স্বাস্থ্যবিধিকে ‘বুড়ো আঙুল’, করোনায় ভয়াবহ পরিস্থিতির শঙ্কা
মেসবাহ য়াযাদ || রাইজিংবিডি.কম
স্বাস্থ্যবিধি মানতে সাধারণ মানুষদের অনীহা।
করোনাভাইরাস এদেশে হানা দিয়েছে প্রায় দুবছর হতে চললো। ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে কয়েক দফা লকডাউনে সরকারের প্রধান জোর ছিলো স্বাস্থ্যবিধিতে। পরিস্থিতি সামলে এখন ধীরে ধীরে সব খুলে দিলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যেন এসব বুঝতে অপারগ! তারা স্বাস্থ্যবিধিকে অনেকটা ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছে। আর এতে সংক্রমণ বেড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত কয়েকদিন ধরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নিম্নমুখী। মৃত্যুও এক ডিজিটে নেমে এসেছে। সাধারণ মানুষের ভাবনা, হয়তো করোনা সংক্রমণ শেষের পথে। এজন্য তারা মাস্কও পরছে না। এমন দৃশ্য দেখার যেন কেউ নেই।
এদিকে হাট-বাজার, গণ-পরিবহনসহ সব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। হাল ছেড়ে না দিয়ে সরকারিভাবে এসব দেখভাল করার কথাও বলছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফরহাদ মনজুর বলেন, ‘এটা ঠিক, ক্রমে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কমছে। কিন্তু তারপরও আমাদের সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অথচ প্রায় সবখানেই সেটা উপেক্ষিত। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সাধারণ মানুষ যেন করোনাকে ভুলতে বসেছে।’
আমাদের খামখেয়ালির কারণে করোনা যেন আবারো ভয়াবহ আকারে ফিরে না আসে- এজন্য স্বাস্থ্যবিধি মানার পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
শনিবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, হাতিরপুলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতারা গায়ে গা ঘেঁষে চলছেন। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বাজার করছেন। একই দ্রব্য একাধিক ক্রেতা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছেন। দোকানিদের পাশাপাশি বাজারে আসা বেশিরভাগ ক্রেতাই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। বেশিরভাগের মুখে নেই মাস্ক। কেউ কেউ পরে এলেও তা থুতনিতে লাগিয়ে রেখেছেন।
এসব বাজারে আসা অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশিরভাই বিশ্বাস করেন করোনা এখন আর নেই। থাকলেও তার প্রভাব কম। আর সে কারণেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে আগ্রহ নেই। অনেকে আবার মাস্ক পরা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করাকে অতিরিক্ত ঝামেলাও মনে করছেন।
নিউ মার্কেটের সবজি বিক্রেতা রফিক স্বাস্থ্যবিধি ও মাস্ক পরার বিষয়ে বলেন, ‘আমার দোকানে দৈনিক ২০০-৩০০ ক্রেতা আসেন। বেশিরভাগ ক্রেতার মুখে মাস্ক থাকে না। তারা স্বাস্থ্যবিধি মানেন না।’
একই বাজারের মুদি দোকানি রাসেল মিয়া বলেন, ‘নিউ মার্কেটের কাঁচা বাজারের ভেতরে বিভিন্ন রকমের শতাধিক দোকান রয়েছে। এসব দোকানিদের বেশিরভাগই স্বাস্থ্যবিধি মানেন না। মাস্ক পরা থাকলেও তা থুতনির নিচে থাকে সর্বক্ষণ। যারা বাজার করতে আসেন, তারা মাস্ক পরার ব্যাপারে দোকানিদের কিছু বলেন না।’
বাজার করতে আসা ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, ‘বাজার তো করতেই হবে। আমার একার পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মানা না মানায় তেমন কোনো ক্ষতি নেই। আর আমি একা মেনেও লাভ নেই। বাজারে আসা বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক পরেন না, স্বাস্থ্যবিধিও মানছেন না।’
স্বাস্থ্যবিধি না মানার এই যে প্রবণতা- এর পেছনে কারণ জানতে চাইলে পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজর কমিটির সদস্য এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি না মানাটা মানুষের সহজাত স্বভাবে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে মাস্ক পরার কারণে, এখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় মানুষজন আর করোনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আবারো করোনার অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে। এই বিষয়ে আমরা সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সঠিকভাবে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছি। যে ভাবে, যে উপায়ে বোঝালে সর্বস্তরের মানুষ বুঝবে এবং মেনে চলবে, সেভাবে বোঝাতে পারিনি। করোনা এত সহজে নির্মূল হওয়ার নয়। সেটা কমবে, আবার বাড়বে। তাই সবাইকে প্রতিনিয়ত সচেতন থাকার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সবার টিকা প্রদান সম্পন্ন করতে পারলে এক সময় এর প্রভাব শেষ হয়ে যাবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, দেশে এ পর্যন্ত (৩০ অক্টোবর) করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, ২৭ হাজার ৮৬২ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১৭ হাজার ৮৪০ জন, আর নারীর সংখ্যা ১০ হাজার ২২ জন।
/এনএইচ/