সময় এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে কাজ করছে: ইরানি বিশ্লেষক
ফাইল ফটো
ইরানের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাঈদ লেইলাজ দাবি করেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার চলমান সংঘাতে সময় এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যাচ্ছে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই সংঘাতে ওয়াশিংটন কৌশলগতভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং ইরান বস্তুগত ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানি সংবাদমাধ্যম ওয়ানা।
ইরানি বিশ্লেষক আরো জানান, ইরান ‘১০০-০ ব্যবধানে হেরে যাচ্ছে না’, বরং মানবসম্পদ এবং বস্তুগত- উভয় দিক থেকেই দেশটি এগিয়ে আছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সময় গড়ানোর সাথে সাথে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়বে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক নজির অনুসরণ করে ‘অনৈতিক বা আগ্রাসী পদক্ষেপ’ নিতে পারে।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
লেইলাজের মতে, সংঘাতের ফলে ইরানে প্রায় ২০ হাজার আবাসিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এই ক্ষতিকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে স্বীকার করলেও তিনি যুক্তি দেন, ইরানের অর্থনীতি এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার মতো যথেষ্ট বড়।
তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধে ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ‘স্ট্যাটিস্টিকাল সেন্টার অব ইরান’-এর সূচক অনুযায়ী দেশটির অর্থনীতি আগের গতিপথে ফিরে এসেছে। তিনি আরো যোগ করেন, ইরানের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো যুদ্ধের আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। এছাড়া, মিনাবের একটি বালিকা স্কুলে হামলার মতো ঘটনাগুলো জনগণের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি বাজার
লেইলাজ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর জোর দিয়ে দাবি করেন, ইরান এখন কার্যকরভাবে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
তিনি বলেন, “৩০ বছর ধরে ইরান বলে আসছে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। এখন এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটির ব্যবস্থাপনা আমাদের নিয়ন্ত্রণে।”
তিনি জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। তিনি আরও বলেন, এই প্রণালির গুরুত্ব শুধু তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অঞ্চলের বেশ কিছু দেশের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এলএনজি পরিবহনের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, তাই এই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
লেইলাজ বলেন, জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তার মূল্যায়ন অনুসারে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ২ শতাংশ হ্রাস পায়।
তিনি দাবি করেন, জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোকে তাদের জরুরি কৌশলগত মজুদ ব্যবহারে বাধ্য করছে। তিনি যোগ করেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা কখনও কল্পনাও করেনি যে ইরান এমন কিছু করতে সক্ষম হবে।”
দেশীয় উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা
কৃষি খাতে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও লেইলাজ জানান, ইরান বর্তমানে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন টন খাদ্য উৎপাদন করছে, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময়ের তুলনায় সাত গুণ বেশি।
তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে বর্তমানে প্রায় ৯০ মিলিয়নে পৌঁছালেও দেশে দুর্ভিক্ষের কোনো সম্ভাবনা নেই। এছাড়া ইস্পাত, পেট্রোকেমিক্যাল, সিমেন্ট এবং গৃহস্থালী সরঞ্জামের মতো শিল্পে নিজস্ব ভ্যালু চেইন তৈরির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এসব অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
ঢাকা/ফিরোজ