্যু তাকে জীবনের সীমান্ত পার করে নিয়ে গেছে। দিদির মৃত্যুর দুই মাস পর ৫০ বছর বয়সী ভাই জিতু মুন্ডা উড়িষ্যার একটি গ্রামীণ ব্যাংকে গেলেন মৃত বোনের টাকা তুলতে। তিনি জানালেন, দিদি কাকরা মুন্ডার জমানো টাকাগুলো তুলতে চান।
করপোরেট পৃথিবী জিতু মুন্ডাকে নাকানি-চুবানি না খাইয়ে কি আর টাকা দেবে? তারা বলে দিল—“যাও, যার অ্যাকাউন্ট, তাকে নিয়ে আসো।” অসহায় জিতু ফিরে এলেন। ভাবতে লাগলেন, মৃত দিদিকে তিনি কীভাবে ব্যাংকে নিয়ে যাবেন। জিতু আবার ব্যাংকে গেলেন, কিন্তু টাকা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে এলেন।
গরিবের সংসারে ১৯ হাজার রুপি—সেটা অনেক! এই কয়টা টাকা পেলে সংসারের জন্য আরেকটু নুন-রুটি জোগাড় করা সহজ হয়। কয়েক দিনের জন্য খাটুনি কমে। সেসবও বাদ দিলাম, দিদির জমানো টাকা ফিরে পাওয়া তো তার অধিকার। কিন্তু জিতু মুন্ডার কথায় চিড়ে ভেজে না। ব্যাংক কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দেন, টাকা তুলতে হলে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকেই লাগবে।
একূল-ওকূল না পেয়ে জিতু মুন্ডা মৃত দিদির কবর খুঁড়ে কঙ্কাল বের করে আনেন। খোলা চোখে দেখলে কঙ্কালের ওজন খুবই কম। কিন্তু আদতে জিতু মুন্ডা দিদির কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে ছুটলেন ব্যাংকের দিকে। প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হাঁটলেন জিতু, সেই দৃশ্য দেখলো চারপাশের মানুষ। যে দৃশ্য তৈরি হলো, তা এই করপোরেট নীতি, সভ্যতা আর একজন প্রান্তিক মানুষের মধ্যকার ফাঁরাককে সামনে নিয়ে এলো। আচ্ছা, এমনও তো হতে পারত—ব্যাংকের পক্ষ থেকে ভেরিফিকেশন করা যেত!
ভূপেন হাজারিকার গানের কথা ধরে বলতে হয়—“একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না…?”
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় কঙ্কালটি আবার কবর দেওয়া হয়। পাটনা থানার পরিদর্শক কিরণ প্রসাদ সাহু স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, জিতু মুন্ডা একজন নিরক্ষর আদিবাসী মানুষ। উত্তরাধিকার বা নমিনি-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। ব্যাংক কর্মকর্তারাও তাকে টাকা তোলার সঠিক পদ্ধতি বুঝিয়ে বলতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তা (বিডিও) মানস দণ্ডপাত জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত হয়েছেন এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
পুলিশের মধ্যস্থতায় পরে বোনের কঙ্কালটি পুনরায় কবর দেওয়া হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জিতু মুন্ডাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ব্যাংক থেকে টাকা তোলার বিষয়ে তারা তাকে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেবেন।
দিদির কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে জিতুর হেঁটে যাওয়া দেখলো মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লো সেই করুণ ছবি। বিষয়টি নেটিজেনদের আলোচনায় এলো। এখন ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদে হলেও হয়তো দ্রুত দিদির জমানো রুপি হাতে পাবেন জিতু। কিন্তু এরপরেও এখানে কিংবা অন্য কোথাও, সভ্যতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অসহায় ও অপদস্ত হতে থাকবে আরও অনেক জিতু।