পানামা খাল নিয়ে চীনের প্রতিশোধমূলক আচরণের নিন্দা যুক্তরাষ্ট্রসহ ৬ দেশের
পানামা খাল অতিক্রম করার জন্য পানামা সিটিতে অপেক্ষা থাকা পণ্যবাহী জাহাজ
পানামা খালের বন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট আইনি জটিলতার জেরে চীনের ‘অর্থনৈতিক প্রতিশোধ’ ও চাপের মুখে থাকা পানামার পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। খবর আল-জাজিরার।
পানামার ওপর বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের তীব্র সমালোচনা করে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে বলিভিয়া, কোস্টা রিকা, গায়ানা, ত্রিনিদাদ ও টেবাগো এবং যুক্তরাষ্ট্র।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে পানামার সুপ্রিম কোর্ট হংকং-ভিত্তিক কনগ্লোমারেট সিকে হাচিসন-এর একটি অঙ্গসংস্থাকে দেওয়া বন্দর পরিচালনার চুক্তি বাতিল করে দেয়। আদালত জানায়, বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল টার্মিনাল পরিচালনার জন্য কয়েক দশকের পুরোনো ওই চুক্তিটি অসাংবিধানিক ছিল। এই রায়ের ফলে বন্দর দুটির নিয়ন্ত্রণ হংকং তথা চীনের হাতছাড়া হয়ে যায়।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে ছয়টি দেশ দাবি করেছে যে, আদালতের ওই রায়ের পর চীন পানামার ওপর ‘লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক অর্থনৈতিক চাপ’ সৃষ্টির মাধ্যমে পানামার পতাকাবাহী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মেরিটাইম কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চীন মার্চ মাসে পানামার পতাকাবাহী প্রায় ৭০টি জাহাজকে আটক করেছে, যা ঐতিহাসিক স্বাভাবিক সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বলেছে, “বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল টার্মিনাল নিয়ে পানামার স্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পর চীনের এই পদক্ষেপগুলো সামুদ্রিক বাণিজ্যকে রাজনীতিকরণ করার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা এবং আমাদের গোলার্ধের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।”
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ আলাদাভাবে বলেছেন যে, পানামার ওপর চীনের অর্থনৈতিক চাপে ওয়াশিংটন ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। তিনি বলেন, “আমরা পানামার পাশে আছি। পানামার সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করার যেকোনো প্রচেষ্টা আমাদের সবার জন্য হুমকি।”
চীন এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকায় তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার এবং ‘গুন্ডামি’ করার অভিযোগ তুলেছিল। অন্যদিকে, পানামার সুপ্রিম কোর্টের রায়কে চীন ‘অযৌক্তিক’ এবং ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছে।
ইউএস ফেডারেল মেরিটাইম কমিশনের প্রধান লরা ডিবেলা গত মাসে জানান, বেইজিং কর্তৃক পানামার জাহাজ আটক করার ফলে পানামা এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “এই পদক্ষেপগুলো অনানুষ্ঠানিক নির্দেশে চালানো হয়েছে এবং হাচিসন-এর বন্দর সম্পদ হস্তান্তরের পর পানামাকে শাস্তি দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে।”
সিকে হাচিসন-এর অঙ্গসংস্থা ‘পানামা পোর্টস কোম্পানি’র চুক্তি বাতিলের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো যখন পানামা খাল নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগত এই জলপথটি দখল করার হুমকি দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন যে, চীন এই খালটি ‘পরিচালনা’ করছে। তিনি এই ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এটিকে তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কেবল পানামাকে লক্ষ্য করেই নয়, চীন শিপিং জায়ান্ট মারস্ক এবং মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)-এর বিরুদ্ধেও প্রতিশোধ নিচ্ছে। কারণ সিকে হাচিসন অপসারিত হওয়ার পর এই দুটি কোম্পানির অঙ্গসংস্থাকে বালবোয়া ও ক্রিস্টোবাল টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ১৮ মাসের চুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন ফেডারেল মেরিটাইম কমিশন জানিয়েছে, চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয় মারস্ক এবং এমএসসির প্রতিনিধিদের ‘উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার’ জন্য তলব করেছে, অন্যদিকে চীনের শিপিং জায়ান্ট কসকো বালবোয়া টার্মিনালে তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
এদিকে সিকে হাচিসন তাদের অঙ্গসংস্থা পানামা পোর্টস কোম্পানির মাধ্যমে পানামা সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করছে।
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ইউএস স্টাডিজ সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড স্মিথ বলেন, পানামা খালের এই বিরোধ এবং চীনের প্রতিশোধমূলক আচরণ এটিই প্রমাণ করে যে, লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালি বা লোহিত সাগর- সবখানেই এখন শিপিং বা জাহাজ চলাচল রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, “আমরা এতদিন ধরে নিয়েছিলাম যে বিশ্বজুড়ে কন্টেইনার জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করবে। কিন্তু এখন আমরা দেখছি রাষ্ট্রগুলো জানে যে শিপিং ব্যবস্থা কতটা নাজুক। তারা জানে প্রয়োজনে তারা শিপিং রুট বা নৌপথ বন্ধ করে দিতে পারে। এখন থেকে জাহাজ বা শিপিং খাত আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়ালে আমাদের অবাক হওয়া উচিত হবে না।”
ঢাকা/ফিরোজ